প্রভাতী

প্রপার নাউনের অনুবাদ

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

প্রপার নাউনের (proper noun) যেমন অনুবাদ করা অবিধেয় তেমনি তার উচ্চারণটাও যথাযথ রাখাই বিধেয়৷ দু’য়ের কোনোটাতেই সামান্যতম ব্যতিক্রম থাকা বাঞ্ছনীয় নয় অর্থাৎ প্রপার নাউনের উচ্চারণ ঠিকভাবে করতে হবে ও তার ব্যবহার কালে বা সম্ক্ষোধন কালে তার অনুবাদ করা চলবে না৷

আমার বন্ধু সর্দার হাজারা সিং বিলেত যাচ্ছিলেন৷ আমি ওকে বললুম, ‘‘ইংরেজীটা মোটামুটি শিখে নে৷ তোকে মিলটন, টেনিসন, শেক্সপীয়ার পড়বার দরকার নেই৷ তোর কাজ চালাক্ষার মত ইংরেজী শিখে নিলেই চলবে৷’’

সে বললে–‘‘আমি সেই রকমই শিখছি৷’’

কিছুদিন পরে সে আমাকে বললে–‘‘পরশু বিলেত যাচ্ছি৷’’

আমি জিজ্ঞেস করলুম–‘‘মোটামুটিভাবে ইংরেজী শিখে নিয়েছিস তো?’’

সে বললে–‘‘হান্ জী৷’’

আমি বললুম–‘‘যদি কেউ তোকে জিজ্ঞেস করে What's your name? তুই কী বলবি?’’ 

সে বললে–‘‘বলব , লীডার থাউজ্যাণ্ডা লায়ন৷ ইংরেজী মাষ্টার মশাই শিখিয়েছিলেন–‘সর্দারের’ ইংরেজী ‘লীডার’, আর হাজারের ইংরেজী ‘থ্যাউজ্যাণ্ড’৷ আমার নাম তো হাজার নয়, –‘হাজারা’৷ তাই ইংরেজী করে দিলুম ‘থাউজ্যাণ্ডা’৷ আর ‘সিং’–এর ইংরেজী ‘লায়ন’৷ তাই ইংরেজীতে আমার নাম ‘লীডার থাউজ্যাণ্ডা লায়ন’৷’’

সাড়ে চার ভাই

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

বিদুষকের কথা বলতে গিয়ে সেই চার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল৷ আর চার ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে সাড়ে চার ভাইয়ের কথাও মনের কোণে ভাসছে৷ সেকালে ভারতের কোন একটি তীর্থে আমাদের পারিবারিক পাণ্ডা যাঁরা ছিলেন তাঁদের পারিবারিক পরিচয় ছিল শালগ্রাম ভাণ্ডারী পাণ্ডা সাড়ে  চার ভাই৷ আমি তখন ছোট৷ ভাণ্ডারী পাণ্ডাকে অর্থাৎ বড় ভাইটিকে শুধোলুম–আচ্ছা, আপনারা সাড়ে চার ভাই কেন? আমি তো দেখছি আপনারা পাঁচ ভাই৷

পাণ্ডাজী একগাল হেসে বললেন–‘‘এই দেখ না খোকাবাবু, আমি একজন ঃ এক আর মেজভাই একজন ঃ দুই আর সেজভাই একজন ঃ তিন আর ন’ভাই একজন ঃ চার আর ছোটভাই  আধজন ঃ সাড়ে চার৷’’

আমি পাণ্ডাজীকে শুধোলুম–‘‘আপনার ছোট ভাইকে ‘আধজন’ কেন বলছেন? তার উচ্চতা তো আপনার চেয়েও বেশী৷’’

পাণ্ডাজী আবার একগাল হেসে বললেন, ‘‘আমরা চারজন যে বিয়ে করেছি, তাই আমরা একজন বলে হিসেবে আসছি৷ আর ছোটটির তো এখনও বিয়ে হয়নি, তাই সে ‘‘আধ জন’’৷

মাঘ

লেখক
প্রণব কান্তিদাশ গুপ্ত

হালুম হালুম আসছে তেড়ে

কাঁপছে ভয়ে বাচ্চা ধেড়ে৷

সন্ধ্যে হলেই দুয়ার এঁটে

সবাই ঢোকে লেপের পেটে৷

জবুথবু-জড়সড়

কেঁপে কেঁপে, মর মর৷

হিংস্র অতি সুতরাং সে

কামড় দেবে হাড় মাংসে৷

ভাবছো বুঝি বনের বাঘ?

বাঘ নয়কো শীতের বাঘ৷

ঘুড়ি      

লেখক
তাপস সিংহ

উড়ছে ঘুড়ি নানা রঙের

দেখতে লাগছে ভাল

কোনটা কাছে কোনটা দূরে

দিচ্ছে মনে আলো৷

কাগজে বোনা ঘুড়ি ও যে

সূতাটি বাঁধা লাটাইতে

যেমন সূতা ছাড়া হবে

ততটাই দূরে সরবে৷

আমরাও সবাই ঘুড়ি

ভাবছি উড়ছি আপন মর্জিতে

আসলে তা মিছে ভাবা

বাঁধা রয়েছি বিশ্ববিধাতার ইচ্ছেতে৷

 

সঞ্চয়–উপসঞ্চয়

লেখক
কল্যাণী ঘোষ

সারা বিশ্বের

           সঞ্চয়–উপসঞ্চয়,

ভরা আছে

           তোমারই দানে

কেন বুঝেও বোঝেনা

           সকল অবুঝ মন.....

           গ্রাসিতে চায় সকলি৷

সকল পেয়ে–মেটেনা তৃষা,

           চাই আরও চাই......

ক্ষণিক জীবনে–

           অন্তহীন চাওয়া৷

যারা অমানুষ–

           চায়না তোমায়,

শুধু চায়–

           তোমার সম্পদকে৷

আর যারা আছে–

           তুমি আছ জেনেও,

                কত অসহায়৷

আমরা তোমারই চরণে–

শরণ নিয়েছি পরম আশ্বাসে৷

     তোমার যন্ত্রকে–

     যেমনি চালাতে চাও,

           তুমি চালাও৷

আমরা সঁপেছি–

           মন প্রাণ......

আসুক বাধা,

           গান গেয়ে যাই আর

তোমার পতাকা

           বয়ে যাই৷

তোমার ইচ্ছায়

           ‘নোতুন পৃথিবী’ হবেই ধরায়৷

অঙ্গীকার

লেখক
প্রাজ্ঞ দেব

সূর্যোদয় হওয়ার আগে উঠবো আমি জেগে

যোগ সাধনা যোগাসন করবো সবার আগে৷

গুরুজনের আদেশ মেনে করবো সকল কাজ

বাধা বিপদ তুচ্ছ করে সফল করবো আজ৷

ভাই বোনেদের খুশী করে সবায় ভালবেসে

সবার দুঃখ দূর করবো সবাই মিলে মিশে৷

ভাল কথা ভাল কাজ ভাল খেলা যত

শিক্ষা, দীক্ষা, পড়া, শোণা, করবো যতন মত৷

সত্য কথায় সত্য পথে সদাই আমি চলবো

লোভ মোহ বশ করে সবায় সুযোগ দেবো৷

ধরাধামে বিশয়–আশয় আছে যত জেনে

সবই মিলে ভাগ করে নেবো উচিত মেনে৷

কাণ্ড

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গোপনে কাউকে উপদেশ-নির্দেশ দেওয়াকেও ‘কাণ্ড’ লা হয়ে থাকে৷ সবাইকে সদুপদেশ সকলের সামনে দেওয়া যায় না৷ এই যে ব্যষ্টিগত ভাবে কাউকে উপদেশ দেওয়া, একেও বলা হয় ‘কাণ্ড’৷

গোপনে পরামর্শ দেওয়া লতে একটা ছোট্ট গপ্প মনে পড়ে গেল৷ তোমরা  পা ছড়িয়ে সে মুড়ি-আলুর চপ খেতে খেতে  গপ্পটা শোণো৷

এক ছিল বামুণ.........এক ছিল বামণী৷ বামণী ছিল ড় দজ্জাল৷ বামুণকে সব সময় জ্বালা দিত৷ বামুণ যখন যেটি লত তাতে তাকে খেঁকিয়ে তো উঠতই আর করত তার উল্টোটা৷ একবার  বামুণ বামণীকে বললে, ‘‘দেখ বামণী, এই আসছে হপ্তায় আমার পিতামাতাঠাকুরের বাৎসরিক শ্রাদ্ধ? শ্রাদ্ধটাতো করতে হর্ে৷  তাই স ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করে রাখ’’৷

বামণী বললে, ‘‘কী ! কার শ্রাদ্ধ! ওসব শ্রাদ্ধ-টাদ্ধ কোন ভুতের হতে দোব না৷’

বামুণ বললে , ‘‘ভুতের নয়, আমার পিতাঠাকুরের’’৷

বামণী বললে, ‘‘তোমার পিতাঠাকুর কি এখন জলজ্যান্ত রয়েছে ! ভুত নয় তো কী! ওই শ্রাদ্ধ-পিণ্ডি-টিণ্ডি আমি এ বাড়িতে হতে দেবো না....দের্বা না..... দের্বা না...... দের্বা না--- এই বলে রাখলুম , তুমি নিকে রেখে দাও’’৷

বামুণ দেখলে গেতিক ৷ বামুণ তখন জয়-মা-কালী লে সেখান থেকে পিঠ টান দিলে৷ গিয়ে পৌঁছুল সোজা তাকে শুধোলেন ‘‘হ্যাঁ গা, এই  বে-টাইমে  ছুটতে ছুটতে এসেছ কেন? কী হয়েছে?

বামুণ তার দুঃখের  কথা সবিস্তারে গুরুকে নিবেদন করলে৷

গুরুঠাকুর ললেন, হ্যাঁ, এটা একটা ভাববার মত কথা’’৷ তারপর গুরু বামুনের  কাণে কাণে একান্তে একটা গোপন মন্ত্র দিয়ে দিলেন৷ বামুণ সেই মন্ত্র জপ করতে করতে  ঘরে ফিরে এল৷ বামুণ ফিরে এসে দেখে---বামণী একথালা ভাত আর সাতাশ ব্যঞ্জনের বাটি নিয়ে পা  ছড়িয়ে বসে বসে  খাচ্ছে আর তারিয়ে তারিয়ে শোজনের ডাঁটা চির্েবাচ্ছে৷ বাঁ-হাতে চেপে ধরে রেখেছে জল-ভর্ত্তি একটা প্রকাণ্ড খাগড়াই কাঁসার ঘটি৷

বামুণের আর তর সইল না৷ মন্ত্রের ফলাফল দেখবার জন্যে সে বামণীর কাছে এসে ললে, ‘‘দেখ বামণী, তোর কথাটাই রাখলুম৷ এ বৎসর আর পিতাঠাকুরের শ্রাদ্ধ কর্র না’’৷

বামণী ললে, ‘কী ! কার এত ড় আস্পর্র্দ যে লে শ্বশুরঠাকুরের শ্রাদ্ধ কর্র না৷ শ্বশুরঠাকুরের শ্রাদ্ধ করতেই হবে’’৷

বামুণ ললে, ‘‘যদি করতেই হয় তাহলে গঙ্গার ঘাটে একটা সস্তার পুরুৎ ডেকে এনে নমোনমঃ করে সার্র’’৷

 বামণী ললে, ‘‘এ্যাঁ, সে কী কথা ! আমার বাড়ীর সম্মান  নেই! ভাল ভট্চার্য-পুরুৎকে শ্রাদ্ধ করাতে হর্ে৷’’

বামুণ বললে, ‘‘তা না হয় হ’ল, কিন্তু এবার  আমার পয়সার টানাটানি৷ যজমান বাড়ী থেকে তেমন কিছু পাই নি৷ আলুর চাষ এবার মার খেয়েছে৷ তাই হয় গোণাগুণতি পাঁচটি বামুনকে  খাওয়র্বা, না হয় একটা ভুজ্যি দিয়ে দের্বা’’৷

বামণী বললে , ছি ! এ কী লজ্জার কথা ! অন্ততঃ পাঁচশ’ লোককে খাওয়াতে হর্ে৷ টাকাবার অভাব থাকলে আমি আমার দশভরির পাটিহারছড়াটাকে বেঁচে টাকার ব্যবস্থা করে দেবা৷’’

সব কাজ ঠিকঠাক চলছিল৷ বামুন মহা খুশী৷ গুরুঠাকুরের মন্ত্র  ঠিক ঠিক ফল দিয়ে চলেছে৷ এমন সময় বামন আনন্দে অধীর হয়ে মন্ত্রটাই ভুলে গেল৷ গুরুর দেওয়া গোপন মন্ত্র বিস্মৃতি তে চলে গেল৷ সপিণ্ডকরণের পর বামুণ বামণীকে  বললে, ‘‘দেখ বামণী, এই আলো-চাল, তিল আর শ্রাদ্ধের অন্যান্য উপকরণগুলো--- যা, গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে আয়৷’’

বামনী ললে, ‘‘কী , এত ড় আস্পর্ধা ! এইসব আজে বাজে জিনিস আমি গঙ্গায় গিয়ে বিসর্জন দিয়ে আসব! এই সগুলো আমি নালীতে ফের্ল..ফেলব...ফেলব৷’’

বামুন তো থ! মন্ত্রের গোপনীয়তা হয়তো ছিল কিন্তু মন্ত্রের মূল্যজ্ঞান ও মাত্রাজ্ঞান বিস্মৃতির আড়ালে  চলে গেছল৷ তাই না এই ফ্যাসাদ হল৷

তাই তোমরা ঝলে, গুরুঠাকুর বামুনকে যে গোপন নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকেও ‘কাণ্ড’ লা হয়৷

পতাকার রঙ

লেখক
দেশ সেবক

বলত দেখি পতাকায় মোদের

কয়টি রঙ আছে?

শিক্ষক এসে শুধালেন হেসে

দ্বিতীয় শ্রেণীর কাছে৷

 

একসাথে মিলে সব ছেলে বলে

চিৎকার করে জোরে

তিনটি বর্ণ রয়েছে রাঙানো

জাতীয় পতাকা জুড়ে৷

শ্রেণীর পিছনে বেঞ্চের কোণে

শিশু ছিল এক বসে,

‘পতাকার মাঝে পাঁচ রঙ আছে’

বলল সে মৃদু ভাষে৷

কথা তার শুণে বাকি শিশুগণে

হেসে খায় লুটোপুটি

শিক্ষক রেগে  বলে হেঁকে

বোঝাও কি করে পাঁচটি ?

 

মাথা নিচু করে  ভয়ার্ত স্বরে

সরল শিশুটি বলে,

ওপরে গেরুয়া মাঝখানে সাদা

সবুজ আছে তার তলে

আর আছে আঁকা গোলাকার চাকা

নীল রং আছে এতে৷

শিক্ষক বলে এটিকে ধরলে

তবুও হচ্ছে চারটে৷

অবোধ শিশুটি বলল তখন

রং আছে আর এক৷

লাল লাল ছোপ দাগ দেখা যায়

ওই পতাকার মাঝে৷

বাবাকে যখন  আনলে ওরা

কফিনের ঢাকা খুলে

জড়ানো রয়েছে দেহখানা তার

পতাকা আর ফুলে৷

রক্তের দাগে ছিল লাল ছোপ

ওই পতাকার মাঝে৷

এই নিয়ে  মোট হল পাঁচটি

এবার তো ঠিক আছে৷

 

সরল শিশুটির জবাবখানি

কাঁপিয়ে দিল বুক

অশ্রু এলো নয়নভরে

শুকনো হল মুখ৷

আজও যারা দেশের জন্যে 

করছে বলিদান

স্বাধীনতার  শহীদসম

তাদের অমর প্রাণ৷

হয়েছি স্বাধীন পেরিয়ে গেছে

সত্তরটি বছর

দেশ বাঁচাতে যাচ্ছে যে প্রাণ

রাখছি কি তার খবর?

একুশের আশ্বাস

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

একুশ ফেব্রুয়ারী---

তোমার ঊজ্জ্বল স্মৃতি বাঙালীর মর্মে গাঁথা

তুমি শোষিতের রুক্ষ অন্তরে ফল্গুর সরসতা৷

নিপীড়িত, বঞ্চিত বুকে জাগায়েছো আশা

তোমার পরশে মানুষ   পেয়েছে মুখের ভাষা৷৷

 

বাঙলার মাটি ভাষা-শহীদের রক্তে রাঙা

তারাই ভেঙেছে পরাধীনতার শিকল,

                শোষণ যন্ত্রণা৷

একুশের বলিদান গেয়েছে জীবনের জয়গান

পৃথিবীর কুর্ণিশে

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ সম্মান৷৷

 

মানব-ওষ্ঠে যতদিন রবে কথা,

ধমনীতে শোণিত

 একুশের আশ্বাস-বাণী সততঃ হবে উচ্চারিত৷

 অমর একুশের আহ্বানে মাতিবে 

                পুণর্বার বাঙলার আকাশ-বাতাস

সকল বাঙালীর বাসভূমি মিলি একসাথে

        রচিবে বাঙালীস্তান,

                                বাঙলার নূতন ইতিহাস৷৷

 

প্রার্থনা

লেখক
মনোজ পাতর

অন্ধকারের ভাবজড়তা ছিন্ন করে–

আলোর দিশা দাও হে প্রভু মুক্ত দ্বারে৷

চিত্ত করো ভয় শূন্য মুক্ত করো প্রাণ,

জ্ঞানের শিখা জ্বালিয়ে দিও ভালবাসার গান৷

মানব সেবার ব্রত দিও ধন্য করো জীবন,

সৃজনশীল ক্ষমতা দিও – বিশ্বপ্রেমের বন্ধন৷

সত্যনিষ্ঠার মন্ত্রবলে যেন করতে পারি জয়–

জনমানসের মন্ত্র যেন বলতে পারি অভয়৷

নোতুন–নোতুন প্রেরণা দাও–দাও ঈশ্বর প্রেমে

এ জীবন ধন্য করো আলোক সংগ্রামে৷