ঝাড়গ্রাম - মেদিনীপুর রুটের একটি বাসে চেপে সম্প্রতি ধেড়ুয়া থেকে ফিরছিলাম৷ বাসে বসার জায়গা তো ছিলই না, এমনকি দাঁড়াবার মত পরিস্থিতিও নেই৷ বাসের হেল্পার ভাই বললে-- কষ্ট করে পা টা তুলে ফেলুন বাসে, খানিকটা গেলেই সিট পেয়ে যাবেন৷ তার কথার ভরসায় আর নিজের প্রয়োজনের তাগিদে উঠে পড়তে বাধ্য হলাম৷ বাসে উঠেই তো অন্যের পায়ের উপর আমার একটা পা তুলে দিতেই হালকা করে গালি খেলাম৷ সবই কপালের দোষ ! তাই দুঃখিত বলা ছাড়া আর কিই বা করার আছে তখন৷ হেল্পার ভাই সামনে এগোতে বলছে, আমি এগোবার কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না৷ চিঁড়ে চ্যাপ্ঢা হয়ে যাচ্ছি! দিশেহারা অবস্থা৷ ভাবলাম কি করে মানুষ এইভাবে রোজ যাতায়াত করে? এই অবস্থায় অসহায় ভাবে হেল্পারের দিকে তাকালাম৷ তার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন বলতে চাইছে - প্রয়োজন আপনার, আমি আর কি করতে পারি! এইভাবে রোজ এতো এতো মানুষ যাতায়াত করছে, আর আপনি কে হরি দাস পাল, যে আপনাকে সিটে বসিয়ে নিয়ে যেতে হবে! এদিকে বাসের মধ্যে এর গুঁতো ওর গুঁতো খেতে খেতে ভেবে চলেছি অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে যেতে পারব তো? দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সহযাত্রীর কাছে সহানুভূতি পাওয়ার বদলে শুনলাম --- কাকু কী জীবনে প্রথম বাসে উঠলেন? আর কথা বাড়ালাম না৷ শুধু ভগবানকে ডেকে চলেছি আর বলছি আরও একটু ক্ষমতা দাও সহ্য করার৷ এরই মধ্যে বাস কন্ডাক্টর এসে ভাড়া খুঁজছে৷ কিভাবে টাকাটা পকেট থেকে বের করে দেব বুঝতে পারছি না, আমার এই অবস্থা দেখে সে নিজে থেকেই বললো -- নামবার সময় ভাড়া নেব৷ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম৷ ভাড়া দিয়েই তো আমাদের মত সাধারন মানুষ বাসে- ট্রেনে যাতায়াত করে থাকি৷ কিন্তু শান্তিতে ও সিটে বসে যাতায়াত করার ব্যবস্থা কোথায়? গোরু ছাগলের মত গাদাগাদি করে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে একস্থান থেকে অন্যত্র৷ এই অবস্থার পরিবর্তন করার বিষয়ে পরিবহন দপ্তর কিছু ভাবনা চিন্তা করছে কী?
মনে হয় দপ্তরের আধিকারিকদের বা কোনো মন্ত্রী মহোদয়কে এভাবে যাতায়াত করতে হয় না, তাই সাধারণ মানুষের কষ্টটা তাঁরা বোধহয় উপলব্ধি করতে পারেন না৷ সেদিনের বাসযাত্রী হিসেবে অনেক প্রশ্ণ মাথায় কিলবিল করছে৷ উত্তর কার কাছে পাব বা আদৌ পাব কিনা জানিনা, কিন্তু মাথার মধ্যে না রেখে সবার কাছে পেড়ে ফেলাই ভালো৷ বসার আসন বাদে এত অতিরিক্ত যাত্রী তোলা (এমনকি বাসের ছাদেও) কী পরিবহন দপ্তর অনুমোদিত? আইনসম্মত ভাবেই কী বাস মালিকগণ গাদাগাদি করে এত যাত্রী তুলতে পারেন?
ভেবে দেখুন তো বাসের আসনে বসে কোনো যাত্রী যে ভাড়া দেন, আর সেই একই দূরত্ব যদি কেউ দাঁড়িয়ে কষ্ট করে যান তাঁর কাছ থেকেও একই ভাড়া চাওয়া বা নেওয়া কি যুক্তিযুক্ত!
যাত্রী তোলার জন্য বাসের দরজার কাছ থেকে সবাইকে ঠেলে মাঝখানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা চলতে থাকে তাতে সমস্যায় পড়েন শিশু, মহিলা ও বয়স্করা৷ তখন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ তার উপরে শীতকাল বা বৃষ্টির সময় জানালা বন্ধ থাকলে তো আর কথাই নেই! ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা৷
যাঁদের নিজস্ব গাড়ি আছে বা যাঁরা বেশি অর্থ খরচ করে গাড়ি ভাড়া করে যাতায়াত করেন তাঁরা হয়তো সাধারণ মানুষের এই নিত্যদিনের সমস্যাটা উপলব্ধি করতে পারবেন না, কিন্তু যাঁরা গণপরিবহনের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল তাঁদের কথা ভাববার জন্যেই তো পরিবহন দপ্তর আছে, আছেন পরিবহন মন্ত্রী, আর আছেন ঐ দপ্তরের আধিকারিকগণ৷ প্রশ্ণ ওঠা স্বাভাবিক তাঁরা তাহলে কী করেন? সাধারণ জনগণের যাতায়াতের জন্য তাঁরা কি একটু স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারেন না?
বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবসভ্যতা দ্রুত এগোচ্ছে, নিত্যনোতুন আবিষ্কার জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করেছে একথা সত্য৷ কিন্তু রাজ্যের বেশিরভাগ রুটের বাসগুলো দেখলে বা তাতে চেপে ভ্রমণ করলে মনে হয় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি৷ সরকারি বেসরকারি বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে, কম দূরত্বের যাত্রীদের জন্য ছোটো বাস বা অন্য কোন যানবাহনের ব্যবস্থা করে, বসার আসন সংখ্যা অনুযায়ী যাত্রী তোলা হলে সমস্যার সমাধান অনেকটা হবে৷ সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব৷ তাঁরা সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবেই৷ পরিবহন বিষয়েও মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে৷ প্রশাসনের কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সাথে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে ভাবুন৷৷
- Log in to post comments