আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

ঈশ্বরপ্রেম–সাফল্যের অপরিহার্য শর্ত্ত

তোমরা জান, অন্যান্য সকল বিষয়ে যত যত্নই নেওয়া হোক না কেন, তরকারিতে লবণ ঠিক মত না দিলে তা কখনও সুস্বাদু হয় না৷ তেমনই সসীম ও অসীমের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের যাবতীয় প্রয়াস বিফল হয় যদি ভক্তির অভাব ঘটে৷

পরমপুরুষের স্বগতোক্তি

পরমপুরুষের স্বগতোক্তিটি কী? –না, সেই স্বগতোক্তি হচ্ছে ঃ

‘ময্যৈব সকলং জাতং ময়ি সর্বং প্রতিষ্ঠিতম্৷

ময়ি সর্বং লয়ং জাতি তদ্ ব্রহ্মাদ্বয়মস্ম্যহ৷’

সব কিছু আমার থেকে উদ্ভূত হয়েছে, সব কিছু আমাতেই স্থিত রয়েছে, সব কিছু আমাতেই লীন হচ্ছে৷

‘ময্যৈব সকলং জাতং’৷ সব কিছু আমার থেকে সৃষ্ট হচ্ছে৷ অর্থাৎ তিনি চেয়েছিলেন যে তাঁর মনের মধ্যেই কিছু সৃষ্ট হোক, তাঁর মনের ভেতরেই একটা ভাবজগৎ তৈরী হোক, অর্থাৎ তিন তাঁর মানস কল্পনায় একটা বিশ্বসৃষ্টি রচনা করুন৷ আর তার ফলেই তৈরী হ’ল এই পরিদৃশ্যমান বিশ্ব৷

কলা বৌ / নবপত্রিকা প্রসঙ্গে

পুরাণের যুগে তো রীতিমত অনেক গল্প তৈরী করা হয়েছিল দেবী-দেবতাদের নিয়ে৷ তাতে গণেশের স্ত্রী হচ্ছেন তুলসী ৷ কিন্তু কোন কোন পুরাণের মতে গণেশের স্ত্রী হলেন ষষ্ঠী দেবী৷ পৌরাণিক সমাজে শিশু ভূমিষ্ঠ হবার একমাসের মধ্যে ষষ্ঠীর একটা পূজো হয়৷ আবার কোনও কোনও পুরাণের মতে কার্ত্তিকের স্ত্রী হলেন ষষ্ঠী৷ আবার ভারতের কোন কোন অংশে প্রচলিত স্থানীয় পুরাণের মতে গণেশের স্ত্রীর নাম সন্তোষী দেবী৷ পুরাণকারদের মধ্যে পারস্পরিক মতভেদ অত্যন্ত প্রবল ৷ যাইহোক, গণেশের পাশে যে কলা-বৌ থাকে সে কি গণেশের স্ত্রী নয়? সে কে তাহলে?

বিজয়োৎসব (বিজয়া)

প্রাচীন সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারে বছরে ছ’টা ঋতুর উল্লেখ আছে৷ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত৷ কিন্তু ভারতের অনেক স্থানে, বিশেষ করে সমুদ্রের তটবর্তী এলাকায় তথা পূর্ব ভারতে মূলতঃ চারটে ঋতু৷ সেগুলি হচ্ছে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত৷ ক্ষাঙলায় শীত ঋতু শেষ হতে না হতেই গরম শুরু হয়ে যায়৷ তাই বসন্ত ঋতু এখানে পনেরো দিনের জন্যেও স্থায়ী হয় না, আর হেমন্ত তো শীতেরই অঙ্গ৷

ভক্তের শ্রেষ্ঠত্ব

আমার মনে হয়, প্রপত্তি সম্পর্কে আমার কিছু বলা দরকার৷ বোধ হয়, সেটা আমার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব ও কর্ত্তব্যও৷ সংস্কৃতে প্র–পত্+ ক্তিন প্রত্যয় করে ‘প্রপত্তি’ শব্দটি নিষ্পন্ন৷ প্রপত্তির পেছনে মূল ভাবটা, মূল তাৎপর্যটা হচ্ছে এই যে আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু ঘটে চলেছে সবই পরমপুরুষের ইচ্ছার অভিপ্রকাশ৷ তার আদেশ(order) বিনা আগ্ণেয়গিরির অগ্ণ্যুদগীরণও হবে না, এমনকি একটা ঘাসের পাতাও নড়বে না৷ তাই পরমপুরুষ আগে থেকেই যেমনটি বন্দোবস্ত করে রেখেছেন, যেমনটি পরিকল্পনা করে রেখেছেন ঠিক তেমনটিই ঘটে চলেছে৷

দুর্গাপূজার ইতিহাস

রামচন্দ্র নাকি দুর্গাপূজা করেছিলেন--- তোমরা এ ধরণের একটা গল্পও শুণেছ বোধ হয়--- এটার প্রাসঙ্গিকতা কী, সেটা বলি৷ সে সম্বন্ধে বলতে গেলে আগে রামায়ণের কথা বলতে হয়৷ রামায়ণের গল্প ভারত,মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার মানুষদের মুখে মুখে চলছে ..দু/চার হাজার বছর নয়, আজ অনেক হাজার বছর ধরে৷ তবে এই রামায়ণকে লিখিত রূপ প্রথম দিয়েছিলেন মহর্ষি বাল্মীকি৷ এই লিখিত রূপ যখন তিনি দিয়েছিলেন সেটা শিবের যুগের অনেক পরে, বুদ্ধের যুগেরও পরে৷ তার দু’টো প্রমাণ আমাদের হাত রয়েছে৷ তার একটা প্রমাণ হচ্ছে,কোন্ বইটা কত পুরোনো সেটা তার ভাষা দেখে বোঝা যায়৷ ভাষাটা পুরোণো , তা হলে বইটাও পুরোণো৷ ভাষাটা নোতুন, তো বইটাও নোতুন৷ যা রামায়ণ বা

মুক্তির অধিকারী

আত্মজ্ঞানই হ’ল মুক্তির লক্ষণ, আর এই আত্মজ্ঞান মানুষ তখনই পায় যখন সে নিজ সুকর্মের ফলে মানুষের শরীর লাভ করে৷ মানবদেহ লাভ করলে তবে আত্মজ্ঞান হয়৷ দেখ, পশুজীবন ও মানবজীবন এই দু’য়ের মধ্যে মুখ্য পার্থক্য কী? দুই–ই পরমাত্মার সন্তান৷ একটি কুকুর, একটি বিড়াল আর একজন মানুষ–সবই পরমাত্মার সন্তান৷ কিন্তু দু’য়ের মধ্যে পার্থক্যটা এই যে, মানুষের বুদ্ধি উন্নত৷ মানুষ বোঝে যে শ্রেয় ও প্রেয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

ভক্তির সর্বোচ্চ ধাপ

আনন্দমুর্তি‘আমি পরমপুরুষের দাসানুদাস, তাঁর কাজ তিনিই করছেন, আমি তাঁর যন্ত্রমাত্র’–এই যে মানসিকতা একেই বলে ‘প্রপত্তি’৷ ‘প্রপত্তি’ শব্দের ব্যুৎপত্তি হ’ল ঃ প্র–পত্ + ক্তিন্ = প্রপত্তি৷ প্রপত্তিভাবের সাধক দুঃখকে দুঃখ, সুখকে সুখ বলে আদৌ মনে করেন না বস্তুতঃ সুখ–দুঃখকে তিনি সমভাবে প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেন৷

সদাশিবের আলোকে যোগ, রাজযোগ, অষ্টাঙ্গিক ও রাজাধিরাজ যোগ

আর্যরা ভারতে বসবাস করার  পরে অনার্য সমাজে জন্মেছিলেন এক বিরাট পুরুষ৷ মঙ্গোলীয়–আর্য মিশ্র কুলে জাত এই বিরাট পুরুষ ছিলেন উন্নতনাসা ও শুভ্রকান্তি৷ ইনি ছিলেন মহাতান্ত্রিক, মহাযোগী৷ অনার্য সমাজের এই মহাপুরুষ শিব নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন৷ একাধারে এত গুণ মানুষের মধ্যে যে থাকতে পারে এ কথা লোকে ভাবতে পারে না, তাই তাঁকে বলা হ’ত গুণাতীত বা নির্গুণ পুরুষ৷ তন্ত্রসাধনার ফলে এই শিব অর্জন করেছিলেন অলোকসামান্য শক্তি৷ এই শক্তিকে তিনি লাগিয়ে গেছলেন জনকল্যাণের কাজে৷ তন্ত্রশাস্ত্রকে সুসংবদ্ধরূপ ইনিই দিয়েছিলেন৷ তাই তান্ত্রিকের বা যোগীর ইনি ছিলেন গুরু–ইনি ছিলেন পিতা৷ এই ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষের দৃষ্টিতে উচ্চ–নীচ ভেদ ছিল ন

আধ্যাত্মিক প্রগতির তিনটি সোপান

প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্ণেন সেবয়া৷ আধ্যাত্মিক প্রগতি তিনটি তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল–প্রণিপাত, পরিপ্রশ্ণ, সেবা৷ ‘প্রণিপাত’ মানে এক অদ্বিতীয় শাশ্বত সত্তা পরমপুরুষের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ৷ এক্ষেত্রে সাধকের মনোভাব হচ্ছে এই যে বিশ্বের যা কিছু সবই পরমপুরুষের, আমার বলতে কিছু নেই৷ এটা হ’ল প্রণিপাত৷ আর যার অহংক্ষোধ রয়েছে, যে ভাবছে তার বিদ্যা–বুদ্ধি, ধন–সম্পত্তি বা অন্যান্য যাবতীয় বস্তু তার বৈয়ষ্টিক সম্পত্তি, সে সবচেয়ে বড় মূর্খ৷