প্রভাতী

প্রভাতী

লেখক
প্রণবকান্তি দাশগুপ্ত

ও–ই ঘুচেছে অন্ধকার–

ও–ই খুলেছে বদ্ধদ্বার

ভোরের আলোর আলতো চুম

কাঁপালো শরীর ভাঙলো ঘুম৷

কালো রাতের বক্ষ চিরে

আলোর ধারা ঝরুক শিরে৷

বিহঙ্গরা ছেড়েছে নীড়,

ঢেউ ভেঙেছে নদীর তীর৷

সবুজ ক্ষেতের অবুঝ হাসি,

রাখাল বাজায় খুশীর বাঁশি

পাপড়ি মেলে ফুল দুললো

মউমাছিরা উৎফুল্ল৷

পাখীর শিসে ধানের শীষে

আনন্দ আজ কার যে কিসে৷

ভোরের আলো গায়ে মেখে

ঘর থেকে সব আনছে ডেকে৷

দুষ্টু যত ছেলেমেয়ে

বন বাদাড়ে ছুটছে ধেয়ে৷

ও–ই ঘুচেছে অন্ধকার

লাগলো প্রাণে ছন্দ কার?

গান্ধারীর নৈতিক বল

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গান্ধারী ছিলেন আফগান মহিলা৷ কান্দাহার৷ (ক্ষসৃক্তে ‘গান্ধার’) নামে এক দেশ ছিল ও গান্ধারী ছিলেন সেই দেশের কন্যা৷ তৎকালীন ভারতীয়রা কান্দাহারকে বলতেন ‘প্রত্যন্ত দেশ’ – সুদূর সীমান্তবর্তী দেশ৷ খাঁটি ভারতবর্র্ষ বলতে যা’ বোঝায়  তা’ নয়৷

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিরাট চরিত্র–মাহাত্ম্য সম্বন্ধে গান্ধারী সবিশেষ  অবগত ছিলেন৷ কান্দাহারের জনগণ বিশাল ভারতের জনসমাজেরই অন্তর্ভূক্ত ছিলেন৷ বিবাহের প্রাক্কালে যখন গান্ধারী জানতে পারলেন যে তাঁর ভাবী স্বামী অন্ধ, তিনি নিজেই চোখে পটি বেঁধে অন্ধ হলেন৷ যুক্তি দেখালেন, ‘‘যদি আমার স্বামী এই পৃথিবীটাকে দেখতে অসমর্থ হন, তবে আমিই বা সমর্থ হব কেন’’? তাই জন্মের মত তিনিও চোখে কাপড় বেঁধে দৃষ্টিহীন হলেন৷ কতখানি কঠোর নৈতিক বলের অধিকারিণী ছিলেন তিনি সারা জীবনে মাত্র দুবার তিনি চোখের পটি সরিয়েছিলেন – একবার, তাঁর স্বামী ধৃতরাষ্ট্রের নির্দেশে ও আরেকবার, কৃষ্ণকে দেখবার জন্যে৷

ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধন ও তার ভাইদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন মাতা গান্ধারীর কাছে গিয়ে যুদ্ধ জয়ের আশীর্বাদ চায়৷ তিনি পুত্রদের আরও নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন জননী গান্ধারীকে অনুরোধ জানায় যেন তিনি পুত্রদের উপর সস্নেহ দৃষ্টিপাত করেন যাতে তাঁর মানস শক্তিসম্পাতের ফলে পুত্রদের শরীরগুলো লৌহের মত সুদৃৃ হয়ে ওঠে৷ গান্ধারী প্রথম দিকে এই সব করতে অনিচ্ছুক ছিলেন৷ কিন্তু যখন ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং গান্ধারীকে সেই মর্মে নির্দেশ দিলেন, তখন গান্ধারী সেটা মেনে নিলেন ও কয়েক মুহূর্ত্তের জন্যে চোখের ওপর পর্দা সরিয়ে ফেললেন৷

ধৃতরাষ্ট্র আগে থেকেই পুত্রদের এই বলে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা যেন জননী গান্ধারীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সম্পূর্ণ নগ্ণ অবস্থায় থাকে, কারণ পুণ্যবতী গান্ধারী যখন পুত্রদের দেহের যে যে অংশের উপর স্নেহদৃষ্টি রাখবেন সেই অংশ সুদৃঢ় হয়ে উঠবে যা’ শত্রুর  সুকঠিন আঘাতেও অক্ষত থাকবে৷ যেহেতু পুত্ররা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক্ ছিল, তাই তারা মায়ের কাছে যাবার সময় সকলেই কৌপীন পরে গিয়েছিল, একেবারে নগ্ণ হয়ে নয়৷ ফলতঃ দেহের যে অংশ কৌপীনাবৃত ছিল, সেই অংশটা কোমল রয়েই গেল আর বাকী অংশটা লৌহকঠিন হয়ে উঠল৷

পাণ্ডবরা এই বৃত্তান্ত সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত ছিলেন৷ তাই গদাযুদ্ধের সময় ভীম কৌরবদের নাভির নিম্নাংশেই  আঘাত করতেন, কারণ নাভির উপরের অংশে আঘাত হেনে কৌরবদের মেরে ফেলা সম্ভব ছিল না৷ অবশ্য নাভির নিম্নাংশে আঘাত হানা সে যুগের প্রচলিত নিয়মবিরোধী ছিল৷ সে যুগে যুদ্ধকে একটা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মতই মনে করা হ’ত৷ হত্যার জন্যে যুদ্ধযাত্রা মানা হ’ত না৷ তাই যুদ্ধের প্রচলিত নিয়মগুলোকে মেনে চলতে হ’ত৷ গদাযুদ্ধের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বিপক্ষের নাভির নীচে আঘাত করা নিষিদ্ধ ছিল৷ কৌরবদের হত্যা করতে গিয়ে ভীমকে প্রচলিত নিয়ম লঙঘন করতে হয়েছিল৷

দ্বিতীয়বার গান্ধারী চোখের পটি খুলেছিলেন কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের পর৷ যুদ্ধান্তে সমগ্র কুরুক্ষেত্র একটা মহাশ্মশানে পরিণত হয়েছিল৷ গান্ধারীর বিধবা পুত্রবধূরা সকলেই তাঁদের নিজ নিজ স্বামীর মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করছিলেন, গান্ধারীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ মাতা কুন্তী সহ পঞ্চপাণ্ডব আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেখানে ঘটনাক্রমে উপস্থিত হন, কারণ পাণ্ডব পক্ষেরও অনেকেই  সেখানে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন ও তাঁদের আত্মীয়স্বজনদের সাত্ব্ন্না দেওয়া প্রয়োজন ছিল৷ কৃষ্ণ গান্ধারীকে শান্তনা দিতে গিয়ে বললেন, ‘‘আপনি কাঁদছেন কেন? পৃথিবীর এটাই নিয়ম, আপনিও একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন৷ কাজেই কাঁদবেন কেন? 

কৃষ্ণকে সম্বোধন করে গান্ধারী প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘‘কৃষ্ণ, তুমি আমাকে বৃথা শান্তনা দিতে চেষ্টা করছো৷ এটা তোমায় মানায় না৷’’

কৃষ্ণ জানতে চাইলেন, ‘‘কেন?’’ গান্ধারীর জবাব, ‘‘তুমি যদি এমনটি পরিকল্পনা না করতে, আমার পুত্ররা তাহলে প্রাণ হারাত না৷’’

কৃষ্ণ বললেন, ‘‘ধর্মের রক্ষা আর পাপের বিনাশের জন্যে এমনটি করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল৷ আমি কিই বা করতে পারতুম আমি তো যন্ত্রমাত্র৷’’

গান্ধারীর বক্তব্য ‘‘কৃষ্ণ, তুমি তো তারকব্রহ্ম৷ তুমি চাইলে অবশ্যই বিনা যুদ্ধে আমার পুত্রদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারতে৷’’

সত্যই তা’ হতেও পারত কিন্তু কৃষ্ণকে জগতের সামনে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়েছিল – পাপের পতন অবশ্যম্ভাবী৷ তিনি চেয়েছিলেন, যুদ্ধ হোক আর পৃথিবীর মানুষ তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক৷ বিনা যুদ্ধেই যদি তা’ সম্পন্ন হ’ত তাহলে লোকশিক্ষা হ’ত না৷ কৃষ্ণ চুপ করে রইলেন যদিও তাঁর স্বপক্ষে বলার অনেক কিছুই ছিল৷

মানুষের জীবনে প্রায়ই এ ধরণের ঘটনা ঘটে থাকে, যখন তার মনের ভাব ও মুখের ভাষা ঠিকই থাকে কিন্তু তবুও তাকে চুপ করে থাকতে হয়৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই রকম অবস্থা হয়েছিল৷ শ্রীকৃষ্ণ যেমন ভীষ্মের মত কঠোর নীতিবাদীকে সম্মান করতেন, সশ্রদ্ধ সম্ভাষণ করতেন তেমনি গান্ধারীকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন৷ তখন গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, ‘‘আমার পরিবারের সদস্যেরা যেমন আমার চোখের সামনে ধ্বংস হ’ল  তেমনই তোমার চোখের সামনেই যেন তোমার বংশও ধ্বংস হয়৷’’৷

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘‘বেশ, তাই হোক’’ আর তা–ই ঘটেছিল৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই অভিশাপকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন বলেই তেমনটি ঘটেছিল৷ যদি তিনি স্বীকার না করতেন তাহলে অবস্থাটা অন্য রকম দাঁড়াত৷ কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সেই অভিশাপ স্বীকার করে নিয়েছিলেন, কারণ তাঁর মনোগত ইচ্ছাটা ছিল এই যে নৈতিক শক্তি জনজীবনে গুরুত্ব পাক ও স্বীকৃত হোক৷ অন্যথা যদুবংশ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হ’ত না৷ গান্ধারীর মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যেই শ্রীকৃষ্ণের এই ধরণের আচরণ৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ন্যায়–ধর্মের বিজয়কে সুগম করার জন্যেই যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন ও তদুদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সব কিছুই করেছিলেন৷

জীবনে চলার পথে যেখানেই তিনি নীতিবাদীর সম্মুখীন হয়েছেন সেখানেই তিনি স্বেচ্ছায় নিজের পরাভব স্বীকার করে নিয়েছেন৷ যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এই পরাজয় স্বীকারটা  সঙ্গত হয়নি৷ তোমাদেরও শ্রীকৃষ্ণের জীবন থেকে এই শিক্ষাটা মনে রাখা উচিত৷ কোন মানুষ অন্যায়–বিচার করলে তোমরা কোন মতেই মাথা পেতে তা’ মেনে নেবে না৷ শ্রীকৃষ্ণ যেমনটি করেছিলেন, তোমারাও তেমনি দুর্নীতিপরায়ণদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, কিন্তু যদি দেখ কোন মানুষ যথার্থ নীতিবাদী, ধার্মিক, তংক্ষণাৎ নতিস্বীকার করবে৷ তাতে তোমাদের সম্মানই বৃদ্ধি পাবে৷

‘বেগুনগাছও বিরিক্ষি’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

‘‘যত্র বিদ্বজ্জনো নাস্তি শ্লাঘ্যস্তত্রাল্পধীরপ্৷

নিরস্তে পাদপে দেশে এরণ্ডোহপি দ্রুমায়তে৷৷’’

যেখানে সত্যিকারের বিদ্বান নেই সেখানে অল্পজ্ঞ ব্যষ্টিও শ্লাঘ্য অর্থাৎ বরণীয় রূপে গণ্য হন৷ যেমন যেদেশে বৃক্ষ নেই সেদেশে এরণ্ড (রেড়ির গাছ) বৃক্ষ রূপে সম্বোধিত হয়ে থাকে৷ ওপরের কথাটির কী জুৎসই বাংলা হবে একদিন আমি তা ভাবছিলুম৷ ভাবতে ভাবতে চলেছি হুগলী জেলার বেলুন গ্রামের পাশ দিয়ে৷ সবে সন্ধে হয়েছে৷ হঠাৎ দেখি দীর্ঘকায় দুই নারী নাকী সুরে চীৎকার করছে–একজনের হাতে আঁশবঁটি, অন্যের হাতে মুড়োঝাঁটা৷ তাদের নাকী সুরে বুঝলুম তারা মানবী নয়–পেত্নী৷ কথা শুনে মনে হল তারা দুই জা৷

ছোট জা বলছে–আমার সোঁয়ামীর মাঁস যেঁতে আঁয়ঁ ৩০০০ টাঁকা৷ আর ভাঁশুর ঠাঁকুরের মাঁত্তর ২০০০ টাঁকা৷ অথচ এঁক বেঁলা আঁমাকে রাঁন্নাঘরে বঁসে কাঁঠের উনুনের তাঁত সঁইতে  হয়৷ তাঁ আঁমি কেঁন কঁরব? আঁমি আঁর হেঁসেল ঠেঁলতে পাঁরব না৷ ওঁই সঁময়টা হঁয় সিঁনেমা দেঁখতে যাঁব, না হঁয় কোঁনো শ্যাঁওড়া গাঁছে চঁড়ে খাঁনিকটা হাঁওয়া খেঁয়ে আঁসব৷ তোঁর সোঁয়ামীর আঁয় কঁম৷ তুঁই দুঁ বেঁলা হাঁড়ি ঠেঁলবি৷

বড় জা বলছে–কঁথায় বঁলে, যেঁখানে বঁড় গাঁছ নেঁই সেঁখানে বেঁগুন গাঁছও বিঁরিক্ষি৷ (কথাটা আমি সঙ্গে সঙ্গে নোটবুকে টুকে নিলুম৷ বুঝলুম–এইটাই ‘‘এরণ্ডোহপি দ্রুমায়তে’’ কথাটার জুৎসই বাংলা)৷ তুঁই হাঁ–ঘরে হাঁ–ভাতে ছোঁট ঘঁরের মেঁয়ে৷ বাঁপের জঁন্মে এঁকসঙ্গে ৩০০০ টাঁকা দেঁখিসনি৷ এঁখানে এঁসে তাঁই দেঁখে ধঁরাকে সঁরা জ্ঞাঁন কঁরছিস৷ আঁজ থেঁকে আঁর পেঁত্নী বঁলে পঁরিচয় দিঁয়ে লোঁক হাঁসাস নিঁ৷ তঁবু যঁদি ৩০০০ টাঁকা সঁত্যিকাঁরের আঁয় হত মাঁইনে তোঁ পাঁয় ১০০০ টাঁকা৷ আঁর বাঁকীটা পাঁয় চোঁরাবাঁজারে হাঁসপাঁতালের চাঁদর, তোঁয়ালে, ওঁষুধ, ফিঁনাইল বাঁইরে পাঁচার করেঁ৷ আঁজ তোঁর ৩০০০ টাঁকার শ্রাঁদ্ধ কঁরছি৷ এঁই সঁব চুঁরি আঁর পাঁচারের কঁথা টিঁকটিকি বাঁবুদের (‘ডিটেক্টিব্’ মানে ইন্টেলিজেনস্৷ ‘ডিটেক্টিব’ শব্দ থেকেই ‘টিকটিকি’ শব্দ এসেছে) বঁলে দোঁব৷ তাঁরা গঁলায় গাঁমছা বেঁধে তোঁর মুঁখপোড়া সোঁয়ামীকে জেঁলে ঠেঁলে দেঁবে৷

পেত্নীর ছোট জা তখন বললে–তোঁর যাঁ ইঁচ্ছে কঁরগে যাঁ৷ আঁমি আঁশবঁটি দিয়ে টিঁকটিকির ন্যাঁজ কেঁটে দোঁব৷ আঁমার সোঁণার চাঁদ বাঁছাটা এঁকদিনও মাঁছের মুঁড়ো চোঁখে দেঁখতে পাঁয় নাঁ, আর তোঁর ভুতুমপেঁচা উনুনমুঁখোটা রোঁজ রোঁজ রুই মাঁছের মুঁড়ো চিবোঁচ্ছে৷ এ আঁর আঁমার সঁহ্য হঁয় নাঁ৷ নাঁরায়ণ  আঁজই এঁর এঁকটা হেঁস্তনেস্ত কঁরে দাঁও৷

পেত্নী দু’জন এতক্ষণ আমাকে দেখতে পায়নি৷ আমি আরও কাছে আসায় আমার জুতোর শব্দে তাদের হুঁস হল৷ তারা আমার দিকে তাকিয়ে দেখে তাদের দশহাত লম্ক্ষা জিব দাঁতে করে কেটে তাদের লজ্জানুভূতি জানাল৷ আমি বললুম–‘‘অত বেশী দাঁতে চাপ দিস নি৷ জিব কেটে খসে যাবে৷ তখন ঝগড়া করা জন্মের মত বন্ধ হয়ে যাবে–ক্ষোবা হয়ে যাবি৷’’ তখন তারা জিব ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে মাথায় প্রকাণ্ড ঘোমটা টেনে দিলে৷ ঘোমটা এত লম্বা করে টানলে যে ঘোমটার জেরে পিঠ হয়ে গেল একেবারে ফাঁকা গড়ের মাঠ৷

আমি আবার বললুম–‘‘তোদের এত লজ্জার কী আছে রে এত লম্ক্ষা ঘোমটা টানলে যে দেখতে পাবি না৷’’

তারা তখন ঘোমটা সরিয়ে ফেললে আর বললে–‘‘পেত্নী হঁলেও আঁমরা তোঁ মাঁনুষ–আঁমরাও তোঁ তোঁমার মেঁয়ে৷ তাঁই ঘোঁমটা আঁর দিঁলুম না৷’’

আমি বললুম–‘‘পিঠটা বরং ভাল করে ঢাক৷ শীত কম লাগবে৷’’

আমি বললুম–‘‘এই ভর সন্ধেয় তোরা ঝগড়াঝাঁটি করছিস, তোদের বাড়ীর পুরুষ মানুষেরা গেল কোথায়?’’

ওরা বললে–‘‘আঁমরা যঁখন ঝঁগড়াঝাঁটি কঁরি তঁখন ওঁরা এঁকটু তঁফাতে থাঁকে, ধাঁরে কাঁছে আঁসে না৷ লঁড়াই থেঁমে যাঁবার পঁর তাঁরা লাঁঠিসোঁটা নিঁয়ে ইঁউনিফর্ম পঁরে আঁমাদের কাঁছে এঁসে হঁম্বিতম্বি কঁরে বঁলে–আঁগে খবর কাঁহে নেহি দিয়া হ্যায়? ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া? সেঁই জঁন্যেই তুঁমি বাঁড়ীর পুঁরুষদের কাঁউকেই দেঁখতে পাঁচ্ছ না৷’’

আমি বললুম–‘‘অনেকক্ষণ ধরে চীৎকার করে তোদের গলা শুকিয়ে গেছে৷ খানিকক্ষণ গাছে চড়ে একটু জিরিয়ে নে৷’’

ওরা দুজনেই সামনের তালগাছটিতে তরতরিয়ে উঠতে গেল৷ আমি বললুম–‘‘দু’জনেই একটা তালগাছে উঠিসনি৷ তাহলে গাছে উঠে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ধাক্কাধাক্কি করে দু’জনেই নীচে পড়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে প্রাণ হারাবি৷ মানুষ ছিলি–একবার মরে পেত্নী হয়েছিস৷ আর একবার যদি মরিস তোদের কী গতি হবে আমি ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না৷ তাই শান্তিতে যদি জিরিয়ে নিতে চাস তবে তোরা দু’জনে দু’টো আলাদা আলাদা গাছে উঠে বস্৷’’

ওরা তখন দুটো আলাদা গাছে উঠে বসল৷ আমার জরুরী কাজ ছিল৷ ট্রেন ধরবার জন্যে তাড়াতাড়ি পাণ্ডুয়া ইষ্টিশনের দিকে চলেছি৷ পথ চলতে চলতে অনেক দূর থেকে কানে ভেসে আসছিল তালগাছের ওপর থেকে পেত্নীদের গাওয়া রাসভ রাগিণীতে ‘‘ফিল্মী গানে’’৷

যাই হোক, শিখলুম নোতুন কথা ঃ যেখানে বড় গাছ নেই সেখানে বেগুন গাছও বিরিক্ষি৷

মানবতা কাঁদে

লেখক
প্রভাত খাঁ

মাটির কাছাকাছি আছে যারা

তারাই কী শুধু শাস্তি পাবে?

বন্যায়, রোগে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে

শিকার হবে কী শুধু বার বার

রেমো, শ্যেমো যারা?

আকাশের পুষ্পরথে চড়ে

নির্মম ধবংসের কাণ্ড দেখে

ছিটে–ফোঁটা আর্তের ত্রাণে

দায়সারা নেতাদের কাজে

কখনো বাঁচে না তারা

মানবতা পথে পড়ে কাঁদে

সভ্যতার নামে এটা নিষ্ঠুর পরিহাস৷

কোটি কোটি মানুষের ন্যায্য সম্পদ

কুক্ষিগত করে রাখে যারা

তাদের দুয়ারে আজ পরোয়ানা জারি

হয়ে গেছে রক্ষা কেহ

       পাবে নাকো আর৷

যে আইন যে শাসন

কোটি কোটি মানুষের বঞ্চনার কারণ

হয়ে শোষকের শক্ত করে হাত,

সে কালা কানুন আর অন্যায়

শাসন, দূর হোক দেশ হতে৷

শোষণ বঞ্চনার মাঝে নারায়ণ

জেগে ওঠে, নিশ্চয়ই কেড়ে নেবে

জেনো, সেবা দিতে শাসনের ভার৷

কতকাল অপেক্ষার পরে

লেখক
বিশ্বপথিক

মরুবুকে হারায়েছে নদী

শ্যামলিমা গেছে সব মুছে

কাঁদিয়াছি কত যুগ ধরে

মানুষ সরে গেছে দূরে৷

পাখীরা দল বেঁধে এসে

বলে গেছে যাবে ব্যথা সরে

কৃপাবারি আসিয়াছে নামি

প্লাবন জাগিয়াছে বুকে৷

কতকাল অপেক্ষার পরে

আসিয়াছে ফিরে সেই তান

যে তান করেছে মহান

এ ধরার প্রাণে বারে বারে

 

একুশ তোমায় ভোলা না যায়

লেখক
শিবরাম চক্রবর্ত্তী

একুশের এই ফেব্রুয়ারী

    আমি কি ভুলতে পারি?

এই দিনেতেই ডাকার (ঢাকা) বুকে

    যুদ্ধ হয় যে জারি৷

রফিক, জব্বর, বরকত মিলে

    বাংলা ভাষা রক্ষায়,

খান সেনাদের বুলেট খেয়ে

    অমর হয়ে যায়৷

আজকের এই মহান দিনে

    শপথ নেওয়া চাই,

বাংলা ও বাঙালীর মোরা

    দুঃখ যেন ঘুচাই৷

মতদ্বন্দ্ব যতই থাকনা

    তারে শিকেয় তুলে,

বাঙালীর ভাব–ভাষার টানে

    যাই যেন সব ভুলে৷

আর চাই সৎ রাজনীতি

    প্রশাসনের স্বচ্ছতা

তা হলেই দুই বাঙলাই

    পাবে বেশি মান্যতা৷

গর্বের কথা–২১শের এই

    ফেব্রুয়ারীর দিনটাই

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার

    সম্মান পেল ভাই৷

বাংলা আমার দেশ, বাংলাকে ভালবাসি : প্রভাত সঙ্গীত

লেখক
শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার

বাংলা আমার দেশ, বাংলাকে ভালবাসি

বাংলার দুঃখে কাঁদি বাংলার সুখে হাসি৷

বাংলার ভাইবোনেরা মোর খেলারই সাথী

বাঙালীর হিয়া অমরা ঢেলে যায় প্রীতিনীতি

বাংলার ফুল ফল জল প্রভাতের স্মিত শত দল৷

যুগান্তরের নিরাশার কুযাশা দিক নাশি

বাঙলীর যত আশা বাঙালীর প্রিয় ভাষা

বিশ্বৈকতাবাদে ফিরে পাক প্রত্যাশা

বাঙালীর ছেলেমেয়েরা বাঙালীর বোধি পসরা

সার্থক হোক হে প্রভু মহতের ভাবে মিশি৷

 

দাদাঠাকুরের চিঠি

লেখক
সাধনা

ছোট্ট ভাইবোনেরা, তোমরা সবাই ছাত্র–ছাত্রা, প্রতিদিন তোমাদের বিদ্যালয়ের পাঠ শিখতে পড়তে হয়৷ তোমরা কোন একটা পাঠ বার বার পড়, আবার কিছুক্ষণ পরে ভুলে যাও, তাই না? বিদ্যালয়ের পড়া সহজে তোমাদের মনে থাকতে চায় না৷ অথচ যখন টেলিবিসনে কোনও কাহিনী দেখ বা কোনও গল্প শোন বা পড় তখন সেটা তোমাদের অনেকদিন মনে থাকে৷ কেন এমন হয় বলতে পার কি? না, এর কারণ হলো তোমার মনের একাগ্রতা৷ যখন তুমি কোন কিছু মনোযোগের সঙ্গে পড়ো বা শোনো বা দেখো তখন সেটা তোমার মনে থাকে৷ কিন্তু যখন চঞ্চল মনে কোন কিছু পড়ো, দেখো বা শোনো তখন তা আর মনে থাকে না৷

আমাদের মনটা অত্যন্ত চঞ্চল৷ তোমরা সবাই বানর দেখেছ? বানর খুবই চঞ্চল প্রাণী, এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারে না৷ এখন এই বানরকে যদি আকণ্ঠ মদ পান করানো হয় তাহলে কী হবে? সে আরও চঞ্চল হয়ে উঠবে৷  এই অবস্থায় তাকে যদি কয়েক হাজার ভীমরুল কাটতে থাকে তখন তার অবস্থা কেমন হবে? সে এত চঞ্চল হয়ে উঠবে যা কল্পনাই করা যায় না৷ মুনি ঋষিরা বলেন, মানুষের মন তেমনি চঞ্চল৷ মনের এই চঞ্চলতার জন্যেই আমাদের কোন কিছু মনে থাকতে চায় না৷ এখন কোন ভাবে যদি এই চঞ্চল মনটাকে স্থির করা যায় তাহলে মনের একাগ্রতা বেড়ে যাবে, আমাদের স্মৃতি শক্তি বেড়ে যাবে আর আমরা যা পড়বো, শুনবো বা দেখবো তা আমাদের মনে থাকবে৷

 তোমারা সূর্যের আলোতে তাপ আছে জানো? এক টুকরো কাগজকে রৌদ্রে রাখলে সূর্যের তাপ তাকে জ্বালাতে পারে কি? না, পারে না৷ কারণ সূর্যের তাপ চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে৷ এখন এই ছড়ানো সূর্যের তাপকে আতসী কাচের মাধ্যমে যদি এক বিন্দুতে আনা যায় তাহলে এই সূর্যের তাপ এক সেকেণ্ডের মধ্যে কাগজকে জ্বালিয়ে দিতে পারে৷ ঠিক তেমনি আমাদের চঞ্চল মনকে যদি কোন ভাবে একাগ্র করা যায় তাহলে মনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড শক্তি জাগে৷ আর এই মানসিক শক্তির দ্বারা আমরা বড় বড় কাজ করতে পারি৷ এই মানসিক একাগ্রতা থাকলে তোমরা যা পড়বে তাই মনে থাকবে৷ এখন অতসি কাচের মাধ্যমে যেমন সূর্যের তাপকে একবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করা যায় তেমনি সাধনার মাধ্যমে আমাদের চঞ্চল মনকে একাগ্র করা যায়৷ এর জন্যে নিয়মিত যোগসাধনা অভ্যাস করতে হবে৷ কেউ যদি নিয়মিত ব্যায়াম করে তাহলে যেমন সে শরীরিক শক্তি অর্জন করতে পারে৷ কিন্তু একদিন  মাত্র খুব করে ব্যায়াম করলে হবে কি? নিয়মিত অভ্যাস করতে হবে৷ তেমনি নিয়মিত মানসিক ব্যায়াম বা যোগ সাধনা অভ্যাসের দ্বারা মনকে শক্তিশালী করা যায়, একাগ্র করা যায়৷ আর এই একাগ্র মনে যদি ঈশ্বরের ভাবনা নাও তাহলে সহজেই তাঁকে উপলব্ধি করতে পারবে৷ আর মন একাগ্র না হলে ঈশ্বরের উপলব্ধিও সম্ভব নয়৷ তোমরা যদি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় মানসিক একাগ্রতা অর্জনের জন্যে যোগ সাধনা করো তাহলে তোমরাও জীবনে অনেক বড় বড় কাজ করতে পারবে৷ তোমরা স্বামী বিবেকানন্দের নাম শুনেছ, ঋষি অরবিন্দের নাম শুণেছ, নেতাজী সুভাষের নাম শুনেছ, এঁরা সবাই নিয়মিত যোগ সাধনা করতেন৷ পৃথিবীতে যত মহাপুরুষ এসেছেন তাঁরা সবাই নিয়মিত যোগ সাধনা করতেন৷ এই যোগ সাধনার দ্বারাই তাঁরা ঈশ্বরীয় শক্তি অর্জন করেছেন, বড় বড় কাজ করেছেন৷ আমাদের সবার পূজনীয় বরণীয়, স্মরণীয় হয়েছেন৷ তাই তোমরাও যদি নিয়মিত এই যোগ সাধনা করো তাহলে তোমরাও তাদের মত পূজনীয়, বরণীয়,স্মরণীয় হতে পারবে৷ আর ব্যষ্টিগত জীবনে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে পরমানন্দ  লাভ করবে৷

নীলকণ্ঠ

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

১২ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৩, এসেছিল মহাপাতকী দুরাচারী

ত্রস্ত চরণে, নিঃশ্ছিদ্র নিভৃত কারাগারে, চিকিৎসক-বেশে

যেথা শয়ান বিশ্বনিয়ন্তা, অন্তর্যামী, সর্বসন্তাপহারী

ঔষধের অছিলায় বিষ করিল প্রয়োগ দুর্বৃত্ত প্রভুর নির্দেশে৷

সহসা কাঁপিল ধরিত্রী, দাবাগ্ণি শিখায় প্রজ্জ্বলিত অরণ্যানী

প্রচণ্ড রোষে গর্জিল জলধি, তরঙ্গোচ্ছাসে, রুদ্ররবি-তপ্ত তীরে

স্তম্ভিত সমগ্র প্রকৃতি, ধীর-স্থির সকল পাদপ-প্রাণী

বিনামেঘে অতর্কিতে ঝলকিত অশণি, বিষণ্ণ্ অম্বরে

ভাঙ্গিল ধ্যান আগ্ণেয়গিরি, উৎসারিত অনল-ফুটন্ত লাভাস্রোতে

গগন-পবন পরিব্যাপ্ত আকস্মিক এক অজানা আশঙ্কায়

প্রমাদ গণিল মুনি-ঋষি যত, করজোড়ে, অবনত মস্তকে

ধরণী মাঝে ধাবমান বুঝি, অভূতপূর্ব কোন মহাপ্রলয়৷

অলক্ষ্যে হাসি, পৃথিবীর সমস্ত গরল আত্মস্থ করিলে হে নীলকণ্ঠ

দিব্য বরাভয়ে জড়-চেতন-স্থির-জঙ্গম সৃষ্ট সবে হ’ল নিঃশঙ্ক৷

ক্ষমতাগর্বী দাম্ভিক চেয়েছিল মহাসম্ভূতি

                                নাশিতে ছলে-বলে-কৌশলে,

ধর্ম-সত্য অজর-অমর-চিরভাস্বর, এই ইতিহাস রচিলে

                                পুনর্বার বিশ্ব নিখিলে৷৷

খন্ খন্ ঝন্ ঝন্

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

গম্ভীর শব্দের অর্থ হল জলের তলমাপক ভাব অর্থাৎ জলকে গম্ভীর বললে বুঝতে হবে সেটা অর্থই জল.... অনেকতলা পর্যন্ত সেই জল গেছে৷ যদিও শব্দটি আদিতে  জলপরিমাপক  হিসেবেই ব্যবহৃত হত কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরণের  অলঙ্কারে বিভিন্ন বস্তুর  তলমাপকতায় এর ব্যবহার হয়ে এসেছে৷ ভারী আবাজ, ভারী মনমেজাজ, ভারী চলন-বলন,  যার মধ্যে অনেক নীচ অবধি বা অনেক ভিতর পর্যন্ত মাপবার  প্রশ্ণ ওঠে তার জন্যে ‘গম্ভীর আবাজ হাসিবিহীন মুখকে লব গম্ভীর চলন৷ তবে মনে  রাখতে হবে মুখ্যতঃ এটি জলেরই  তলত্ব বা অতলত্বের  পরিমাপ৷

‘গম্ভীর’ শব্দের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল একটি কম বয়সের ঘটনার কথা৷ আমার জানা  এক ভদ্রলোকের স্ত্রী ছিলেন দারুণ দজ্জাল, উঠতে বসতে স্বামীকে খোঁটা দিয়ে কথা বলতেন৷ বচনের  ঝালে  তিনি অন্নপ্রাশনের  ভাতকেও  বমি করে বার করে দিতে লোককে বাধ্য করতেন৷ কিন্তু গোবেচারা*

(এখানে বেচারা মানে সাদাসিধে মানুষ..... সাত চড়েও যিনি রা-টি কাড়েন না৷ গোরু একটি শান্তশিষ্ট প্রাণী, মোষের মত)

একদিন ভোরে পশ্চিম দিকের পাহাড়টার দিকে বেড়াতে যাচ্ছি৷ দেখি, রাস্তার ধারে বটতলায় বসে রয়েছেন  সৌরেন সরকার ৷ ভদ্রলোক আমার বাবার চেয়ে বয়সে এক বছরের বড় ছিলেন৷ তাই তাঁকে জ্যাঠামশায় বলতুম৷ তাঁকে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে শুধোলুম--- কী জ্যাঠামশাই! এখন  এখানে  এভাবে বসে আছেন!

হ্যাঁ,প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে থালা বাসন-পত্র যদি সেই বাড়ীর কাছ দিয়ে তীব্রগতিতে ছুটে আসা রেলগাড়ীর শব্দে থালা-বাসনপত্রের দেওয়ালের গা ছেড়ে যখন  মাটিতে পড়ে যায় তখন একটা খন্ খন্ ঝনাৎ শব্দ নিশ্চয়ই শুণেছ৷ আবাজ কেমন বোঝাতে গিয়ে লোকে বলে খন্খন্ ঝন্-ঝন্ আবাজ ৷ এ আবাজ  কেবল বাসনেরই হয়, মানুষ বা অন্য জীবের হয় না৷ তবুও এ আবাজটি অনেক সময় মুখর বা মুখরা মানুষের অভিব্যাক্তি বোঝানোর সময় ব্যবহৃত হয়৷

(মেজাজী নয়, হরিণের মত ছটপটেও নয়, বেস শান্তশিষ্ট স্বভাবের৷ যে বেচারী মানুষটি একেবারে গোরুর মত শান্তশিষ্ট তিনি হলেন গোবেচারী৷ গোরুকে বেশী মারলেও সে শিঙ নেড়ে তেড়ে আসে না৷   মার সয়েই যায়--- বেশী মারে শিঙ নেড়ে তেড়ে আসে না৷ মার সয়েই যায়--- বেশী মারে  ক্কচিৎ কখনও কাঁদে৷  তাই কাউকে যদি গোরুকে মারার মত মারা হয় ও সে মার খেয়ে মরে যায়, সে ধরণের মারকে বলা হয় ‘গোবেড়ান্’--- কলকাতার কথ্য বাংলায় ‘গোবড়েন’৷ )

আমি সরকার জ্যাঠামশাইকে জিজ্ঞেস করলুম--- তা অত ভোরে এই বটতলায় বসে থাকার কারণটা কী?  তিনি লর্েন--- বাবা, সবই তো জানো, বাড়িতে চর্র্িশ ঘন্টা খন্ খন্ ঝন্-ঝন্৷ তা তোমার  জেঠীমার ভয়ে একটু গাছতলায় বসে শান্তি পাচ্ছি৷ খানিক বাদে  আবার বাড়ী ফিরতে হবে, তারপর অফিস যেতে হবে, তবু আর দশটা মিনিট বসে থাকি.....যতটুকু  সময় খন্ খন্, ঝন্-ঝনের  হাত থেকে  দূরে থাকা যায়৷

 তাহলে ঝলে এই গম্ভীর শব্দ যদিও জলের পরিমাপের জন্যে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত  হত কিন্তু আজ গম্ভীর  স্বভাবের  মানুষ, গম্ভীর চালচলন, গম্ভীর  চরণ-চারণা, গম্ভীর ধবনিবিন্যাস প্রভৃতি নানানভাবে নানান ব্যঞ্জনার বহ্বাম্ফোটে তরঙ্গের উত্তরণে সত্যিই মুড়ি-মুড়কির মতই ছড়িয়ে পড়েছে৷ শব্দটি তার সাবেকি গাম্ভীর্য আজ হারিয়ে ফেলেছে৷    

উৎস

(শঃচঃ ২০৷১৮)