একটি পরিবারের অধিকাংশ ব্যষ্টি জ্বরে ভুগতে থাকলে ডাক্তারবাবুরা অনেক সময় বলে থাকেন---এটা ভাইরাস জ্বর, এই ভাইরাসে (বাইরাসকে) খালি চোখে দেখা যায় না, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও তা দৃষ্ট হয় না কেবল অনুভব করা যায়, ১৯৭০ সালের কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত কলেজগুলিতে বিশেষ করে মেদিনীপুর কলেজে বি.এ পার্ট-২ পরীক্ষার সময় এরূপ ভাইরাস আক্রমণ ঘটেছিল৷ যার ফলে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রাই তা সে মেধাবী হোক বা মধ্যমানের হোক---সবাই মনের আনন্দ বই বা খাতা দেখে পরীক্ষার উত্তর পত্র লিখেছিল বা লিখতে বাধ্য হয়েছিল৷
অনার্স পরীক্ষার প্রথম দুদিন ততখানি (ততটা) বোঝা যায়নি পরীক্ষা কিভাবে হচ্ছে৷ তৃতীয় দিন থেকে দেখা গেল পরীক্ষা হলে যে টুকু রাখ-রাখ, ঢাক-ঢাক ছিল, তা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে, অর্থাৎ ভাবখানা এই---নাচতে যখন নেমেছি, তখন আবার ঘোমটা কিসের! প্রায় সবাই পরস্পর কথা ত বলছেই সেই সঙ্গে প্রয়োজনবোধে বই খুলে উত্তরটা দেখে নিচ্ছে৷ অনার্স পেপারের চতুর্থ দিন পরীক্ষা হলে গিয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ একমনে উত্তর লিখেছি৷ সবাইকে অসদুপায় অবলম্বন করতে দেখে নিজেকে কেমন যেন অসহায় অসহায় মনে হচ্ছিল৷ এটাকে ঠিক চুরি বলা যায় না, বলা যেতে পারে দিনে ডাকাতি৷ কিছু লিখতে পারছিলাম না৷ চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম একজন অধ্যাপক যিনি পরীক্ষা হলে নজরদারি করছিলেন , তিনি আমার কাছাকাছি এলেন৷ বললেন--- চুপচাপ বসে থেকো না, সময় চলে যাচ্ছে সবাই যা করছে তুমি ও তাই কর ৷ একবার ভাবলাম---তাই করি৷ কিন্তু কে যেন ভেতর থেকে বলল--- এতদিন যখন কিছু ? তখন আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা কেন৷ কিছুক্ষণ বই দেখে লিখলে কতটুকুই বা নাম্বার বাড়বে, বিশেষ করে সারাজীবনের জন্য একটা আত্মতৃপ্তি থাকবে এই ভেবে যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ঈশ্বর কৃপায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করতে হল না৷ যা ভাবা তাই কাজ, শুভানুধ্যায়ী অনেকের অনুরোধ সত্ত্বেও বই দেখলাম না৷ যতটুকু পারলাম নিজে লিখলাম, পরে জেনেছি---ইংরেজী অনার্সের আর একটি ছেলেও শত প্রলোভন সত্ত্বেও নিজেকে ঠিক রাখতে পেরেছিল৷
অনার্স পেপারের ন্যায় পাশ পেপারগুলোতেও একইভাবে পরীক্ষা দিলাম৷ কিভাবে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল কলেজের মধ্যে মাত্র দুটি ছাত্র ছিল ব্যতিক্রম, বিকেলে আমার বাসস্থান মীরবাজার কলেজ মেশে এসে বিশ্রাম নিচ্ছি, হঠাৎ দেখি মধ্য বয়স্ক কয়েকজন ভদ্রলোক আমাকে খোঁজাখুঁজি করছেন, তাঁরা ছিলেন সবাই হাইস্কুলের শিক্ষক, স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে মেদিনীপুরে বি.টি. পড়তে এসেছেন মুখোমুখি হতেই জানালেন---তাঁরা আমায় দেখতে এসেছেন, পরীক্ষায় টোকাটুকি না করে এই হট্টগোলের বাজারে কি করে অসম্ভবকে সম্ভব করলাম তা ছিল তাঁদের কাছে বিরাট কৌতুহলের বিষয়, তাই আলাপ করতে এসেছেন৷
তাঁদেরকে আমার মনের অনুভূতির কথা জানালাম শুধু বললাম---শৈশব থেকে পিতামাতার শিক্ষা এবং সর্বোপরি আমার প্রাণের প্রাণ পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী অকৃপন কৃপার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে৷ আমি সারাজীবন যাতে সৎভাবে জীবনযাপন করতে পারি সে ব্যাপারে তাঁরা আমাকে উৎসাহিত করলেন এবং পরিশেষে ঈশ্বরের কাছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে ও বার বার ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলেন৷
- Log in to post comments