রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জঘন্য, দানবিক একটা ইয়ার্কি চলছে৷ কোনো সন্দেহ নেই, শিক্ষক-নিয়োগে খানিক দুর্নীতি হয়েছিল, কোনো পক্ষই অস্বীকার করেনি সেটা৷ কিন্তু তারপর যা হল সে অবিশ্বাস্য৷ দুর্নীতি ধরতে নামল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার-ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উকিলদের সওয়ালে, এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গোদি-মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়৷ প্রচুর তেল-পুড়ল, মন্ত্রীসান্ত্রীরা জেলে গেলেন, তথাকথিত বান্ধবীর বাড়ি থেকে পাওয়া গেল কোটি-কোটি টাকা৷ বাপরে বাপ সে কী দৃশ্য৷ টাকা গোণা হচ্ছে মেশিন দিয়ে, পারলে সরাসরিই দেখিয়ে দেওয়া হয় গোদি-মিডিয়ায়৷ ধরা পড়লেন কোনো এক কাকু৷ তাঁর অডিও-ক্লিপের চোটে জগৎ অন্ধকার৷ জীবনবিজ্ঞানের ক্লাসরুমের মতো ডায়াগ্রাম এঁকে গোদি-মিডিয়ার নাড়ুগোপালরা ঘন্টাখানেক ধরে দেখাতে থাকলেন, টাকা কোন পথে কোথায় গেছে৷ সবই তাঁরা জানতেন, যেমন জানতেন করাচি দখলের খবর৷
এরকম কয়েক বচ্ছর ধরে চলল৷ লোকে ভাবল, এইবার কিছু একটা হচ্ছে৷ এত ঢাক-ঢোল কি আর মিথ্যে হতে পারে? কিছু হলও বটে৷মন্ত্রী ছাড়া পেলেন৷ দুর্নীতির দায়ে একজনও আদৌ ধরা পড়লেন কিনা সন্দেহ৷ কিন্তু ন্যায়বিচার কি তাতে আটকে থাকতে পারে? কোনো চোর ধরা পড়লনা, কিন্তু শাস্তি তো দিতেই হবে৷ শাস্তি পেল কারা? না শিক্ষকরা৷ তাঁদের বৃহদাংশকেই বলা হচ্ছে ’যোগ্য’, ইংরিজিতে ’আনটেন্টেড’, অর্থাৎ অকলঙ্কিত৷ এঁরা কাউকে কোনো টাকা দেননি, কোনো বেআইনী কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগও নেই, কিন্তু তাঁদের সববার চাকরি গেল৷ এরকম কি অভিযোগ-ছাড়াই হাজার বিশেক লোকের রুটি-রুজি কেড়ে নেওয়া যায়? আদালত বলল যায়৷ ন্যাচারাল জাস্টিস, অর্থাৎ কিনা ’একজনও নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায়’, এই নীতি এখানে প্রযোজ্য নয়৷ হবেও বা৷ যদিও, উত্তর ভারতে একজন বিচারকের বাড়ি থেকে কিছুদিন আগেই, কাগজে পড়লাম, কোটি-কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে৷ সেই অপরাধে সব বিচারকের কি চাকরি গেছে? যায়নি৷
যা হোক, এ তো প্রথম পর্ব৷ পরের পর্ব আরও চমৎকার৷ চারদিকে চোর-চোর বলে আওয়াজ উঠল৷ যেন শিক্ষকরা পড়িয়ে চুরির দায়ে ধরা পড়েছেন৷ তারপর ঘোষণা করা হল, এঁদের আবার পরীক্ষায় বসতে হবে, নতুন চাকরি পেতে৷ অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর দেওয়া হবে৷ খুব সুবিচার হল বলা যাবেনা৷ এত বছর পরে চাকরির পরীক্ষা কেন, মাধ্যমিকে বসতে বললেও আমরা অনেকেই ফেল মারব৷ তাও পরীক্ষা হল, অনেকে দ্বিতীয়বারেও পেলেন, কেউ কেউ পেলেন না৷ এবার আবার বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উকিলরা ওই আদালতেই মামলা করলেন, এইভাবে ১০ নম্বর দিয়ে চাকরি দিয়ে দেওয়া যাবেনা৷ সরাসরি দাবী না করলেও, যা বোঝা যাচ্ছে, এঁদের মোদ্দা বক্তব্য খুব সোজা৷ আগে যারা চাকরি করছিল, তাদের চাকরি খেয়েই ছাড়ব৷ এটা কী ধরণের দাবী বোঝা খুব কঠিন হলেও, ব্যাপারটা ওইরকমই চলছে৷ এবং এবার আদালত আরেকদফা কী ন্যায়বিচার করে, সবাই রুদ্ধশ্বাসে তার অপেক্ষায়৷
চারদিকে নানা লোকে এই কুনাট্য সব দেখছেন, এবং চুপচাপ বসে আছেন৷ কারণ, রাজ্যসরকারের মুন্ডপাত করা সোজা৷ কেন্দ্রীয় এজেন্সি, উকিলবাবু বা স্বয়ং আদালতকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে, হাতে হারিকেন হবার প্রবল সম্ভাবনা৷ অথচ কথাটা খুব সোজা৷ যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে এবং নিচ থেকে উপর তলা থেকে সব জড়িয়ে থাকে, তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা-বাহিনী লাগিয়ে ব্যাটাদের টিপে-টিপে বার করুন, শাস্তি দিন৷ কিন্তু কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা হয়ে, হাতের কাছে যারা মজুদ, তাদের ধরে বাটাম দেবেন না৷ সেই মুজতবা আলির আফগানিস্তানের ন্যায়বিচারের মতো হয়ে যাচ্ছে৷ গুনতিতে মিলছেনা বলে, রাস্তা থেকে কাউকে একটা ধরে জেলে পুরে দিলাম৷
এই সোজা কথাটা সোজা করে বলার যে লোকের অভাব, তাতে আরেকটা সন্দেহ প্রবল হচ্ছে৷ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাটা লাটে তুলে পুরোদস্তুর নতুন শিক্ষানীতি চালু করার উদ্দেশেই পুরোটা করা হচ্ছে না তো? এমনিতে ইশকুল দুদিন ছুটি থাকলেই গোদি-মিডিয়া প্রতিবাদে গর্জে ওঠে৷ অথচ দেখুন, যখনই ভোট আসে, রাজ্যসরকারি ইশকুলগুলোতে কেন্দ্রীয় বাহিনী কয়েক মাসের জন্য ডেরা গাড়ে৷ কোনোদিন শুনবেন না, সাউথ পয়েন্টে ছাত্রদের ক্লাস বন্ধ করে কেন্দ্রীয় বাহিনী বসবাস করছে৷ ভোটের আগে বিএলও কারা হচ্ছে? সেই রাজ্যসরকারি ইশকুলের শিক্ষকরা৷ কোথাও, এই নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই, যে, শিক্ষকদের মূল কাজটা পড়ানো, দুমাস ধরে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে অ্যাপ আপডেট করা নয়৷ ভাবটা এই, যে, সরকারি ইশকুলের ছাত্ররা বানের জলে ভেসে এসেছে, গেলে যাক৷ দেখেশুনে মনে হয়, শিক্ষাব্যবস্থাটা উঠে গেলে সক্কলেরই সুবিধে হয়৷ বেশ পুরোটা কেন্দ্রীয় হয়ে যাবে, একটাই নিট হবে, সবাই গোবলয়ের শিক্ষা পাবে, গড়গড়িয়ে হিন্দি বলবে, তাতেই মোক্ষ৷ গরীব-গুর্র্বেরা বাদ গেলে কী এসে যায়?
উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এই কাণ্ড চলছে৷ যেখানে যেটুকু স্বশাসন সব ধবংস করে পুরোটাই কেন্দ্রীয় স্টিমরোলার চলবে৷ আইআইটিগুলোতে গরুপুজো হচ্ছে৷ বিই কলেজ তথৈবচ৷ আইএসআই বিল নামক একটা বস্তু আনা হয়েছে, যাতে ভারতের গর্ব আইএসআই কেন্দ্রীয় আমলাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়৷ যাদবপুর আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় টিকে আছে, তাদের ঘিরে নিন্দেমন্দের কোনো শোষ দেখবেন না৷ যাদবপুর খারাপ, কবি খারাপ, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা খারাপ, অবৈতনিক শিক্ষা খারাপ, শুধু কেন্দ্রীয় এজেন্সি ভালো, নিট ভালো, সিবিএসই ভালো আর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুপুজো ভালো৷ এইটা গোদি-মিডিয়ার একদম খুল্লমখুলা লাইন৷ উকিলবাবুদের কী লাইন জানিনা৷ অন্তত একজন উকিল আবার বামপন্থী শুনেছি, সে তো অবশ্য বামপন্থীদের টাটা-লালসেলামও বলতে শুনেছি৷ (সংগৃহীত)
- Log in to post comments