পশ্চিমি রাজনীতির বিষাক্ত বাতাসে আক্রান্ত বাঙালী৷ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতির ময়দানে পরাজয়কে স্বীকার করে নেবার মতো সহনশীলতা পশ্চিমিদের নেই৷ পশ্চিমিদের সঙ্গে প্রথম বাঙালীর পরিচয় ১৭৪১-৪২ সালে৷ বর্গী দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের নির্মম নৃশংসতার করুন ইতিহাস যদিও অবলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে, তবুও বাঙালীর স্মৃতি থেকে তা সম্পূর্ণ মুছে যায়নে৷ বার বার ভাস্কর পণ্ডিতের পরবর্তী পরাধীন ভারতে ও স্বাধীন ভারতেও বাঙলার রাজনীতি, অর্থনীতি শিল্প-সংস্কৃতি পশ্চিমাদের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে, হচ্ছে৷
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে নীতিগত বিরোধের কারণে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে গান্ধী মনোনীত প্রার্থী সীতারামাইয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেন সুভাষচন্দ্র বোস৷ কিন্তু নির্বাচিত সভাপতিকে মেনে নিতে পারেনি সেদিন জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী লবি৷ নির্বাচিত সভাপতি সুভাষচন্দ্রকে রুখতে গান্ধী লবির মঞ্চ থেকে আবাজ উঠেছিল---হিন্দুস্থান কা হিটলার কী জয়! মহাত্মা গান্ধী কী জয়৷ শুধু তাই নয় স্ট্যালিন, মুসোলিনী, হিটলারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল গান্ধীকে৷ অহিংসার পুজারী এই স্লোগানে হয়তো আপ্লুত হয়েছিলেন৷ তাই এই স্লোগানের কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে দেখা যায় নি৷ কিন্তু নীরব থাকলেন না বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ তিনি লিখলেন--- স্বাধীনতার মন্ত্র উচ্চারণ করার জন্যে যে বেদী উৎসৃষ্ট, সেই বেদীতেই আজ ফ্যাসিস্টের সাপ ফোঁস করে উঠেছে৷.....
পরস্পরের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সৌজন্য, যে বৈধতা রক্ষা করলে যথার্থভাবে কংগ্রেসের বল ও সম্মান রক্ষা হতো, তার ব্যভিচার ঘটতে দেখা গেছে৷ এই ব্যবহার বিকৃতির মূলে আছে শক্তি ও স্পর্র্ধর প্রভাব৷
সেদিনের দেশ ভাগ থেকে আজকের এই কদর্য রাজনীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অমর্যাদা, বিরোধী নেতৃত্বের প্রতি সৌজন্যতার অভাব, রাজনীতির ময়দানে পরাজিত হয়ে প্রতিহিংসা পরায়ণতা---এসবের মূলেই আছে পশ্চিমি রাজনীতির ফ্যাসিষ্ট শক্তির স্পর্ধা ও প্রভাব৷
ভারতবর্ষে এই ফ্যাসিষ্ট শক্তির প্রতিহিংসার বলি বাংলা ও বাঙালী জনগোষ্ঠী৷ বাঙলার ওপর শক্তি মদের হিংস্রতায় ডানপন্থি রামপন্থিতে কোন ভেদ নেই৷ তাই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট কাল রাত্রিতে বাঙলাকে বঞ্চনা করার যে অভিযান দিল্লি শুরু করেছিল, তা আজ ভয়াবহরূপ নিয়েছে৷ সেদিন কিন্তু দিল্লি ও রাজ্যে একই ডবল ইঞ্জিন সরকার ছিল৷ বিধান রায়ের মতো মুখ্যমন্ত্রীও নেহেরুর সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে দিল্লির সব বঞ্চনা, অবহেলা ও উৎপীড়ণ মেনে নিয়ে ছিল৷ আজ ব্যাতিক্রমী এক মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবাঙলায়৷ রাজ্য পরিচালনায় দোষ ত্রুটি থাকলেও অগ্ণিকন্যার অগ্ণি স্ফুলিংগে বাঙালী কিন্তু জ্বলে উঠছে৷ এই অগ্ণি স্ফুলিংগকে দীপাবলির আগুনে পরিণত করার উপযুক্ত মঞ্চ চাই৷ তবেই বাঙালী বিদ্বেষী সব কীটপতঙ্গ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে৷
বাঙালী একবার ফিরে তাকাক ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে৷ যে বাঙালী উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষায় বিদ্যায় বুদ্ধিতে সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, শিল্পে রাজনীতিতে, জ্ঞান গরিমায় সবার আগে ছিল সে আজ সবার নীচে কেন? স্বাধীনতার ৭৮ বছরে দিল্লির শাসকের উপেক্ষা বঞ্চনা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বাঙালীকে আজ এত নীচে নামিয়েছে৷ তার জাগতিক সম্পদ লুন্ঠন করছে, তার মানসিক সম্পদকে বিষাক্ত করছে তার উদার উন্নত অসম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিক সম্পদকে তথাকথিত ধর্মমতের অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ করে বিকৃত করছে৷ কিন্তু এই অবনমন শাশ্বত নয়৷ অতীতেও অনেক অন্ধকার বাঙালী অতিক্রম করে এসেছে, আজকের এই তমসাবৃত সকালও একদিন শেষ হয়ে যাবে৷ বাঙলার ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, বিমিশ্র ব-দ্বীপিয় সভ্যতা, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়, নিগ্রোয়েড বর্গীয় বাঙালীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে প্রাণশক্তির অভাব নেই৷ সব প্রতিকুলতাতে পদদলিত করে নির্ভীক মনে এগিয়ে চলার দুর্জয় ইচ্ছাশক্তি বাঙালীর আছে৷ পুরাতন জীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে তমসাবৃত আবরণ উন্মোচন করে বাঙালী আবার জেগে উঠবে, জেগে উঠবেই, জেগে উঠতেই হবে৷ মারের উপর মাথা তুলে দাঁড়াবার দুর্নিবার শক্তি বাঙালীর আছে৷ সেই আপন শক্তি বলেই বাঙালী বাঁচবে অন্যকেও বাঁচতে শেখাবে, বাঁচার পথ দেখাবে৷
বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক সর্বজন শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের আশার বাণী বাঙালীর নবজাগরণের প্রেরণা হোক---‘‘উনবিংশ শতাব্দীতে বিদ্যায়, জ্ঞানে বুদ্ধিতে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, শিল্পে কত বড় বড় দিকপাল জন্মেছিলেন এই বাঙলায়৷ আবার তাঁরা শেষ হয়ে গেলেন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে৷ তারপর এসেছে একটা অবোহ অবস্থার যুগ৷ আমি আশা করি--- শুধু আশাই করি না--- দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, এই অবোহের পরে অত্যন্ত নিকট ভবিষ্যতে সেই উহ আসছে৷ একেবারে চারিদিকে সবাই মণিদ্যুতিতে উদ্ভাসিত হয়ে এগিয়ে চলবে৷ গোটা পৃথিবীকে সাহায্য করবে এই বাঙলার মানুষ৷’’ সমস্ত প্রতিকুলতাকে প্রতিহত করে রুখে দাঁড়াবার দুর্জয় ইচ্ছাশক্তি বাঙালীকে তার গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবেই৷
দিল্লির তঞ্চকতার যোগ্য জবা দিয়ে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক স্বার্থপরতাকে দূরে সরিয়ে বাঙালী স্বীয় গৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াবেই৷
- Log in to post comments