(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বাঙলাদেশের সমস্যাটা ধর্মমতের বা রাষ্ট্রিক - রাজনৈতিক বা দুঃশাসনদুর্নীতি সর্বস্বও নয় এ হ’ল দেশী বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আরোপিত সমস্যা৷ মূলতঃ সমস্যাটা ‘বাঙালী জাতীয়তাবোধ’-এর অবদমন -অবনমন -প্রদমনগত সমস্যা৷ এশিয়া, ইউরোপ , লাতিন আমেরিকাই নয়, বিশ্ব জুড়ে যে একটা জটিল অস্থিরতা, ঘূর্ণাবর্ত চলছে তার মূলে জাতীয়তাবোধ জনিত অস্তিত্বের সঙ্কট ও নিরাপত্তাহীনতা৷ আর এর মুখ্য সঞ্চালক কারণটি হল জনগোষ্ঠীর জাতিকসত্তার অবলুপ্তির আতঙ্ক, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার সংকট-সামাজিক নিরাপত্তার অভাব আর ভাষা. সাংস্কৃতিক অবদমনের উদ্বেগ, অবলুপ্তির ভয়াবহ আতঙ্ক৷ কাজেই বাঙলাদেশে যা হয়েছে , যা হচ্ছে তা বাইরের বুদবুদ- জড়স্ফোট মাত্র এবং বাইরের জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপারও নয়৷ কথাটা উৎকট সমস্যা জর্জরিত খণ্ড খণ্ড বাঙলার প্রতিটি অংশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ সমস্যা-সংকুল, ঘটনা- বহুল পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে নয়৷ উত্তর চল্লিশ ঘটনাবলী দিয়ে এর মূল্যায়ন সম্ভব নয়৷ মূল অনেক গভীরে৷ সমস্যার ভিতরে ঢুকতে গেলে কতগুলো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া দরকার ৷ যেমন বঙ্গদর্শন---
বাঙালী জনগোষ্ঠীর বাসভূমি ভূ-পৃষ্ঠে একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে, নির্দিষ্ট অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বেষ্টিত অধিক্ষেত্রে অবস্থিত৷ বাঙালীস্তানের দক্ষিণ সীমা ১৯’ ১৮’ অক্ষাংশ থেকে ২৮’ ১৪’ অক্ষাংশ পর্যন্ত , এবং পূর্বে ---পশ্চিমে ৮২’ পশ্চিম দ্রাঘিমা থেকে ৯০’ পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত ৷ ক্ষেত্রমান --- ৫, ৩৫, ৪৭৮ বর্গ কিমি৷
ভৌগোলিক বিচারে ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান ---বঙ্গভূমির উত্তরে দুর্ভেদ্য হিমালয় , দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর----চিল্কাহ্রদ থেকে নাফ নদীর মোহানা পর্যন্ত , পূর্বে আরাকান-ইয়োমা উচ্চভূমি , পশ্চিমে শোননদী, বিন্দ্যপর্বতের শাখা রামগড় পাহাড়, আর মধ্যাংশে বহমানা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ও তার নদী মেখলা এবং দামোদর সহ রাঢ়ের নদীগুলি বাহিত পললভৌম সমভূমি৷
বৃহৎবঙ্গের এই ভৌগোলিক অঞ্চলটি একটা স্বতন্ত্র ভূতাত্ত্বিক সংরচনাগত বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে৷ পূর্বে-পশ্চিমে ---উত্তরে বিভিন্ন গিরির বেষ্টনি, আর এই বেষ্টনির মাঝে বিভিন্ন নদীর মেখলা-সংরচিত স্থলভাগ৷ এই বিশেষ প্রাকৃতিক বাতাবরণে গড়ে ওঠা ভূভাগকে প্রাচীন সংস্কৃতে বলে মহাভূমি, মহাসংস্থান ৷ বাঙালীদের বাসভূমি, বাঙালীস্থান এমনই একটা ‘মহাসংস্থান’৷ এই বিশাল ভূখণ্ডের পশ্চিমাংশ প্রাচীন গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ডের পূর্বাংশ-- যা রাঢ় (লাল মাটির দেশ) নামে পরিচিত৷ এই রাঢ় বাঙলার দুটি ভাগ পূর্ব রাঢ় ও পশ্চিম রাঢ়৷ পশ্চিম অংশটা এখন উচু-নীচু , তরঙ্গায়িত ভূমি ---কিছুটা মালভূমি, আর পূর্বরাঢ় (ভাগীরথীর উত্তর পাড়ে ) নদীবাহিত পলল-সমভূমি৷ বৃহৎবঙ্গের পূর্বাংশ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রেরপলিগঠ্ গাঙ্গেয় -সমভূমি৷ গ্রীসের নামকরণে ‘‘গঙ্গারিডি’, আর্যদের নামায়নে ‘রাঢ়’৷
দৈশিক বিচারে বাঙালীস্থানের উত্তরে নেপাল -ভূটান -সিকিম, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর-মাদ্রাজ , পশ্চিমে যুক্তপ্রদেশ- ও মধ্য প্রদেশ, পূর্বে মায়ানমার ও চীন ৷
আঞ্চলিক পরিচয়ে অতীতে বৃহত্তরবঙ্গ, বাঙালীস্থান পঞ্চগৌড় নামে পরিচিতি লাভ করে৷ অর্থাৎ অতীতে রাঢ় , সমতট বা বাগড়ী , বরেন্দ্র , বঙ্গ বা ডবাক ও শ্রীভূমি নামে পাঁচটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল ৷ ভূমির বৈশিষ্ট্যে ও প্রশাসনিক সুবিধার্থে ছিল এই বিভাগ-বিন্যাস৷ বাঙালীস্তানের একটা অংশ এখন বাঙলাদেশ নামে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র , পশ্চিমবঙ্গ- ও ত্রিপুরা ভারতের দুটি অঙ্গরাজ্য এবং অখণ্ডবাঙলার অবশিষ্ট অংশ অসম - নেপাল - বিহার - ঝাড়খণ্ড-উড়িষ্যা- মেঘালয়---মায়ানমার (স্বতন্ত্র রাষ্ট্র)৷ যাইহোক - বর্তমান বাঙলাদেশ অতীতের সমতট , শ্রীভূমি, বরান্দ্রের কিয়দংশ ও ডবাককে নিয়ে গঠিত৷
ভূপ্রকৃতির দিক দিয়ে বঙ্গভূমির বৈচিত্র্য লক্ষ্যনীয় ৷ একমাত্র মরুভূমি ছাড়া প্রায় সব ধরণের ভূমিরূপ বৃহৎবঙ্গে রয়েছে৷ সমুদ্রের সঙ্গে বঙ্গভূমির অবস্থান , গিরিবেষ্টনির মহাসংস্থান হওয়া ইত্যাদি নানা কারণে জলবায়ুতে বৈচিত্র্য থাকলেও এখানকার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ ক্রান্তীয় মৌসুমী প্রকৃতির৷ সেই অনুযায়ী স্বাভাবিক উদ্ভিদের বৈচিত্র্যও রয়েছে৷ নদীমাতৃক বঙ্গভূমির সিংহভাগই নদীবিধৌত পললসমভূমি৷ এই সমভূমি বিশ্বের অন্যতম সেরা উর্বর সমভূমি৷ স্নায়ুর জালের মত অসংখ্য নদনদীর অবস্থান ও সমুদ্রের নৈকট্য বাঙালীকে এক সময় নৌবিদ্যায়-নৌশিল্পে এবং নৌ-ব্যবসা-বাণিজ্যে (জলপথে বাণিজ্যে ) সমৃদ্ধ করে তুলেছিল৷
ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক বা পরিবেশগত কারণেই বাঙালীদের জীবন ওজীবিকা মূলতঃ কৃষি ও কৃষি নির্ভর শিল্পকে ভর করে (কৃষি-ভিতিক, কৃষি-সহায়ক ও কৃষি-অনুসারী মৎস্যচাষ, পশু-পক্ষী পালন, মৌপালন, বাগিচা চাষও এরই মধ্যে ধরা হয়৷) ফলে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্যের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের দৌলতে বাঙালীর জীবন -জীবিকা সহজ লভ্য ছিল৷ বাঙালাদেশের বাঙালীদের জীবনগোত্র-গায়ত্রী কী এর বাইরে ? তা তো নয় !
সুবর্ণরেখা, দামোদর, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি স্থান বা নদনদীর নাম থেকে সহজেই বোঝা যায় যে বাঙালী অতি অতি প্রাচীন কাল থেকেই নানা ধাতুর ব্যবহারে সড়েগর ছিল ৷ ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম খনিজ ভাণ্ডারটিও বৃহৎবঙ্গেই অবস্থিত --- যা ব্রিটিশ শাসনকালে প্রকাশ্যে আসে এবং ‘ভারতের রূঢ়’ নামে পরিচিত হয় ৷ একালে এটাও দেখা যাচ্ছে যে আধুনিক কালের খনিজ-জ্ঞানে প্রায় সব ধরনের খনিজ পদার্থই বাঙলার মাটির গর্ভে রয়েছে৷ বঙ্গোপসাগরের জলে ও তলে রয়েছে অফুরন্ত সামুদ্রিক সম্পদ৷ ( চলবে )
- Log in to post comments