সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশে ‘ আমার বাঙলা ‘ ,------ বাঙালীর , আমার বাঙলা‘র সংস্কৃতিই বাঙলার -, বাঙালীর পরিচয় ঃ ------ ২৩
প্রখ্যাত বাঙালী ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বাঙালীর সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলচনার শুরুতে বললেন‘‘ দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবন , আমাদের প্রতিদিনের অশন-বসন-, বিলাস-ব্যসন , চলন-বলন , আমোদ ---উৎসব , খেলাধুলা প্রভৃতি যা আমাদের মনন ও কল্পনা , অভ্যাস ও সংস্কারকে ব্যক্ত করে , অর্থাৎ এগুলি যা আমাদের মানস-সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে , এ সম্বন্ধে আমরা যথাষ্ট সচেতন নই৷ কোনও দেশকালবদ্ধ নরনারীর মনন-কল্পনা, ধ্যান-ধারণা , চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি শুধু ধর্মকর্ম-শিল্পকলা-জ্ঞানবিজ্ঞানেই আবদ্ধ নয় , এবং ইহাদের মধ্যে শেষও নয় , জীবনের প্রতিটি কর্মে ও ব্যবহারে , শীলাচরণ ও দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনচর্যার মধ্যেও তাহা ব্যক্ত হয় ৷ চর্চা যেমন সংস্কৃতির লক্ষণ , চর্যা বা আচরণও তাহাই এক হিসেবে চর্যা বা আচরণই চর্চাকে সার্থকতা দান করে , এবং উভয়ে মিলিয়া সংস্কৃতি গড়িয়া তোলে ৷ চর্যার ক্ষেত্র সুবিস্তৃত ৷ জীবনের এমন কোনও দিক বা ক্ষেত্র নাই যেখানে মানুষ মনন-কল্পনা বা ধ্যান-ধারণালব্ধ গভীর সত্য ও সৌন্দর্যকে জীবনের আচরণে ফুটাইয়া তুলিতে না পারে ৷ দৈনন্দিন জীবনাচরণের ভিতর দিয়া এই সত্য ও সৌন্দর্যকে প্রকাশ করাই তো সংস্কৃতির মৌলিক বিকাশ৷ দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক দিকটায় এই আচরণ যতটুকু প্রকাশ পায় তাহার সবটুকুই সেই হেতু মানুষের মানস সংস্কৃতিরই পরিচয় , এবং বোধ হয় তাহার মৌলিক পরিচয়ও বটে ৷
‘‘ স্বনামধন্য ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বললেন----‘‘ দীর্ঘকাল এক রাজ্যের অধীনে এবং পরস্পর পাশাপাশি বাস করিবার ফলে , তাহাদের সম্বন্ধ ক্রমশই ঘনিষ্ট হইয়া উঠিতেছিল এবং তাহারাই ভারতের অন্যান্য প্রদেশ হইতে পৃথক হইয়া কতকগুলি বিষয়ে বিশিষ্ট স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিতেছিল ‘৷দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাহাদের মৎস্য-মাংস-ভোজন , কোনপ্রকার শিরোভূষণের অব্যবহার , তান্ত্রিক ও শাক্তপূজার প্রাধান্য , প্রাচীন বঙ্গভাষা ও লিপির উৎপত্তি এবং শিল্পের বৈশিষ্ট্য প্রভৃতির উল্লেখ করা যাইতে পারে৷ইহাদের সবগুলি তাহাদিগকে নিকটবর্তী অন্যান্য প্রদেশের অধিবাসী হইতে পৃথক করিয়া একটি বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছিল৷‘‘ এই বৈশিষ্ট্য বাঙালীর সাংস্কৃতিক জীবনকেও পুষ্ট করেছে৷
প্রশ্ণ হ’ল আদতে সংস্কৃতি ব্যাপারটা কী ? সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের জীবনের সকল বহুমুখী অভিপ্রকাশ বা অভিব্যক্তির সামুহিক রূপ বা সমাহার ৷ কথাটাকে একটু অন্যভাবে বললে দাঁড়ায়--- অভিব্যক্তির যেটা সূক্ষ্মতর ও মধুরতর ভাব সেটাকে আমরা সাধারণত বলে থাকি সংস্কৃতি৷ আবার এর থেকে দুটো কথা পরিষ্কার --- ১. সংস্কৃতি হচ্ছে বৌদ্ধিক স্তরের ব্যাপার , আর ( ২ ). সংস্কৃতির একই অঙ্গে দুটি রূপ ,-- একটি জড়াভিমুখী বা স্থূল বা অমার্জিত , দ্বিতীয়টি সূক্ষ্ম বা মার্জিত-পরিশীলিত ৷ মানুষের সামুহিক অভিপ্রকাশের জড়াভিমুখী স্থূল রূপটাকে এককথায় কলা হয় ‘ কৃষ্টি ‘ ৷ তাহলে দাঁড়াল , জীবনের অভিজ্ঞতার স্থূল ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির সমষ্টিগত রূপই হচ্ছে সংস্কৃতি , আর কৃষ্টি হ’ল সংস্কৃতির অংশ বিশেষ৷ কার্যতঃ , ‘ কৃষ্টি ’ অভিব্যক্তির ক্রিয়াত্মিকা রূপ , আর তার বৌদ্ধিক স্ততরের পরিশীলিত ভাবটুকুর নাম সংস্কৃতি৷ যেমন হাত-পা-মুখ না ধুয়ে খাওয়াটা নয় , শুদ্ধাচার ও স্বাস্থ্য সম্মত বিধি অনুযায়ী খাওয়াটাই হচ্ছে সংস্কৃতি ৷ কাজেই , মানব গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে কৃষ্টিগত পার্থক্য থাকতে পারে , কিন্তু বিশ্বের সকল মানুষের সংস্কৃতি সব সময়ই এক৷ খাওয়া , পরা ,বাসকরা , শিক্ষা , চিকিৎসা , গান গাওয়া , সিনেমা-নাটক-সাহিত্য ছবি আঁকা ইত্যাদি অভিব্যক্তিগুলি কেবল মানুষের ধরণ , পশুদের নেই৷ তথাপি , অবশ্য লক্ষ্যনীয় , বিভিন্ন জায়গায় মানুষের সার্বিক অভিব্যক্তির ধরণ-ধারণে স্থানিক পার্থক্য এসেই যায়৷ তাই বাঙলা ও বাঙ্গালীর সংস্কৃতি বাঙলার মাটির দান , আশীর্বাদ ৷বাঙলার প্রকৃতিই বাঙালীর ব্যতিক্রমী সভ্যতা ও সংস্কৃতির রূপকার৷
সংস্কৃতি’র সঙ্গে আর একটি শব্দ একই তরঙ্গে উচ্চারিত হয় তা হ’ল ‘ সভ্যতা ‘৷ আমাদের জীবনের অভিব্যক্ত বিভিন্ন ভাবের মধ্যে শিষ্টাচারের যে সূক্ষ্ম ভাবটির সংস্পর্শে আমরা আসি তাকেই বলে ‘ সভ্যতা ‘৷ সংস্কৃতির মধ্যে ভাল-মন্দ দুটো দিকই থাকে, কিন্তু শিষ্টাচারের যে সূক্ষ্ম ভাব সেটাই সভ্যতার কষ্টিপাথর৷ এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্মরণীয়, --- সংস্কৃতি বা কালচারের মধ্যমে শিষ্টাচারের যে সূক্ষ্মবোধ পাওয়া যায় সেটা মানুষের সূক্ষ্ম বিচার ক্ষমতা বাড়ায়৷ তাই কাজে- কর্মে , আচার-আচরণে বিচারের সমর্থন যতটা বেশি থাকবে, সভ্যতার প্রকাশ তথা বিকাশ তত বেশী হবে৷ যাহোক, সংস্কৃতির সঙ্গে সভ্যতার পার্থক্য তো আছেই, তবে সে পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম৷ * সংস্কৃতি জীবনের সকল অভিব্যক্তির সামূহিক রূপ , আর সভ্যতা-সংস্কৃতি জাত শিষ্টাচারের সূক্ষ্মবোধ৷*সংস্কৃতি বৌদ্ধিক স্তরের অভিব্যক্তি , কিন্তু সভ্যতা ভৌতিক স্তরের অভিব্যক্তি ৷ * একজন মানসিক বিকাশের দিক থেকে সংস্কৃতি সমপন্ন নাও হতে পারে , কিন্তু সে ভৌতিক উন্নতির দিক দিয়ে সভ্য হতে পারে৷ * আরো তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে যে সংস্কৃতির মধ্যে থেকে মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশ হয় , মানুষ বিচারশীল হয় ৷ আর এখানেই উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বৌদ্ধিক বিকাশ না-হলে , বিচারশীল না-হলে সভ্য হওয়া যায় না৷ তাই সভ্যতা ও সংস্কৃতি একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠের মতো ৷
কোন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনের কথা বলতে গেলে তার ভূতাত্ত্বিক-ভৌগোলিক তথা প্রাকৃতিক পটভূমির দিকটাও নজর করা দরকার৷ এশিয়া বা ভারতবর্ষের মানচিত্রের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় যে বিস্তীর্ণ বঙ্গ-মহাভূমি বা মহাসংস্থানএর ভূমি-চৌহদ্দিকে প্রকৃতি দেবী একটা স্বতন্ত্র-অখণ্ডতা ---বিশিষ্ট ‘ ভৌগোলিক অঞ্চল ‘ বা সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন ৷ ( অবশ্য ‘‘ ভুগোল , ইতিহাস , অর্থনীতি , সংস্কৃতি , ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভারতবর্ষেও স্বাভাবিক কয়েকটি ভৌগোলিক বিভাগ দেখতে পাওয়া যায় , যথা----- বঙ্গদেশ , পঞ্জাব ---ইত্যাদি ৷ এইসব ভূখণ্ডের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা,নিজস্ব কৃষ্টি, নিজস্ব ইতিহাস,নিজস্ব নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব অর্থনৈতিক এবং নিজস্ব সামাজিক সমস্যা আছে৷ ‘‘ভবিষ্যতের বাঙালী---এস. ওয়াজেদ আলি )৷ এই স্বাভাবিক ভৌগোলিক বিভাগ বঙ্গদেশের উত্তরে হিমালয়, উত্তর পূর্বে --- পূর্বে দুর্গম পার্বত্যভূমি, দক্ষিণে সীমাহীন সমুদ্র , পশ্চিমে বিন্ধ্যপর্বতের শাখা সারি - উচ্চ মালূমি-ওগভীর অরণ্যাণী, মাঝে বহু নদী বাহিত পলল সমভূমই৷ এখানেই আছে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ সমভূমি -ম্যানগ্রোভ শোভিত ব-দ্বীপ অঞ্চল, বিশ্বের সর্র্বেৎকৃষ্ট উর্বর সমভূমি, অফুরন্ত নানাবিধ প্রাকৃতিক সম্পদ৷ এখানকার মাটির গুণ-স্বভাব স্থানীয় অধিবাসীদের দিয়েছে বাঙালী পরিচয় -বাঙালীয়ানা সীলমোহর৷ এজন্যে বিশ্বের জনসমুদ্রের মাঝখান থেকে খুব সহজেই বাঙালীকে চিনে নেয়া যায়৷ এক কথায় বাঙালীর সংস্কৃতিই এটা কে বহন করছে , বাঙালীর বুকের-মুখের ভাষা এর দোসর, বাঙলার স্বয়ম্ভর অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য এর চালিকা-শক্তি, হাজার হাজার বছরের সমসমাজ-তত্ত্ব আধারিত সামাজিক ঐতিহ্যে এর পথ চলা৷ (চলবে )
- Log in to post comments