প্রভাতী

গোবিন্দবাবুর ঝকমারি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গণ + অন্ন = গণান্ন৷ ভাবারূঢ়ার্থে ‘গণান্ন’ বলতে বোঝায় যে অন্ন বা খাদ্য অনেকের জন্যে পাক করা হয়েছে৷ যোগারূঢ়ার্থে গণান্ন বলতে বোঝায়–বিশেষ ধরনের গণ–নবান্ন উৎসব৷

সুপ্রাচীনকালে শস্য কর্ত্তনের পর কর্ষকেরা সবাই শিশু–বৃদ্ধ নির্বিশেষে সমস্ত গ্রামবাসী একসঙ্গে অন্ন ভাগ করে ভোজন করতেন চাষের জমিতে বসে৷ এই যে একটি বিশেষ ধরনের নবান্ন উৎসব সেকালের মানুষেরা পালন করতেন তার সঙ্গে তাঁরা খেতেন ছাঁচি কুমড়োর বড়ি, মাষ–কলাইয়ের (বিরি কলাইয়ের) ডাল৷ বৌদ্ধ যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বাঙলায় এই গণনবান্ন উৎসব চলত৷ পরে এই গণনবান্ন উৎসব ধীরে ধীরে উঠে যায়৷ নবান্ন হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক উৎসব৷ তার সঙ্গে ‘গণ’–সংযুক্তি থাকে না৷ তবে প্রাচীনকালের গণনবান্নের জের হিসাবে এখনও নবান্নের দিন শত্রুমিত্র নির্বিশেষে একে অপরকে ডেকে খাওয়ায়–পশুপক্ষীকেও খাওয়ায়–অনেকে নূতন বস্ত্র পরিধান করে৷ অনেকে ছাঁচি–কুমড়ো কুরে নিয়ে বড়ি তৈরী করে৷ অনেকে নূতন মাষকলাইয়ের (বিরিকলাই) ডাল খায় (বিরিকলাই বোনা হয় আষাা মাসে আর তোলা হয় আশ্বিন মাসে)৷ নবান্নের সময় তাজা বিরিকলাইয়ের ডাল পাওয়া যায়৷

এই গণনবান্ন উৎসব মগধ দেশে অন্য ভাবে পালিত হত৷ তাঁরা এইদিন সূর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতঃ সূর্যের পূজা করত৷ সূর্যের কৃপাতেই মেঘ তৈরী হয়, মেঘ থেকে বর্ষণ হয়–এই ভেবেই তারা সূর্যের পূজা করত৷ পূজা করত ভাদই ফসল বা আউশ ফসল উঠবার পরে কার্ত্তিক মাসে৷ বৈদিক বিধি অনুযায়ী সূর্য পুরুষ–দেবতা, চন্দ্র স্ত্রী–দেবতা৷ কিন্তু অষ্ট্রিক বিধি অনুযায়ী চন্দ্র পুরুষ–দেবতা ও সূর্য স্ত্রী–দেবতা৷ তাই প্রাচীন মগধের মানুষেরা সূর্যকে ছট্ঠি মাঈ অর্থাৎ ষষ্ঠীমাতা নামে সম্বোধন করত৷ পূজা দিত ওই ষষ্ঠী মাতাকে৷ যেহেতু এটি অষ্ট্রিক বিধান তাই এতে ব্রাহ্মণ–পুরোহিতের কোন স্থান নেই৷ অষ্ট্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিধি অনুযায়ী ষষ্ঠী মাতার পূজা অর্থাৎ ছট্ পূজা নারীরাই করত৷ অষ্ট্রিক পূজার উপাদান হিসেবে চালের গুঁড়ো, কলা প্রভৃতি উপকরণ থাকত৷ রবি ফসল কাটার পরে–চৈত্র মাসেও মগধের মানুষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আরও একবার সূর্যের পূজা করত৷ আজও মগধে এই দুই ছট পূজাই (কার্ত্তিকা ছট ও চৈতী ছট) চলে৷ জিনিসটা কতকটা অসাম্প্রদায়িক৷ ছোটবেলায় দেখেছি, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এই পূজা করছেন–মুসলমানেরাও৷ প্রাচীন মগধে ষষ্ঠীমায়ের প্রসাদ ঙ্মঠেকুয়াক্ষ গ্রামবাসীরা গ্রামের উত্তর–পূর্ব কোণে (ঈশান কোণ) বসে একত্রে ভোজন করত৷ এটাকেও বলতে পার এক ধরণের গণনবান্ন৷ অবশ্য পৃথক ভাবে নবান্ন উৎসবও মগধে ছিল বা আছে৷ বৌদ্ধ যুগের পর জাতিভেদ বাঙলার সমাজে জীবনে শিকড় গেড়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে এই একত্র–ভোজন বা গণনবান্ন বা নবান্ন–বিধি প্রায় উঠেই যায়৷ তবে একটু আগেই বললুম, নবান্নের অসাম্প্রদায়িকত্ব বা ব্যাপকত্ব আজও রয়েছে৷ কোন উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের মানুষেরা যদি একসঙ্গে বসে পঙ্ক্তি ভোজন করেন ও রান্নাগুলো যদি এক সঙ্গে হয় তবে এই বিরাট পঙ্ক্তিভোজন বা সাধারণ ভুরিভোজনকেও গণান্ন বলা হয়৷ এ ধরনের গণান্ন পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে... ভারতেও রয়েছে৷

যদি কিছু–সংখ্যক মানুষ কোন অপরিচিত স্থানে যায় বা  থাকে সেক্ষেত্রে তাকে বা তাদের যদি কোন গজ্জায় (হোটেলে) থাকতে হয় সেক্ষেত্রে দীর্ঘকাল গজ্জায় থাকতে থাকতে তাকে বা তাদের নানান ধরনের অসুবিধা ভোগ করতে হয়৷ কখনো কখনো সে তার পছন্দমত রান্নাবান্না পায় না, কখনো কখনো গজ্জার মালিক কম তেল–ঘি দিয়ে বেশী ঝাল প্রয়োগ করে আহারকারীর তেল–ঘিয়ের অভাব বোধকে ভিন্ন পথে চালিয়ে দেয়৷ ঝালের ঠ্যালাতেই সে আ–হা–হা....উ–হু–হু করতে থাকে৷ কখনো কখনো আবার কোন কোন স্থানে অল্প পরিমাণ বাসি জিনিস বেশী পরিমাণ তাজা জিনিসের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে পার করে দেয়৷ আমি বলছি না সমস্ত গজ্জা–মালিকই এমন করেন৷ তবে কেউ কেউ এমনটা করেন–এই খরবটা আমি পেয়েছিলুম আমার কম বয়সের বন্ধু বাবু গোবিন্দপ্রসাদ সিংয়ের কাছ থেকে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ ছিলেন বিহারের মুঙ্গের জেলার মানুষ৷ আমার এই জেলার মানুষেরা বুদ্ধিমান হলেও খুব সোজা বুদ্ধিতে চলে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদকে একবার জিজ্ঞেস করা হ’ল–আপনি কি সরকারী কার্যব্যপদেশে দু– চারদিনের জন্যেও কলকাতায় যাবেন? তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাত–মুখ নেড়ে প্রবল ভাবে আপত্তি জানিয়ে বললেন–না, না, কিছুতেই নয়, কিছুতেই নয়৷

আমি শুধোলুম–কেন?

আজন্ম নিরামিষাশী বাবু গোবিন্দপ্রসাদ বললেন–ওখানকার হোটেলে কী বলে কী খাইয়ে দেবে তার কোন ঠিক–ঠিকানা নেই, আমি যাব না৷

বাবু গোবিন্দপ্রসাদের অন্যান্য বন্ধুরা বললেন–যখন কলকাতায় যাবে, তখন প্রথমেই বলবে আমি নিরামিষ খাই–ভাত, ডাল, ঝালের ঝোল আর পটোলের তরকারী৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ কলকাতা গেলেন–যথাসময়ে ফিরেও এলেন৷ একদিন আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন–দেখি তাঁর মুখমণ্ডলে কালো মেঘ নেবে এসেছে৷ জিজ্ঞেস করলুম–কী হয়েছে? কী হয়েছে? কলকাতা কেমন লাগল?

উনি বললেন–এই কাণ মলছি, নাক মলছি, প্রাণ থাকতে দ্বিতীয়বার কলকাতায় যাচ্ছি না৷

আমি বললুম–কী হয়েছে?

তিনি বললেন–বন্ধুদের পরামর্শমত গিয়েই বললুম আমি খাই ভাত–ডাল–ঝালের ঝোল–পটোলের তরকারী৷

হোটেল মালিক সাগ্রহে বললে–প্রত্যেকটি জিনিস এখানে পাবেন–খেয়ে মেজাজ তররর হয়ে যাবে৷

আমি একটু খুশি মনে ভোজনের টেবিলে বসলুম৷ প্রথমেই দেখলুম রয়েছে জলের মত পাতলা মুসুরির ডাল৷ আমি সাঁতরে অনেকবার মুঙ্গেরের গঙ্গা পার হয়েছি৷ ভাবলুম ওই ডালের বাটিতে নেবে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিই৷ তাতে রয়েছে শীরফ জল৷ বাটির তলায় আড় চোখে তাকিয়ে রয়েছে কেবল দু–চারটে মুসুরির ডাল৷ পটোলের তরকারীতে তেল বা ঘি কিছুই নেই৷ তবে মীর্চ (লংকা) ঢালা হয়েছে প্রচুর৷ লংকার জ্বালায় যখন চোখ–নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে তখন আমি তরকারীতে যে তেল–ঘি নেই তা অনুভব করার শক্তি হারিয়ে ফেললুম৷ সবচেয়ে ফ্যাসাদ হ’ল ঝোলের বাটি টানতে টানতে৷ বাটি টানার সঙ্গে সঙ্গে মনে হ’ল কেমন যেন একটা মাছের বাজারের গন্ধ৷ রামজীর নাম নিয়ে কিছুটা ঝোল–ভাত মাখালুম৷ এক গ্রাস মুখে

ফেলতেই দেখি নির্ঘাত মাছের গন্ধ৷ (হিন্দী ভাষায় যেমন ‘বু’, মারাঠীতে তেমনি ‘মহক’ ও গুজরাতীতে ‘গন্ধ’)৷ এই মাছের মহক (ঝোলের) তার চেয়ে উগ্রতর৷ হোটেল–মালিককে শুধোলুম, ঝালের ঝোলে মাছের গন্ধ কেন? উত্তরের জন্যে তিনি তৈরীই ছিলেন৷ কাল বিলম্ব না করেই বললেন–জানেন তো, বঙ্গাল মে ধানের জমির পাশে মাছকা পুকুর হ্যায়৷ তাই ধানের জমিতে মাছের গন্ধ ভেসে আসতা হ্যায়৷ সেই জন্যে আপনি ঝোলেতে মাছের গন্ধ পাতা হ্যায়৷ ও কিছু নয়, ওনিয়ে আপনার ভাববার দরকার নেহী হেঁ৷ দু–চার গ্রাস ওটাই গলাধঃকরণ করলুম৷ চরম ফ্যাসাদ বাধল আর একটু পরে৷ এক গ্রাস ঝোল–ভাত মুখে ফেলতে যাচ্ছি এমন সময়ে আঙ্গুলে আটকা পড়ল মাছের একটা লম্বা হড্ডী (মাছের লম্বা কাঁটা)৷ আমি তখন হোটেল মালিককে বললুম–এ কেমন হ’ল? ভাতে না হয় মাছের গন্ধ এল কারণ ধানক্ষেতের পাশেই পুকুরে মাছ কিন্তু মাছের কাঁটা কী করে এল?

হোটেল–মালিক বললে–জেলেরা পুকুর থেকে মাছ ধরে এই ধানক্ষেতের মাছগুলো ফেলে কি না? ধান কাটার সময় দু–চারটে মাছের কাঁটাও উঠে আসে৷ এতে রাঁধবার সময় কয়েকটা কাঁটাও সেই ভাতে থেকে যায়৷

তাহলে বুঝুন, কী ফ্যাসাদ হয়েছিল৷ আমরা খাই ড়হেরী কা ডাল৷

যাই হোক্, পরের দিকে কেবল মুসুরের ডাল আর পটোলের তরকারী খেয়ে দিন কাটিয়েছি৷ আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷ এখন থেকে কাণ মলছি, নাকে খৎ দিচ্ছি আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷ (শব্দ চয়নিকা, ১৬/১৯৮)

বিশ্বকাপ

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

বিশ্বকাপের খেলা হয়ে গেল শেষ

কত ভাল খেলা হ’ল লাগল যে বেশ,

ফুটবলে আমরা অনেকটা পিছিয়ে

একদিন ঠিক মোরা যাব দেখো এগিয়ে৷

নীড় হারা

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিনহা

আমি নীড় হারা এক পাখী

অনন্ত নীলিমায় ভাসি দিবারাতি

পৃথিবীর কোন বাঁধনে নেইকো আমি বাঁধা

দূর আকাশে চাঁদের দেশে

আমার যাওয়া-আসা

গোধুলি বেলার রক্তরাগ প্রতিদিন মাখি

আমি নীড় হারা এক পাখী৷৷

তারাগুলো শোণায় যত অজানার কথা

জমিয়ে রাখি সব অচিন দেশের গাঁথা

হাওয়ার দোলায় মেঘের ভেলায়

দোলে আমার কান্না-হাসি

আমি নীড় হারা এক পাখী৷

বিশ্বজুড়ে কত ভাঙ্গা-গড়ার খেলা

দূর আকাশে ভেসে দেখে যাই একেলা

কোথাও শোষণ, কোথাও তোষণ

আপন আপন গরিমা ঘোষণ

আমি সবার পাওয়া হারাবার

                একটি নীরব সাক্ষী

আমি নীড় হারা এক পাখী৷৷

ব্যথা

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

অনুচ্চারিত সঙ্গীতের মত তোমার অস্তিত্ব

টের পাই মন্ত্র মথিত গোপন গভীর

সাত্ত্বিক সত্তায়৷

দ্বিধা থর থর কেটে যায়

বিলম্বিত বন্ধ্যা সময়

সময় কখনো হয় না ফলপ্রসূ

তুমি চলে গেলে, কাঁপিয়ে দিয়ে গেলে

মনন-ক্রিয়ায় সংস্থাপিত বিন্দু৷

যাওয়ার আগে কেন দিয়ে গেলে না

তোমার সত্য পরিচয়---

যা ছিল রহস্যময়,

যা ছিল আভাসে-ইঙ্গিতে, আচার্য-কথিত৷

তুমি চলে গেলে, দিয়ে গেলে শুধু

অনুভূতির জঠরে একরত্তি ব্যথা৷

তবু ভালো লাগে ব্যথা সইতে

সৃষ্টিশীল অন্তঃসত্ত্বা নারীর মতো৷

ডাকছে সে

সাধনা সরকার

মাঠ পেরিয়ে ঘাট পেরিয়ে

ছুটবো সবাই চল

নোতুন প্রভাত ডাকছে আজ

সূর্য্যিমামা ঝলমল৷

কে যাবি আয়,আয় না ছুটে

পরম লগন কাছে

আয় না পলাশ আয় না চাঁপা

মন ভোমরা  নাচে৷

 আলো আলো আলো

সবকিছুতে আলো

অন্ধ তামস ছুটে পালায়

সবকিছু আজ ভালো৷

কে যেন আজ দাঁড়িয়ে আছে

দেখ না কাছে দূরে

ডাকছে সে আয় না  কাছে

মোহন বাঁশির সুরে৷

গোবিন্দবাবুর ঝকমারি

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গণ + অন্ন = গণান্ন৷ ভাবারূঢ়ার্থে ‘গণান্ন’ বলতে বোঝায় যে অন্ন বা খাদ্য অনেকের জন্যে পাক করা হয়েছে৷ যোগারূঢ়ার্থে গণান্ন বলতে বোঝায়–বিশেষ ধরনের গণ–নবান্ন উৎসব৷

সুপ্রাচীনকালে শস্য কর্ত্তনের পর কর্ষকেরা সবাই শিশু–বৃদ্ধ নির্বিশেষে সমস্ত গ্রামবাসী একসঙ্গে অন্ন ভাগ করে ভোজন করতেন চাষের জমিতে বসে৷ এই যে একটি বিশেষ ধরনের নবান্ন উৎসব সেকালের মানুষেরা পালন করতেন তার সঙ্গে তাঁরা খেতেন ছাঁচি কুমড়োর বড়ি, মাষ–কলাইয়ের (বিরি কলাইয়ের) ডাল৷ বৌদ্ধ যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বাঙলায় এই গণনবান্ন উৎসব চলত৷ পরে এই গণনবান্ন উৎসব ধীরে ধীরে উঠে যায়৷ নবান্ন হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক উৎসব৷ তার সঙ্গে ‘গণ’–সংযুক্তি থাকে না৷ তবে প্রাচীনকালের গণনবান্নের জের হিসাবে এখনও নবান্নের দিন শত্রুমিত্র নির্বিশেষে একে অপরকে ডেকে খাওয়ায়–পশুপক্ষীকেও খাওয়ায়–অনেকে নূতন বস্ত্র পরিধান করে৷ অনেকে ছাঁচি–কুমড়ো কুরে নিয়ে বড়ি তৈরী করে৷ অনেকে নূতন মাষকলাইয়ের (বিরিকলাই) ডাল খায় (বিরিকলাই বোনা হয় আষাা মাসে আর তোলা হয় আশ্বিন মাসে)৷ নবান্নের সময় তাজা বিরিকলাইয়ের ডাল পাওয়া যায়৷

এই গণনবান্ন উৎসব মগধ দেশে অন্য ভাবে পালিত হত৷ তাঁরা এইদিন সূর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতঃ সূর্যের পূজা করত৷ সূর্যের কৃপাতেই মেঘ তৈরী হয়, মেঘ থেকে বর্ষণ হয়–এই ভেবেই তারা সূর্যের পূজা করত৷ পূজা করত ভাদই ফসল বা আউশ ফসল উঠবার পরে কার্ত্তিক মাসে৷ বৈদিক বিধি অনুযায়ী সূর্য পুরুষ–দেবতা, চন্দ্র স্ত্রী–দেবতা৷ কিন্তু অষ্ট্রিক বিধি অনুযায়ী চন্দ্র পুরুষ–দেবতা ও সূর্য স্ত্রী–দেবতা৷ তাই প্রাচীন মগধের মানুষেরা সূর্যকে ছট্ঠি মাঈ অর্থাৎ ষষ্ঠীমাতা নামে সম্বোধন করত৷ পূজা দিত ওই ষষ্ঠী মাতাকে৷ যেহেতু এটি অষ্ট্রিক বিধান তাই এতে ব্রাহ্মণ–পুরোহিতের কোন স্থান নেই৷ অষ্ট্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিধি অনুযায়ী ষষ্ঠী মাতার পূজা অর্থাৎ ছট্ পূজা নারীরাই করত৷ অষ্ট্রিক পূজার উপাদান হিসেবে চালের গুঁড়ো, কলা প্রভৃতি উপকরণ থাকত৷ রবি ফসল কাটার পরে–চৈত্র মাসেও মগধের মানুষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আরও একবার সূর্যের পূজা করত৷ আজও মগধে এই দুই ছট পূজাই (কার্ত্তিকা ছট ও চৈতী ছট) চলে৷ জিনিসটা কতকটা অসাম্প্রদায়িক৷ ছোটবেলায় দেখেছি, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এই পূজা করছেন–মুসলমানেরাও৷ প্রাচীন মগধে ষষ্ঠীমায়ের প্রসাদ ঙ্মঠেকুয়াক্ষ গ্রামবাসীরা গ্রামের উত্তর–পূর্ব কোণে ঙ্মঈশান কোণক্ষ বসে একত্রে ভোজন করত৷ এটাকেও বলতে পার এক ধরণের গণনবান্ন৷ অবশ্য পৃথক ভাবে নবান্ন উৎসবও মগধে ছিল বা আছে৷ বৌদ্ধ যুগের পর জাতিভেদ বাঙলার সমাজে জীবনে শিকড় গেড়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে এই একত্র–ভোজন বা গণনবান্ন বা নবান্ন–বিধি প্রায় উঠেই যায়৷ তবে একটু আগেই বললুম, নবান্নের অসাম্প্রদায়িকত্ব বা ব্যাপকত্ব আজও রয়েছে৷ কোন উৎসব উপলক্ষ্যে গ্রামের মানুষেরা যদি একসঙ্গে বসে পঙ্ক্তি ভোজন করেন ও রান্নাগুলো যদি এক সঙ্গে হয় তবে এই বিরাট পঙ্ক্তিভোজন বা সাধারণ ভুরিভোজনকেও গণান্ন বলা হয়৷ এ ধরনের গণান্ন পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে... ভারতেও রয়েছে৷

যদি কিছু–সংখ্যক মানুষ কোন অপরিচিত স্থানে যায় বা  থাকে সেক্ষেত্রে তাকে বা তাদের যদি কোন গজ্জায় (হোটেলে) থাকতে হয় সেক্ষেত্রে দীর্ঘকাল গজ্জায় থাকতে থাকতে তাকে বা তাদের নানান ধরনের অসুবিধা ভোগ করতে হয়৷ কখনো কখনো সে তার পছন্দমত রান্নাবান্না পায় না, কখনো কখনো গজ্জার মালিক কম তেল–ঘি দিয়ে বেশী ঝাল প্রয়োগ করে আহারকারীর তেল–ঘিয়ের অভাব বোধকে ভিন্ন পথে চালিয়ে দেয়৷ ঝালের ঠ্যালাতেই সে আ–হা–হা....উ–হু–হু করতে থাকে৷ কখনো কখনো আবার কোন কোন স্থানে অল্প পরিমাণ বাসি জিনিস বেশী পরিমাণ তাজা জিনিসের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে পার করে দেয়৷ আমি বলছি না সমস্ত গজ্জা–মালিকই এমন করেন৷ তবে কেউ কেউ এমনটা করেন–এই খরবটা আমি পেয়েছিলুম আমার কম বয়সের বন্ধু বাবু গোবিন্দপ্রসাদ সিংয়ের কাছ থেকে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ ছিলেন বিহারের মুঙ্গের জেলার মানুষ৷ আমার এই জেলার মানুষেরা বুদ্ধিমান হলেও খুব সোজা বুদ্ধিতে চলে৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদকে একবার জিজ্ঞেস করা হ’ল–আপনি কি সরকারী কার্যব্যপদেশে দু– চারদিনের জন্যেও কলকাতায় যাবেন? তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাত–মুখ নেড়ে প্রবল ভাবে আপত্তি জানিয়ে বললেন–না, না, কিছুতেই নয়, কিছুতেই নয়৷

আমি শুধোলুম–কেন?

আজন্ম নিরামিষাশী বাবু গোবিন্দপ্রসাদ বললেন–ওখানকার হোটেলে কী বলে কী খাইয়ে দেবে তার কোন ঠিক–ঠিকানা নেই, আমি যাব না৷

বাবু গোবিন্দপ্রসাদের অন্যান্য বন্ধুরা বললেন–যখন কলকাতায় যাবে, তখন প্রথমেই বলবে আমি নিরামিষ খাই–ভাত, ডাল, ঝালের ঝোল আর পটোলের তরকারী৷ বাবু গোবিন্দপ্রসাদ কলকাতা গেলেন–যথাসময়ে ফিরেও এলেন৷ একদিন আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন–দেখি তাঁর মুখমণ্ডলে কালো মেঘ নেবে এসেছে৷ জিজ্ঞেস করলুম–কী হয়েছে? কী হয়েছে? কলকাতা কেমন লাগল?

উনি বললেন–এই কাণ মলছি, নাক মলছি, প্রাণ থাকতে দ্বিতীয়বার কলকাতায় যাচ্ছি না৷

আমি বললুম–কী হয়েছে?

তিনি বললেন–বন্ধুদের পরামর্শমত গিয়েই বললুম আমি খাই ভাত–ডাল–ঝালের ঝোল–পটোলের তরকারী৷

হোটেল মালিক সাগ্রহে বললে–প্রত্যেকটি জিনিস এখানে পাবেন–খেয়ে মেজাজ তররর হয়ে যাবে৷

আমি একটু খুশি মনে ভোজনের টেবিলে বসলুম৷ প্রথমেই দেখলুম রয়েছে জলের মত পাতলা মুসুরির ডাল৷ আমি সাঁতরে অনেকবার মুঙ্গেরের গঙ্গা পার হয়েছি৷ ভাবলুম ওই ডালের বাটিতে নেবে সাঁতার কাটতে শুরু করে দিই৷ তাতে রয়েছে শীরফ জল৷ বাটির তলায় আড় চোখে তাকিয়ে রয়েছে কেবল দু–চারটে মুসুরির ডাল৷ পটোলের তরকারীতে তেল বা ঘি কিছুই নেই৷ তবে মীর্চ (লংকা) ঢালা হয়েছে প্রচুর৷ লংকার জ্বালায় যখন চোখ–নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে তখন আমি তরকারীতে যে তেল–ঘি নেই তা অনুভব করার শক্তি হারিয়ে ফেললুম৷ সবচেয়ে ফ্যাসাদ হ’ল ঝোলের বাটি টানতে টানতে৷ বাটি টানার সঙ্গে সঙ্গে মনে হ’ল কেমন যেন একটা মাছের বাজারের গন্ধ৷ রামজীর নাম নিয়ে কিছুটা ঝোল–ভাত মাখালুম৷ এক গ্রাস মুখে

ফেলতেই দেখি নির্ঘাত মাছের গন্ধ৷ (হিন্দী ভাষায় যেমন ‘বু’, মারাঠীতে তেমনি ‘মহক’ ও গুজরাতীতে ‘গন্ধ’)৷ এই মাছের মহক (ঝোলের) তার চেয়ে উগ্রতর৷ হোটেল–মালিককে শুধোলুম, ঝালের ঝোলে মাছের গন্ধ কেন? উত্তরের জন্যে তিনি তৈরীই ছিলেন৷ কাল বিলম্ব না করেই বললেন–জানেন তো, বঙ্গাল মে ধানের জমির পাশে মাছকা পুকুর হ্যায়৷ তাই ধানের জমিতে মাছের গন্ধ ভেসে আসতা হ্যায়৷ সেই জন্যে আপনি ঝোলেতে মাছের গন্ধ পাতা হ্যায়৷ ও কিছু নয়, ওনিয়ে আপনার ভাববার দরকার নেহী হেঁ৷ দু–চার গ্রাস ওটাই গলাধঃকরণ করলুম৷ চরম ফ্যাসাদ বাধল আর একটু পরে৷ এক গ্রাস ঝোল–ভাত মুখে ফেলতে যাচ্ছি এমন সময়ে আঙ্গুলে আটকা পড়ল মাছের একটা লম্বা হড্ডী (মাছের লম্বা কাঁটা)৷ আমি তখন হোটেল মালিককে বললুম–এ কেমন হ’ল? ভাতে না হয় মাছের গন্ধ এল কারণ ধানক্ষেতের পাশেই পুকুরে মাছ কিন্তু মাছের কাঁটা কী করে এল?

হোটেল–মালিক বললে–জেলেরা পুকুর থেকে মাছ ধরে এই ধানক্ষেতের মাছগুলো ফেলে কি না? ধান কাটার সময় দু–চারটে মাছের কাঁটাও উঠে আসে৷ এতে রাঁধবার সময় কয়েকটা কাঁটাও সেই ভাতে থেকে যায়৷

তাহলে বুঝুন, কী ফ্যাসাদ হয়েছিল৷ আমরা খাই ড়হেরী কা ডাল৷

যাই হোক্, পরের দিকে কেবল মুসুরের ডাল আর পটোলের তরকারী খেয়ে দিন কাটিয়েছি৷ আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷ এখন থেকে কাণ মলছি, নাকে খৎ দিচ্ছি আর ভুলেও কলকাতার পথ মাড়াচ্ছি না৷ (শব্দ চয়নিকা, ১৬/১৯৮)

বিশ্বকাপ

লেখক
ভবেশ কুমার বসাক

বিশ্বকাপের খেলা হয়ে গেল শেষ

কত ভাল খেলা হল লাগল যে বেশ,

ফুটবলে আমরা অনেকটা পিছিয়ে

একদিন ঠিক মোরা যাব দেখো এগিয়ে৷

নীড় হারা

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিনহা

আমি নীড় হারা এক পাখী

অনন্ত নীলিমায় ভাসি দিবারাতি

পৃথিবীর কোন বাঁধনে নেইকো আমি বাঁধা

দূর আকাশে চাঁদের দেশে

আমার যাওয়া-আসা

গোধুলি বেলার রক্তরাগ প্রতিদিন মাখি

আমি নীড় হারা এক পাখী৷৷

তারাগুলো শোণায় যত অজানার কথা

জমিয়ে রাখি সব অচিন দেশের গাঁথা

হাওয়ার দোলায় মেঘের ভেলায়

দোলে আমার কান্না-হাসি

আমি নীড় হারা এক পাখী৷

বিশ্বজুড়ে কত ভাঙ্গা-গড়ার খেলা

দূর আকাশে ভেসে দেখে যাই একেলা

কোথাও শোষণ, কোথাও তোষণ

আপন আপন গরিমা ঘোষণ

আমি সবার পাওয়া হারাবার

            একটি নীরব সাক্ষী

আমি নীড় হারা এক পাখী৷৷

ব্যথা

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

অনুচ্চারিত সঙ্গীতের মত তোমার অস্তিত্ব

টের পাই মন্ত্র মথিত গোপন গভীর

সাত্ত্বিক সত্তায়৷

দ্বিধা থর থর কেটে যায়

বিলম্বিত বন্ধ্যা সময়

সময় কখনো হয় না ফলপ্রসূ

তুমি চলে গেলে, কাঁপিয়ে দিয়ে গেলে

মনন-ক্রিয়ায় সংস্থাপিত বিন্দু৷

যাওয়ার আগে কেন দিয়ে গেলে না

তোমার সত্য পরিচয়---

যা ছিল রহস্যময়,

যা ছিল আভাসে-ইঙ্গিতে, আচার্য-কথিত৷

তুমি চলে গেলে, দিয়ে গেলে শুধু

অনুভূতির জঠরে একরত্তি ব্যথা৷

তবু ভালো লাগে ব্যথা সইতে

সৃষ্টিশীল অন্তঃসত্ত্বা নারীর মতো৷

ডাকছে সে

সাধনা সরকার

মাঠ পেরিয়ে ঘাট পেরিয়ে

ছুটবো সবাই চল

নোতুন প্রভাত ডাকছে আজ

সূর্য্যিমামা ঝলমল৷

কে যাবি আয়,আয় না ছুটে

পরম লগন কাছে

আয় না পলাশ আয় না চাঁপা

মন ভোমরা  নাচে৷

 আলো আলো আলো

সবকিছুতে আলো

অন্ধ তামস ছুটে পালায়

সবকিছু আজ ভালো৷

কে যেন আজ দাঁড়িয়ে আছে

দেখ না কাছে দূরে

ডাকছে সে আয় না  কাছে

মোহন বাঁশির সুরে৷

উদীচী

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

এক ভদ্রলোক থাকতেন কলকাতায়৷ তাঁর নাম–ধরো, মনোরঞ্জন ঘোষ–দস্তিদার৷ বাড়ী তাঁর বাখরগঞ্জ জেলার গাভা গ্রামে৷ এক বার তিনি গ্রামে যাবেন৷ গ্রামে যে লোকটি তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারকে দেখাশোনা করে, ধরো তার নাম গোপাল দাস৷ মনোরঞ্জনবাবু গোপালকে চিঠি লিখে জানালেন, অমুখ তারিখে গ্রামে যাচ্ছি৷ তুমি ষ্টীমার ঘাটে উপস্থিত থেকো৷

মনোরঞ্জনবাবুর অনুপস্থিতিতে ও অজ্ঞাতে তাঁর পরিবারে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে যা এখনো পর্যন্ত তাঁর জানবার ও শোণবার সুযোগ হয়নি৷ ষ্টীমার থেকে নেবে মনোরঞ্জনবাবু গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন–হ্যাঁ গোপাল, বাড়ীর সব খবর ভাল তো?

গোপাল বললে–হ্যাঁ কত্তা, সবাই ভাল, সব কিছুই ঠিকঠিক চলছে৷

তারপরে একটু ঢোক গিলে একটু উদীচী করে বললে–কেবল সেই এ্যাল্সেশিয়ান* কুকুরটি মারা গেছে৷

* আমরা প্রায় সকলেই এ্যালসেশিয়ান কুকুরের সঙ্গে পরিচিত৷ এ্যাল্সেশিয়ানকে কুকুর বলেই আমরা ধরি কিন্তু আসলে এটি ঠিক কুকুর নয়, এটি নেকড়ের একটি অতি নিকট প্রজাতি৷ তবে নেকড়ের সঙ্গে এর কয়েকটি মৌলিক পার্থক্যও আছে৷ বিশেষ করে চারটি পার্থক্য খুবই লক্ষণীয়৷

প্রথম পার্থক্য হল, নেকড়ের ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল সত্য কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ানের ঘ্রাণশক্তি নেকড়ের চেয়েও তীব্র দ্বিতীয় পার্থক্য এই যে নেকড়ে কুকুরকে দেখলেই খাক বা না খাক, হত্যা করে৷ এ্যাল্সেশিয়ান অতটা কুকুরবিদ্বেষী নয়৷ পোষমানা এ্যাল্সেশিয়ান তো একেবারেই নয় তৃতীয় পার্থক্য হ’ল, নেকড়ে নিজের ওজনের আড়াই গুন ওজন খাদ্য খেতে পারে৷ তারপর অবশ্য কয়েকটা দিন মড়ার মত পড়ে থাকে৷ এ্যাল্সেশিয়ান কিন্তু অত বেশী খায় না চতুর্থতঃ নেকড়ে সহজে পোষ মানতে চায় না৷ কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ান পোষ মানে ও অত্যন্ত প্রভুভক্ত৷ প্রাচীনকালে নেকড়ে ও শৃগালের বিমিশ্রণে যখন কুকুরের উৎপত্তি হয়েছিল এ্যাল্সেশিয়ানেরও উৎপত্তি তখন হয়েছিল কি না কাগজে–কলম তার কোন প্রমাণ নেই৷ তবে এ্যাল্সেশিয়ান নেকড়ে–শৃগালের বিমিশ্রণ হলেও তার মধ্যে নেকড়ের প্রভাব বেশি৷

পৃথিবীর সমস্ত প্রাচীন ভাষাতেই নেকড়ের উল্লেখ আছে, নামও আছে, কিন্তু এ্যাল্সেশিয়ানের নেই৷ সংসৃক্তে নেকড়েকে বলা হয় ‘বৃকব্যাঘ্র’৷ বৈদিক যুগের কিছু কিছু মানুষ নেকড়ে বাঘকে হত্যা করে তার মাংস, বিশেষ করে তার হূৎপিণ্ড খেত–এমন কিছু কিছু ভাসা ভাসা তথ্য পাওয়া যায়৷ অতি ঔদারিক হিসেবেও নেকড়ের কথা সংসৃক্ত সাহিত্যে তো  আছেই, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেও আছে৷

অতি ঔদারিকতার জন্যে মধ্যম পাণ্ডব ভীমের একটি নাম ছিল বৃকোদর (‘বৃকের  উদরের ন্যায় উদর যাহার’ এই ব্যাসবাক্যে বহুব্রীহি সমাস)৷ সেই মহাভারতে আছে না, পাণ্ডবরা যখন অজ্ঞাতবাসে ছিলেন তখন পাঁচ ভাই ভিক্ষালব্ধ অন্ন মাতা কুন্তীকে যখন এনে দিতেন তখন কুন্তী সেই অন্ন দু’ভাগে বিভক্ত করতেন৷ এক ভাগ কুন্তী ও চার ভাই মিলে খেতেন, অন্য ভাগ খেতেন ভীম একাই৷ ‘অর্ধ্ব খান কুন্তী সহ চারি সহোদরে/অর্ধেক ব’টিয়া দেন বীর বৃকোদরে৷৷’

সেই যে গল্প আছে না, কুন্তী ও চার ভাইকে একাদশীর ব্রত পালন করতে দেখে এক শুভক্ষণে ভীমেরও ইচ্ছা হ’ল একাদশীতে উপবাস করবার৷ ভীম বললে–মা, আম্মোও একাদশী করবো৷ সবাই যখন পারে আম্মোও পারি৷

কুন্তী বললেন–না বাবা, তোমার কষ্ট হবে, তোমাকে করতে হবে না৷

ভীম বললে–মা, কষ্টের জন্যেই তো জীবন৷ কষ্ট করতে এই মধ্যম পাণ্ডব পিছপা নয়৷ ‘‘দেহ আজ্ঞা করি উপবাস/ব্রত আমি পালিব নিশ্চয়৷’’

কুন্তী বললেন–আচ্ছা, তুমি চেষ্টা করো৷ তবে আমি তোমার জলখাবার তৈরী রাখব৷

ভীম সকাল ছ’টায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কুন্তীকে বললে–এই তো মা, দেখ ছ’’টা বাজল৷ এখনও আমি খাইনি৷ সওয়া ছ’টার সময় বললে, মা দেখ, ছ’টা বেজে পনের মিনিট, এখনও আমি তোমার কাছে জলখাবার চাইনি৷

কুন্তী বললে–আমি কিন্তু জলখাবার তৈরী রেখেছি৷ কেবল দুধটা একটু জ্বাল দিয়ে দোব৷

সাড়ে ছ’টার সময় ভীম বললে–মা, একটু যে ক্ষিদে পাচ্ছে৷ ‘‘তবু আমি দমিব না মাতঃ’’৷

কুন্তী বললেন–জলখাবার কি দোব?

ভীম বললে–মা, আরও একটু দেখি৷

ভীমের হাতঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা৷ ভীম বললে–মা, আর যে থাকতে পারছি না৷ এতক্ষণ পেটের ভেতর ছঁুচোয় কেত্তন গাইছিল, এখন যে কীৎ কীৎ খেলছে৷

কুন্তী বললে–বাবা, একটু ধৈর্য ধরো, আমি দুধটা জ্বাল দিয়ে নি’৷

দুষ্ট লোকেরা বলে, ভীম তারপর গরম দুধে ভিজিয়ে সাড়ে সাত মণ খই খেয়ে একাদশীর ব্রত উদ্যাপন করেছিল৷

ভীমের স্মরণে আজও সেই তিথিকে লোকে ভৈমী একাদশী বলে থাকে৷ যাই হোক, ভীমের নামে কেন ভৈমী একাদশী হয়েছিল বুঝলে তো

হ্যাঁ, বলা হচ্ছিল এ্যাল্সেশিয়ান কুকুরটির কথা৷ এ্যাল্সেশিয়ান কুকুর মারা গেছে শুণে মনোরঞ্জনবাবু মুষড়ে পড়লেন৷ তারপরে টাল সামলে নিয়ে গোপালকে শুধোলেন–হ্যাঁ গোপাল, তা কুকুরটার হয়েছিল কী?

গোপাল বললে–কী আর হবে কত্তা বাঘের লেখা ও সাপের দেখা, জন্ম–মৃত্যু–বিয়ে তিন বিধাতার নিয়ে–এই ব্যাপারে মানুষ আমরা কী করতে পারি ওই পোড়া মাংস খেয়েই কুকুরটা মরল৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন এ্যাঁ পোড়া মাংস কীসের পোড়া মাংস?

গোপাল উদীচীর পথ ধরে চলেছে৷ সে বললে–ওই যেদিন আপনার বাড়ীটা পুড়ে গেল না সেদিন আস্তাবলের ভেতরে থাকা ঘোড়াটাও যে পুড়ে মরে গেল৷ ওই পোড়া ঘোড়ার মাংস খেয়েই এ্যাল্সেশিয়ানটা মরল৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ আমার অমন প্রাণচঞ্চল আরবী ঘোড়াটা আর নেই৷ তুই বলিস কী রে

গোপাল বললে–ওই যেদিন বুড়ী মা কলেরায় মারা গেলেন তার ঠিক দু’দিন পরে৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ মা–ও নেই৷ বলিস কী গোপাল উদীচী করতে করতে গোপাল বললে–হ্যাঁ কত্তা, বুড়ী মা–ও গত হয়েছেন৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–কবে কলেরা হয়েছিল? আমি যে কিছুই জানি না৷

গোপাল বললে–তারিখটা ঠিক মনে নেই কত্তা৷ তবে খোকাবাবু যেদিন মারা গেল তার হপ্তা খানেকের মধ্যে৷

মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ খোকাটাও নেই তবে তুই যে বললি সব কিছুই এক রকম চলছে৷

গোপাল বললে কত্তা, উদীচী করছিলুম, ধাপে ধাপে বলছিলুম৷

মনোরঞ্জনবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন–খোকার কী হয়েছিল রে?

গোপাল বললে মা–মরা বাচ্চা ছেলে কি বাঁচে গিন্নী–মা মারা যাবার পর থেকেই তার ঠিক মত দেখাশোনা হচ্ছিল না৷ তাই খোকাকে আর বাঁচানো গেল না৷

স্ত্রীও মারা গেছেন শুনে মনোরঞ্জনবাবু বললেন–এ্যাঁ বলিস কী সেও নেই৷ তবে আর কাদের জন্যে গ্রামে যাব চল্, ষ্টীমার ঘাটেই ফিরে যাই৷

 

অভাব

লেখক
অরবিন্দ প্রামাণিক

অভাব অভাব অভাব

চারিদিকে শুধুই অভাব

            কীসের অভাব কেন অভাব?

            সব থাকতেও অভাব

অভাব নাহিকো চালের ডালের

শুধু দেওয়া আর নেওয়ার অভাব

            নাহিকো অভাব দুষ্ট বুদ্ধির

            সৎ লোকেরই অভাব৷

শাস্ত্র আছে জ্ঞানও আছে

বিজ্ঞানেরও যুক্তি আছে

            অভাব আছে সৎ সাহসের

            সৎ বুদ্ধির অভাব৷

নেতা আছেন মন্ত্রী আছেন

নিয়ম আছে কানুন আছে

            অসৎ লোকে ভরে আছে

            সৎ চরিত্রের অভাব৷

সমাজ আছে মানুষ আছে

ভেদ বুদ্ধির ভাষা আছে

            সমাজ চক্র ঘুরে চলে

            সদবিপ্রর অভাব৷

টাকা আছে পয়সা আছে

দুষ্ক্র্মেরই টাকা আছে

            সাদা টাকা কালো টাকা

            নিঃস্বার্থ সেবারই অভাব৷

বিদ্যা আছে বোধি আছে

জ্ঞান বিজ্ঞানে ভর্ত্তি আছে

            কিন্তু দালালেতে ভরে গেছে

            সৎ সেবারই অভাব৷

সমাজ গড়ো নোতুন করে

প্রাউটকে সঙ্গে নিয়ে

            সকলকে দিশা দিয়ে

            সকলকে সাথে নিয়ে

একই দিকে ধাই

যেন পরমপুরুষকে পাই৷