প্রভাতী

শ্রীচরণে

লেখক
বিভাংশু মাইতি

আমার মনের বনে ফুটে ওঠা

ভাব-ভাবনার ফুলগুলি,

ভক্তিভরে তোমার পায়ে

দিলুম আমি অঞ্জলি৷

আমার চিদাকাশে জেগে ওঠা

রামধনুর ওই রঙগুলি

সযতনে রাঙিয়ে দিলুম

ওই আলতা-বরণ পা-গুলি৷

শক্তিভক্তি, বুদ্ধি-বিবেক

যা কিছু মোর ঘরে আছে

সযতনে সঁপে দিলুম

সেই চরণের কাছে৷

সব কিছু মোর নিঃশেষে নাও

গ্রহণ কর মোরে

সেই চরণে ঠাঁই যেন পাই

জন্ম জন্মান্তরে৷

 

স্বভাব যায় না ম’লে

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘খভ্রাম্তি’ শব্দেরএকটি অর্থ হল চিল (কালো চিল ও শঙ্খচিল দুই-ই)৷ ‘ভ্রম’ ধাতুরঅর্থ ভুল করা নিলে ‘খভ্রান্তি’ শব্দের একটি যোগারূঢ়ার্থ হবে--- যে একইভুল বারবারকরে চলেছে৷ একই ভুল জেনে বা না জেনেঅনেকেইকরে থাকে৷

ধরো, কোন একজন অনেকগুলি সংখ্যাকে উপর থেকে নীচে গুণে চলেছে৷ বারবার গণনায় ভুল হচ্ছে৷ খোঁজ নিলেদেখা যাবে একটি জায়গায় বারবার মনে মনেসে বলে চলেছে +৬=১২৷ এই ধরণেরভুলকেও ‘খভ্রান্তি’ বলা হয়৷ ‘খভ্রান্তি’-র হাত থেকে বাঁচাবার অন্যতম উপায় হল উল্টো পথেচলা যেমন গণনার ক্ষেত্রে উপর থেকে নীচে গুণতে গিয়ে ‘খভ্রান্তি’-তে পড়ছ, তো সেইস্থলেএই ‘খভ্রান্তি’-র হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যে নীচের থেকে উপরে গোণ৷ এবার +৬= ১২ না বলে আশা করা যায় বলবে +৫= ১১৷

আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল.. বয়সেছিল আমার চেয়ে কিছুটা ছোট৷ তার ‘খভ্রান্তি’ ছিল--- স্বেচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, মিথ্যে কথা বলা৷ তাকে বকাঝকা করলে সে বলত, ‘‘কী করব দাদা, মুখ থেকে বেরিয়ে যায়৷ যদি ঠিক বলতেও চাইতুম ও স্বভাবগতভাবে মিথ্যে বেরিয়ে যায়৷

সেই যে ছড়ায় আছে না---

‘‘মনে করি হেন কর্ম করিব না আর,

স্বভাবে করায় কর্ম কী দোষ আমার’’৷

যারা তার স্বভাবেরসঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছল সেই সব আত্মীয়-অনাত্মীয় চেনা-অচেনা সবাইতার সম্পর্ক লত--- ও যখনযাকিছুইবলুক না কেন তা’ গ্রহণ করার আগে তা’ ভাল করে চেলে নিবি৷

একবার আমি তাদের জিজ্ঞেস করলুম --- হ্যাঁরে, তোরা যেচেলে নিতে বলছিস তা কী রকম চালুনিতেচালতে হবে৷?

ওরা বললে --- নারায়ঁগঞ্জ বাজারের একটা দোকানে খুবমিহি চালুনি পাওয়া যায়৷সেই চালুনিতে চালতে হবে৷

আমার এই আত্মীয়টি সব শুণে বললে--- আমার মিথ্যে এতই সূক্ষ্ম যে তা’ চালবার মত চালুনি এখনওবপৃথিবীতে তৈরী হয়নি৷

আমি ধমকে দিয়ে বললুম--- হ্যাঁরে, তুই যখন আমার সঙ্গে কথা বলবি তখন আমাকেও চালুনি নিয়ে বসতে হবে নাকি? সে আমাকে একটু ভয় পেত৷সে বললে--- না দাদা, আপনার চালুনির দরকার পড়বে না৷ যদি একান্তই দরকার পড়ে মোটা চালুনিতেই চলবে৷

 আমি ললুম--- ওসব ন্যাকামি ছাড়৷ আজ থেকে সত্যি কথা বলা অভ্যেস কর৷

পরের দিন ওর ববন্ধুরা আমার কাছে এসে নালিশ করে বললে--- ও আবার মিথ্যে বলছে৷

আমি ললুম--- কী মিথ্যে বলেছে?

ওরা বললে--- ও বলছিল,বরংপুর জেলাটা নাকি আগে বুড়ীগঙ্গার চর ছিল৷

আমি ললুম--- হ্যাঁরে, এখনওবঅভ্যেসটা ছাড়লি না কেন? সে আমাকে কাকুতি মিনতি করে বললে, দাদা আপনারে কথা দিতেসি এ্যামনডা আর অইব না৷

আমি বললুম--- ঠিক আছে,কথা দিলি --- তা মনে রাখিস যেন৷

পরের দিনই ওর বন্ধুরা এসে বললে--- ও আবার মিথ্যে বলেছে৷

আমি বললুম--- কী বলেছে?

 ওর বন্ধুরা বললে--- ও বলেছে, বঙ্গোপসাগরটা নাকি আগে ওর পিসেমশাইয়ের জমিদারীতে ছিল৷

 আমি আবার ওকে মুখঝামটা দিয়ে বকাঝকা করলুম৷ ললুম--- ‘‘আার যদি মিথ্যে বলিস তোরে মাইরা ফ্যালাইয়া দিমু’’৷

সে বললে --- না দাদা৷ আর কখনও এমনডা অইব না৷ আমি আপনারে পাকা কথা দিতেসি৷

তার পরের দিন ওর বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসেমামলা দায়ের করে বললে--- দাদা, ও আবার মিথ্যা কথা বলেছে৷

আমি বললুম--- কী বলেছে?

ওর বন্ধুরা বললে--- ও বলেছে, ওর ঠাকুরদার যেটা সব চেয়ে বড় হাতী অর্থাৎ ঐরাবত ছিল তার নাকটা ছিল শুর্পনখার নাকের মত৷

আমি ওকে অনেক বকাঝকা করলুম৷ ললুম--- তোর কথার দাম রাখতে পারিস না কেন রে?

ও বললে--- দাদা, মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়৷ এবার আমি আপনারে পাকা ফাইন্যাল কথা দিতেসি৷ এমনডা অইব না৷

তার পরের দিন বন্ধুরা আমার কাছে এসে রিট পিটিশন করে জানালে--- ওর মিথ্যে বলা স্বভাব৷ মানুষ কেন, দেবতারাও সারাতে পারবে না৷

 আমি ললুম--- ও আার কী মিথ্যা বলেছে?

ওরা বললে--- ও বলেছে, ও নাকি আসলে ভুত৷ ট্যাক্স ফাঁকি দেবার জন্যে পোষাক পরে সেজে গুজে থাকে৷

আমি শুধোলুম--- হ্যাঁরে, এসব কী কথা শুণছি!

ও বললে --- দাদা, এবার আমি আপনারে এক্কেরে পাকা ফাইন্যাল কথা দিতেসি, ভবিষ্যতে আর এ্যামনডা অইব না৷

তারপর কী হয়েছিল আর আমি খোঁজ নিইনি.... তারপরেই বাঙলা ভাগ হয়ে গেছল কিনা৷

তা হলে তোমরা ‘খভ্রান্তি’ কাকে লে বুঝলে তো!    

উৎস

  (শব্দচয়নিকা ১৩শ খন্ড )

আকর্ষণ

লেখক
জিতেন্দ্রনাথ মণ্ডল

আমার সকল কথার মাঝে

                তোমার বাণী অরূপ সাজে

                বাজে হিয়াতে৷

ঝিনুক বুকে মুক্তো ভরা,

                খুঁজেখুঁজে বাহির করা

                গাঁথি মালাতে৷

এদিক ওদিক চলছি যখন,

                মাঝে দাঁড়াও তুমি তখন

টানছো আমায় লহর ধারায়

                সোজা পথেতে৷

কত শোভা ছড়ায় আভা,

                দৃষ্টি হতে মিষ্টি প্রভা

                ঝরে আঁখিতে৷

তোমার ঝলক চকিত এসে

                ঝিলিক মারে মনের দেশে,

                ভাসি শোভাতে৷

যখন তোমায় মনে পড়ে,

                দেখি আমার খেলা ঘরে

                সুধা ধারাতে৷

দুলছি দোলন জীবন দোলায়,

                কান্না হাসির সুর যে ছড়ায়

                তোমার সুরেতে,

তুমি যে গো মধ্যমণি,

                মোহন সুরে বাঁশির ধ্বনি

                বাজাও মাঝেতে৷

দিয়েছো শান্তি, দিয়েছো স্বস্তি,

তোমাকেই শুধু চাই৷

অগতির গতি, তুমি চিরসাথী

তোমার তুল্য নাই৷

তৃপ্তি আনন্দ, নেই নিরানন্দ,

তোমাকে শুধু পাই৷

যুগের দাবী

লেখক
শ্রীরামদাস বিশ্বাস

যুগের দাবী নাওগো মেনে

                অন্ধকারে আর থেকো না৷

আঁধার রাতে ভয়ের সাথে

                বৃথা তুমি আর যুঝ না৷৷

আসছে যাহা জেনো তাহা

                অবশ্য তা’ সত্যবহ

পুরাতনে আঁকড়ে কেন

                অনন্তকাল চুপটি রহো

শ্বাশ্বত যা চিরকালই

                একই রবে তাও বোঝ না৷৷

লক্ষ্য তোমার শ্বাশ্বত হোক

                সেই তো তোমার আদর্শ

অপরিবর্তনীয় সে

                লক্ষ কোটি আলোক–বর্ষ

অনাগতে করতে বরণ

                আদর্শকে ছেড়ো না৷৷

 

মনের উদারতা

আমরা সবাই পরমপুরুষের সন্তান, সবাই ভাইবোন৷ এই বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভাবনা নিয়ে সবার সঙ্গে উচিত ব্যবহার করাই মনের উদারতা৷ তাঁর দৃষ্টিতে সবাই সমান৷ যাঁর মন উদার সবাই তাঁকে ভালবাসেন, তিনিও সবাইকে ভালবাসেন৷ তাঁর কাছে কেউ হিন্দু বা মুসলমান নয়, বৌদ্ধ বা খ্রীষ্টান নয়, ব্রাহ্মণ বা শূদ্র নয়৷ ধনী বা গরীব নয়, সবাই মানুষ, সবাই আপন৷ আর সবাই যখন আপন হয়ে যায়, তখন আর কেউপর থাকে না৷ মনের এই উদারতা না থাকলে মানুষ ঈশ্বরকে ভালবাসতে পারে না৷ আর ঈশ্বরের ভালবাসাও সে পায় না৷ কোন জীবকে বা কোন মানুষকে ঘৃণা করলে তো ঈশ্বরকেইঘৃণা করা হলো৷ কেননা প্রতিটি জীবের মধ্যেই তো ঈশ্বর রয়েছেন৷ সব জীবই তো তার সন্তান৷ তাই যে ঈশ্বরকে তুমি ঘৃণা করো, ভালবাসো না, তাঁকে তুমি পেতেও পারো না৷ ঈশ্বরকে পেতে হলে তাঁকে ভালবাসতে হবে, আর তাঁকে ভালবাসলে তাঁর সৃষ্ট জীবকেও ভালবাসতে হবে৷ সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে৷ সবাইকে আপন ভেবে তাদের উপকার করতে হবে৷ এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি৷ এক নিঃস্তব্ধ গভীর রাত, অন্ধকার ঘরে একটি সাধারণ বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন হাজী মোহম্মদ মহসীন৷ হঠাৎ কিসের একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়, চটপট মাথার নিকটের বাতিটা জ্বাললেন৷ অবাক কাণ্ড, দেখলেন, একটি লোক তাঁর বাক্স খুলে টাকা–পয়সা একটি কাপড়ে বেঁধে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করছে৷ উপস্থিত বুদ্ধির দ্বারা লোকটিকে হাতে–নাতে ধরে ফেললেন তিনি৷ নিরুপায় হয়ে বেচারা চোর তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল৷ চোখের জল মুছতে মুছতে চোরটি তার সংসারের হত দারিদ্র্যের কাহিনী শোণাতে লাগল৷ সে জানাল, অভাবের দায়ে পড়ে এই পাপ কাজে যুক্ত হয়েছে৷ বলতে লাগল, ‘এবার ছেড়ে দিন হুজুর, আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন৷ এমন কাজ আর জীবনে করব না৷ বৌ–ছেলেমেয়ে না খেয়ে মরছে, তা দেখতে না পেরে এমন পাপ কাজ করেছি৷ এবারকার মত ক্ষমা করুন৷ আর কখনও এমন কাজ করব না৷’

মহসীন চোরের এরূপ কাতর প্রার্থনা শুণে কিছু সময় চিন্তা করলেন৷ পরে তাকে বললেন, ‘চল তোমার বাড়ী যাব৷’ চুরি করা টাকা–পয়সা তুলে নিয়ে চললেন চোরের সঙ্গে সঙ্গে৷ চোর তো ভয়ে পাথর৷ সে ভাবল তাকে নিশ্চয়ই পুলিশে দেওয়া হবে৷ লজ্জা আর ভয়ে নিরুপায় হয়ে চোরটি অবশেষে তাঁকে বাড়ীর পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল৷

মহসীন চোরের বাড়ীতে পৌঁছে হতবাক৷ বুঝলেন তার কথা বিন্দু মাত্র মিথ্যা নয়৷ দারিদ্র্য আর অনাহারের যন্ত্রণায় পরিবারের সকলেই মৃতপ্রায়৷ তাদের দুর্দশা দেখে উদার হৃদয়, মহসীনের দয়ালু মন কেঁদে উঠল৷ তিনি অপহূত সমস্ত টাকা চোরকে দিয়ে দিলেন৷ তিনি তাকে কিছু সংসারের প্রয়োজনে ব্যয় করতে আর বাকী টাকা নিয়ে সৎপথে উপার্জন করতে পরামর্শ দিলেন৷ তাকে চুরি করতে নিষেধ করলেন বরং প্রয়োজনে মহসীনের নিকট সাহায্যের জন্যে আসতে বললেন৷ মহসীনের এইউদার ব্যবহারে চোর ভীষণ ভাবে অবাক হ’ল৷

Comments

নবীন বরণ

লেখক
মনিদীপ রায়

আলো-ছায়া খেলে যায় কত ভাবে এসে,

গাছে গাছে ফোটে ফুল কত ভালবেসে৷

হাসি খেলি নাচি মোরা খিল খিল করে’

আসে যে বা কাছাকাছি নিই তায় বরে৷

হাত ধরে চলি মোর এ পথ ’পর

হরিহর মন সাথে, নাহি তাই ডর৷

অরুণোদয়

লেখক
বীরূপাক্ষ

যতই ঘন হোক না কেন,

                রাতের অন্ধকার

আসবে ফিরে রাতের শেষে

                প্রভাত আবার৷

অন্ধকারে পিশাচের দল

                করুক অট্টহাস্য

সূর্যোদয়ের সঙ্গেই সব

                হবেই অদৃশ্য

নোতুন সূর্য প্রাউট যেদিন

                হবে উদিত,

গণতন্ত্রের মুখোশধারী

                রাত্রির পিশাচদের

                অবসান নেতৃত্ব৷

মানুষজাতির দুঃখের রাত

                দূরে সরবেই

সবার জীবনে অরুণোদয়

                হবেই হবেই৷

পুরাতন যায় নোতুন আসে

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

পুরাতন যায় নোতুন আসে

আনন্দে মন তাইতো হাসে

গত সনের ব্যর্থতারে

শুধরে নিতে চায় এবারে৷

চাওয়া পাওয়ার নেইতো শেষ

সেই পথে মন চায় যে অশেষ

প্রগতিতে গতি আনতে তাই

হারতে কভু নাহ যে চাই৷

আম বাঙালী একাত্মে ভাই

পয়লা বৈশাখ শপথ লই

সাজ-পোষাক ও বাংলা ভাষা

সাথী করে থাকব খাসা৷

নববর্ষের নোতুন আলো

লেখক
আচার্য প্রসূনানন্দ অবধূত

নববর্ষের নোতুন আলো

নাশুক সবার মনের কালো

হিয়ার মাঝে প্রদীপ জ্বেলে

তন্দ্রা ভেঙ্গে জাগিয়ে দিলে৷

প্রাণের পরাগ ছড়িয়ে দিলে

স্বপ্ণলোকের সুর শোনালে

কে তুমি মোর মন রাঙালে?

বিশ্বদোলায় সবে দোলালে৷

মধুর পরশে হরষে মাতালে

আলোর পথের দিশা দেখালে

বললে সবে এগিয়ে চল

নোতুন পৃথিবী গড়ে তোল৷

নাছোড়বান্দা চাটুকার

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

পৃথিবীর সব দেশেই, এমনকি সব শহরেই কিছু সংখ্যক খুশামুদে ও উন্নত মানের অনারারী মুসাহিব আছে৷ মাইনে পাওয়া মুসাহিবদের চেয়েও অনারারী মুসাহিবেরা আরও বেশী মুসাহিক্ষী করে থাকে৷ একটা গল্প বলি শোনো–

সে আজ প্রায় ৪০–৪৫ বছর আগেকার কথা৷ আমাদের শহরে একজন নামজাদা ডাক্তার ছিলেন৷ ধরো, তাঁর নাম অরুণ বাঁড়ুজ্জে৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জের যেমন ছিল হাত–যশ, তেমনি ছিল পসার৷ রোজগার করতেন দু’হাতে, দান–ধ্যানও করতেন দু’হাতে৷ এই অমায়িক পরোপকারী মানুষটির দরজা থেকে কোনো অভাবী মানুষকেই কখনও নিরাশ হয়ে ফিরতে হত না৷ স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁকে ঘিরে তৈরী হয়েছিল একটি খুশামুদে–চক্র৷ তিনি পসন্দ না করলেও এই খুশামুদেদের মধ্যেও কয়েকজন বেশ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও দক্ষ মুসাহিব ছিলেন৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে ছিলেন খুবই মাতৃভক্ত৷ শিশুপুত্রকে নিয়ে বিধবা হয়ে তাঁর মা কায়ক্লেশে পুত্রকে মানুষ করে তুলেছিলেন৷ একথা ডাঃ বাঁড়ুজ্জে সবাইকে বলতেন৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জের মায়ের বাড়াবাড়ি অসুখ৷ ডাক্তারেরা জক্ষাব দিয়ে গেছেন৷ তাঁরা বলেছেন–রোগিণী ক্ষড় জোর আর দিন দু’য়েক বাঁচতে পারেন৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে সেবা–যত্নের কোনো ত্রুটি করছেন না৷

কাগে–কোকিলে মুসাহিবদের কানে খবরটা তুলে দিলে৷ তারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়তে দৌড়তে ডাঃ

বাঁড়ুজ্জের বাড়ী ঘিরে ভীড় জমাতে লাগল৷ কেউ বললে–মাসীমা এমন ভাবে আমাদের ফেলে চলে যাবেন এ আমরা স্বপ্ণেও ভাবিনি৷ কেউ বললে–মাসীমা আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন এ যে দুর্বিষহ৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আস্তে আস্তে বললেন–আমার মা’কে আগে মরতে দিন৷ কেউ বা কোমরে গামছা বেঁধে, হাতে বাঁশ–কাটারি–দড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়ে বললে–মাসীমা ছিলেন সত্যিই পুণ্যশ্লোকা৷ এরকম মহীয়সী মহিলার কথা আমরা কোনো বইয়েই পড়িনি, আর কখনও কারো মুখেও শুনিনি৷ ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আবার আস্তে আস্তে বললেন–আমার মা’কে আগে মরতে দিন৷ যেসব মুসাহিব একটু পেছিয়ে পড়েছিল অর্থাৎ একটু বিলম্বে খবর পেয়েছিল তারা তাদের আফশোষ পুরো করে নিতে কসুর করলে না৷ কেউ বললে– মাসীমা যেমন ছিলেন তাতে তাঁর গতি শিবলোকেই হবে৷ কেউ কেউ উৎসাহের আধিক্যে বলে ফেললে–গত মাসের ৪০টা দিনই আমি তাঁকে একাদশী করতে দেখেছি৷ কেউ বা বললে–তাঁর গতি অবশ্যই বৈকুণ্ঠে৷ শিবলোকে গিয়ে তিনি হক্ষিষ্যি খেতে যাবেন কোন্ দুঃখে বৈকুণ্ঠে গিয়ে পোলাও–কালিয়া খাবেন৷ কেউ বা বললে–একজন জ্যোতিষী আমাকে বলেছিলেন, মাসীমার জন্যে গোলোকধামে একটা স্থান নির্দিষ্ট করে রাখা আছে৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে আর সহ্য করতে পারছিলেন না৷ তিনি বললেন–আপনারা কথাবার্ত্তা বলুন, আমি এক্ষুনি আসছি৷ মুসাহিবদের দল হাঁ হাঁ করে উঠে বললে–সে কী কথা সে কী কথা আপনি কোথায় যাবেন যাবার জন্যে তো আমরা তৈরী হয়েই এসেছি৷ ডাক্তারবাবু ওদের কবল থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে বললেন–আপনারা কথাবার্ত্তা বলুন, আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি৷ মুসাহিবের দল সমস্বরে বলে উঠল–সে কী কথা সে কী কথা আপনার এখন মাতৃদায়– মাতৃশোক৷ আপনি কোথায় যাবেন বাথরুমে যেতে হয় আমরা যাব, আমরা যাচ্ছি৷

ডাঃ বাঁড়ুজ্জে হতাশ হয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন৷ তখন তাঁর আর করবার কিছুই রইল না৷