এই রাজ্যের শ্রমিকরা ভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে,প্রাণহাণিও ঘটছে৷ এদের একমাত্র পরিচয় এরা বাঙালী, বাংলা ভাষায় কথা বলে৷ করোনা কাল থেকে এদের পরিচয় হয়েছে---পরিযায়ী শ্রমিক৷ যদিও এক দেশ, এক আইন, এক নির্বাচন আইনের ধবজাধারীদের কাছে কোন যুক্তি গ্রাহ্য জবাব পাওয়া যায়নে--- এক দেশ এক আইনের মধ্যে থেকেও এক রাজ্যের মানুষ জীবিকার সন্ধানে অন্যরাজ্যে গেলে পরিযায়ী হয় কেমনে৷ তাছাড়া এই নয় যে শুধু বাঙলা থেকেই মানুষ অন্যরাজ্যে জীবিকার সন্ধানে যাচ্ছে৷ অন্যরাজ্যের বহু মানুষও এই রাজ্যে জীবিকার সন্ধানে আসছে৷ বরং এই আসার সংখ্যাটা যাওয়ার থেকে অনেক বেশী৷
রাষ্ট্রনীতির বিচারে অবশ্যই পরিযায়ী নয়, তবে অর্থনীতির বিচারে পরিযায়ী, আরও স্পষ্ট করে বললে--- বহিরাগত৷ ভারতবর্ষের মতো পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বহিরাগত পরিযায়ী শ্রমিকরাই পুঁজিপতি শোষকের হাতিয়ার৷ রাজনৈতিক দলগুলোর সাহায্যে পুঁজিপতিরা এই শোষণ নিপুণভাবে চালিয়ে যাচ্ছে৷ এই শোষণের নমুনা দিতে দুটো ঘটনার উল্লেখ করতে হয়--- নলহাটির নইমুদ্দিন শেখ পরিবার নিয়ে মহারাষ্ট্রে ভাণ্ডুপে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন৷ হঠাৎ একদিন তিনি নিখোঁজ, পরে তার রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গেল৷ তিনি খুন হয়েছেন৷ তার প্রথম অপরাধ তিনি বাঙালী, দ্বিতীয় অপরাধ মালিকের কাছে প্রাপ্য আট লাখ টাকা চেয়েছিলেন৷ নলহাটিরই রাহুল সিং মুম্বাই -এ কাজ করতেন৷ তাঁরও প্রাপ্য টাকা না পেয়ে থানায় নালিশ করায় তার কান কেটে নেয়৷ কোনরকমে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে৷
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্যে অনেক সামাজিক প্রকল্প দিয়েছেন, যার কিছু কিছু আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসা পেয়েছেন৷ ভিনরাজ্যের অত্যাচারিত বাঙালী পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যেও মুখ্যমন্ত্রী শ্রমশ্রী প্রকল্প ঘোষণা করেছেন৷ ভিনরাজ্য থেকে ফেরার খরচ ছাড়াও এরাজ্যে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত পাঁচহাজার টাকা মাসিক ভাতা এক বছরের জন্যে, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে ও তাদের ছেলে মেয়েদের লেখা-পড়ার খরচও সরকার দেবে৷
অবশ্যই মানবিক ব্যবস্থা৷ কিন্তু এতে স্থায়ী সমাধান হবে কী? এরাজ্যেও বহু পরিযায়ী শ্রমিক আছে৷ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালী শ্রমিকরা অত্যাচারিত হলেও এরাজ্যে এখনও পর্যন্ত তার কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েনি৷ তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী অত্যাচারিত পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যে রাজ্যে বিকল্প ব্যবস্থা করলেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির কাছে কোন কড়া বার্র্ত পাঠান নি৷ এইসব নিয়ে এ রাজ্যেও মানুষের মনে ক্ষোভ জাগছে৷ বেশ কয়েকটি বাঙালী সংঘটন প্রতিবাদে পথে নেমেছে৷ প্রতিবাদের লাইন দীর্ঘ হলেই শুধু রাজ্যে নয়, গোটা দেশেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে৷
স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতীয় বাঙালীরা দিল্লির শাসকের বৈষম্যের শিকার৷ মোদি জমানায় বাঙলার প্রতি বঞ্চনা অনেকটাই বেড়ে গেছে৷ পশ্চিমবঙ্গে বার বার সাংঘটনিক প্রশাসনিক ও আর্থিক শক্তি প্রয়োগ করেও পরাজিত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তৈরী করছে মোদি সরকার৷ মুখ্যমন্ত্রীর শ্রমশ্রী প্রকল্প অত্যাচারিত পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষতে প্রলেপ দিলেও ক্ষোভের আগুণে জল ঢালতে পারেনি৷ তা তুষের আগুণের মতো ধিক ধিক করে জ্বলছে৷ যে কোন সময় দাবানলের রূপ নিতে পারে৷
এই পরিস্থিতিতে শ্রমশ্রী প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে৷ কারণ ভিন্রাজ্যে বাঙালী পরিযায়ী শ্রমিকরা মার খাবে আর এরাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা নিশ্চিন্তে কাজ করে যাবে এমনটা বেশী দিন চলবে না৷ তবে যেটা ঘটবে তাতে শোষিতের সঙ্গে শোষিতের দাঙ্গা বাঁধবে. পুঁজিপতি শোষকরা তাদের শোষণ অবাধে চালিয়ে যাবে৷
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সামাজিক প্রকল্পগুলি শোষিত জনগণের ক্ষোভ সামলাবার একটা পুঁজিপতি কৌশল৷ মুখ্যমন্ত্রীও সেই কৌশলের শিকার৷ তাঁর হাতে অন্য কোন উপায় নেই৷ উপায় আছে, কিন্তু সে পথে চলার সাহস বা সদিচ্ছা পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত কোন রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের নেই৷ কিন্তু কতদিন এইভাবে ভাতার দানে জীবন চলবে৷ তাই মানুষকে পথ বার করতেই হবে৷
সেই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্বের প্রবক্তা শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার ৷ বর্তমান পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রিত অর্থনীতির খোল-নলচে পাল্টে বিকেন্দ্রিত আর্থিক পরিকল্পনা তৈরী করতে হবে৷ মানুষের ভাষা-কৃষ্টি সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থিক সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলি বিবেচনা করে একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে৷ অঞ্চলগুলির আর্থিক পরিকল্পনা শুরু করতে হবে ব্লকস্তর থেকে৷ এই আর্থিক পরিকল্পনায় বহিরাগতের কোন স্থান হবে না৷ স্থানীয় মানুষের হাতেই থাকবে আর্থিক ক্ষমতা৷ বর্তমান বাঙলার সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের এটাই একমাত্র পথ৷ এই পথ দুস্তর হলেও দুর্লঙ্ঘনীয় নয়৷
- Log in to post comments