Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

গোরক্ষা, গণপ্রহার ও নব্যমানবতাবাদ

জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

বেশ কিছুদিন যাবৎ  সংবাদ মাধ্যমগুলিতে  প্রকাশিত সংবাদের বৃহদংশই জুড়ে থাকে গোরক্ষার নামে  স্বঘোষিত গোরক্ষক বাহিনীর  তাণ্ডবে গণপিটুনির সংবাদ৷  গোমাংস রাখার  বা বহন করার অপরাধে, গবাদি পশু পাচারের ভুয়ো অভিযোগে একসঙ্গে অনেক লোক জড়ো হয়ে গণপিটুনির দ্বারা হত্যার ঘটনা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ লক্ষ্যনীয় যে, ২০১৫ সাল থেকে  এই ধরণের পৈশাচিক কাণ্ড লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে৷  ২০১৫ সালেই উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে  বাড়ির ফ্রিজে গোমাংস রাখার অপরাধে (যদিও এর কোন প্রমাণ  পাওয়া যায় নি) মহম্মদ আখলাখকে পিটিয়ে মারা হয়৷  ট্রেনে ভ্রমণকারী এক কিশোরের ব্যাগে গোমাংস আছে, এই অজুহাতে তার উপর গণপিটুনি চলে৷  গত বছর এপ্রিলে রাজস্থানের অলওয়াড়ে গো-পাচারের অভিযোগে  পহেলু খানকে পিটিয়ে হত্যা করে স্বঘোষিত গো-রক্ষকের দল৷  সেই অলওয়ারেই  অতি সম্প্রতি  গত ২০শে জুলাই  ২০১৮, শুক্রবার রাতে আকবর খান ও আসলাম খান নামে দুই যুবক গোরু পাচারকারী সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়৷ প্রকৃতপক্ষে আকবর ও আসলাম (হরিয়াণার কোলগাঁও গ্রামের বাসিন্দা)  দুটি গোরু কিনে ফিরছিলেন৷ রাত ১২টা নাগাদ অলওয়ারের রামগড়ের লালাওয়ান্ডি গ্রামে  তারা কয়েকজন দুষৃকতীর দ্বারা আক্রান্ত হন৷  কিল, চর, লাঠি, বাঁশের আঘাতে প্রায় মুমুর্ষূ আকবর খান মৃত্যুকালীন জবানবন্দীতে  এই ঘটনার কথা পুলিশকে জানান৷  এইভাবে বিভিন্ন অজুহাতে  ভুয়ো সংবাদের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গণপিটুনিতে নিরীহ নিরপরাধ মানুষজনকে  আক্রান্ত হতে হচ্ছে৷ কখনো গোমাংস রাখা বা বহন, কখনো গোরু পাচার, কখনো ছেলেধরা গুজবে বা  নারী পাচারের অভিযোগে গণপ্রহারের ঘটনা ঘটেই চলেছে৷ গণরোষ, গণপ্রহার ইত্যাদির দোহাই দিয়ে  মানুষ হত্যার মতন মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রকৃত দোষীকে চিহ্ণিত বা শাস্তি দান সম্ভব হচ্ছে না৷  জনগণের চোখে ধূলো দেওয়ার জন্যে দু একটি ক্ষেত্রে  ১/২ জনের গ্রেফতারী দেখালেও  উত্তেজনা কমে যেতেই তাঁরা জামিনে খালাস হয়ে যাচ্ছে৷ পরে আর সেই কেসের বিশেষ নাড়া চাড়া হচ্ছে না৷

এই গোরক্ষার নামে গণপিটুনির ঘটনার বিষয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে৷ কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাক্রম নিয়ন্ত্রণের দায়  রাজ্যগুলির উপরেই চাপিয়েছেন৷ যদিও ১৭ই জুলাই ২০১৮ তারিখে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপকমিশ্রের বেঞ্চের রায় অনুযায়ী--- গণপ্রহারকে পৃথক আইনী অপরাধের  তকমা দিয়ে  তারজন্য শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে ও  এই মর্মে সংসদে বিশেষ আইন আনতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে৷ এই বিশেষ আইন  এইধরণের কাজে জড়িয়ে পড়া মানুষের  মনে ভয় ঢোকাবে৷ এছাড়া  রাজ্যগুলিতে  প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারকে  নোডাল অফিসার  নিয়োগ করে --- স্পেশ্যাল টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে৷  পুলিশ সুপার ও ডি.জি. পর্যায়ের নিয়মিত বৈঠক করে  পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হবে৷ সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যারা  বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার চালাচ্ছে,  তাদের চিহ্ণিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে৷  দায়িত্ব পালনে  ব্যর্থ পুলিশদের বিরুদ্ধে  বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে৷  গণপিটুনির ঘটনায়  দ্রুত অভিযোগ দায়ের ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে৷  গণপিটুনির ঘটনায় ধৃতদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে হবে৷ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের  অভিমত---‘‘এই ভয়ঙ্কর ভিড়তন্ত্রকে  কোনোভাবেই ছাড়পত্র দেওয়া যায় না৷ গণপ্রহার, গণহিংসা ক্রমশঃ টায়ফনের মত গ্রীক দৈত্যে পরিণত হতে পারে৷ কখনও  ভূয়ো খবর, কখনও অসহিষ্ণুতায় প্ররোচিত  উন্মত্ত জনতার হিংসার ঢেউ থেকে তা স্পষ্ট হয়ে যায়৷’’

দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে  আমরা দেখতে পাই,---কোথাও গোরক্ষা-গোমাংসের কারণে, কোথাও ছেলেধরার গুজব, কোথাও কোন পৌরাণিক দেবদেবীর নামে  সিনেমার চরিত্র চিত্রায়ণকে কেন্দ্র করে, কোন সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে  তথাকথিত কোনো নারী-পুরুষের জাতিগত সম্মান-অসম্মান আবার কোথাও পারিবারিক মান মর্যাদা রক্ষার খাতিরে  দাঙ্গা হাঙ্গামা বাধানোর সুপরিকল্পিত  প্রয়াস চলছে৷ এইসব হিংসা, অশান্তি ,সন্ত্রাসের বলি হচ্ছে বিশেষ কিছু সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠী৷ ঘটনাগুলির আরো গভীরে প্রবেশ করলে জানা যায়--- এসবের পিছনে রয়েছে  ধর্মীয় মেরুকরণে  রাজনৈতিক দলাদলির ইন্ধন ও প্ররোচনা আবার কখনও দলীয় স্বার্থসিদ্ধি, কখনও উপদলীয় বা নিছক ব্যষ্টিস্বার্থ চরিতার্থ করার হীন চক্রান্ত৷ যত গণ্ডগোল হাঙ্গামার মূলে থাকে ব্যষ্টিসংঘাত, বিদ্বেষ, গোষ্ঠী-সম্প্রদায়গত ভেদভাবনা অসহিষ্ণুতা৷ আর এগুলোকেই গুজব ছড়ানোর রসদ হিসাবে ব্যবহার করা হয়৷ আগেকার দিনে লোকের মুখে মুখে গুজব ছড়াতো, কিন্তু  বর্তমানে ফেসবুক , হোয়াটসএ্যাপ, ইন্টারনেটের মাধ্যমে মোবাইলে মোবাইলে অতি অল্পসময়ে বহু মানুষের কাছে যে কোনো গুজবের বার্র্ত দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয়৷ সাম্প্রতিক কালে বিভিন্নগোষ্ঠীদ্বন্দ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাার বহু ঘটনা এইভাবেই সংঘটিত হয়েছে৷ কোনো এলাকায় কোন কাজে কর্মে আসা অপরিচিত মানুষের (নারী অথবা পুরুষ) বিরুদ্ধে ভূয়ো অভিযোগ তুলে  গণপ্রহার চলছে৷ বৈধ কাগজপত্রাদি সহ  গবাদি পশু নিয়ে যাওয়ার সময়ে বা মৃত পশুর সৎকারের সময়ে অযাচিত সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়৷ আক্রান্ত ব্যষ্টিদের আগমনের কারণ, প্রমাণপত্র বা পরিচিতি জানার চেষ্টা না করে স্বঘোষিত আইনরক্ষক  বা গোরক্ষকেরা যূথবদ্ধ আক্রমণ ঘটিয়ে ফেলে৷ অনেক সময়  ব্যষ্টিগত বা পারিবারিক আক্রোশের কারণেও চুরি বা ছেলেধরা বা ডাইনির ভূয়ো সংবাদ রটিয়ে আক্রমণ চালানো হয়৷ যদি সত্য সত্যই কেউ কোনো অপরাধ জনিত কর্মে লিপ্ত থাকে--- সেক্ষেত্রে আইন নিজেদের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনকে জানালে,  তারা সত্যমিথ্যা যাচাই করে যথাযোগ্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে৷ এরফলে নিরপরাধ মানুষের আক্রান্ত বা নিহত হওয়ার মতো ঘটনা অনেকটাই কমবে৷ কিন্তু চোরা না শুণে ধর্ম কাহিনী, কারণ তাঁদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে রাজনৈতিক, দলীয় উপদলীয় বা ব্যষ্টিগত প্রচার ও হীণস্বার্থসিদ্ধি৷  এই ঘটনাক্রম বর্তমানে চলছে, অতীতেও চলেছে, আর যতদিন না শুভশক্তির জাগরণ ঘটছে  ততদিন ভবিষ্যতেও চলবে৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৮২ সালের ৩০শে এপ্রিল  এরকমই একটি নারকীয় ঘটনা ঘটেছিল খাস কলকাতার কসবা-বন্ডেলগেট-বিজনসেতু অঞ্চলে৷ আধ্যাত্মিক সংঘটন আনন্দমার্গের প্রচার প্রসারে শঙ্কিত হয়ে জড়বাদী কম্যুনিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে আনন্দমার্গের সর্বত্যাগী জনকল্যাণকামী সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীদের নামে ছেলেধরার গুজব রটিয়ে  পরিকল্পনা মাফিক কয়েকশত মাতাল নৃশংস নরঘাতককে সংঘবদ্ধ করে  সেইদিন কল্লোলিনী কলকাতাকে চির কলঙ্কিত করে ১৭জন সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীকে বাঁশ, রড , ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে, চোখ খুবলে, পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিল---যাঁদের অনেকেই জীবন্ত দগ্দ হয়েছিলেন৷  মানব কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ সর্বত্যাগীদের উপর  এইধরণের পৈশাচিক হত্যালীলা মানব ইতিহাসে বিরল৷ পরবর্তীকালে তদন্তে জানা গিয়েছিল, সেই অঞ্চলে  সেই সময়কালে কোন শিশুচুরির ঘটনা ঘটেনি--- সবই ছিল উর্বর মস্তিষ্কের রটনা৷ 

বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিশেষতঃ গোরক্ষার নাম যে গণপ্রহারজনিত সন্ত্রাস চলছে, তার কারণে  সাধারণ নাগরিকবর্গ ব্যথিত ও ক্ষুদ্ধ৷  এই ক্ষোভের আঁচ সংসদেও লেগেছে৷ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি সংসদে এই বিষয়ে দুশ্চিন্তা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহদোয়কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছেন৷ বিভিন্ন মামলার শুনানির সময়ে এই মর্মে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণও কেন্দ্র তথা  রাজ্যসরকারগুলিকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন যাতে এই ধরণের অনাকাঙ্খিত          দুঃখজনক ঘটনা না ঘটে৷ এতকিছুর পরেও এই দেশের কতিপয় রাজনীতিক নেতা-নেত্রী ঘোষণা করেছেন--- গোমাংস খাওয়া বন্ধ হলেই গণপিটুনির ঘটনা কমে যাবে৷ এখন প্রশ্ণ হচ্ছে গোমাংস খাওয়া ঠিক কি ভুল তা ভিন্ন বিষয়---কিন্তু মানুষের খাদ্যাভ্যাস  তাঁদের জীবন জীবিকা, অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থা, ধর্মাচারণ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে৷  কেউ জোর করে মানুষের খাদ্যাভাস চাপিয়ে দিতে পারে না৷ মানুষ নিজের প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খাদ্যবস্তু নির্বাচন করে৷ যদি  সত্যিই কেউ মনে করে যে গোমাংস খাওয়া  উচিত নয়, তখন সে নিজেই তা পরিত্যাগ করবে৷ পৃথিবীতে বহু মানুষ একদা বৃহৎ পশুর মাংস ও অন্যান্য আমিষ খাদ্য গ্রহণ করতেন, কিন্তু পরবর্তীকালে সেই অভ্যাস ত্যাগ করে পুরোপুরি নিরমিষাশী ও সাত্ত্বিক খাদ্যে অভ্যস্ত হয়েছেন৷ স্বঘোষিত গোরক্ষকদের বক্তব্য অনুযায়ী তারা যেহেতু গোরু বা গাভীকে  গোমাতা হিসাবে শ্রদ্ধা ভক্তি ও পূজো করেন তাই গোমাংস ভক্ষক বা গোহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ও হিংস্র মনোভাব পোষণ করেন৷ অথচ এই মানুষেরাই পাঁঠা খাসী,ভেড়া, মুরগি, হাঁস, পায়রা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণীর মাংস বা মাছ কচ্ছপ প্রভৃতি জলজপ্রাণী অবলীলায় হত্যা করে ভক্ষণ করে৷ শুধু তাই নয়, সমাজে যারা মাতৃসমা নারী জাতি তাদের অসম্মান  করতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না৷  নারীর সম্মান আজ ভূলুণ্ঠিত, বয়স নির্বিশেষে শিশু থেকে প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধা পর্যন্ত সকলেই  পারিবারিক হিংসা, যৌনতা ও লালসার শিকার৷ ঘরে বাইরে রাস্তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে, অফিস-কার্যালয়ে, স্কুল-কলেজে, সর্বত্রই নারীরা অরক্ষিত, অজানা বিপদের আশঙ্কায় আতঙ্কিত৷ তাই শুধুমাত্র গোরক্ষার নামে  সন্ত্রাস বিশেষতঃ কিছু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ ও ভেদভাবনার ফসল৷  ক্ষমতাবানেরা ভোগসর্বস্ব জীবনযাত্রা ও ভৌতিক সম্পদ কুক্ষিগত করার সীমাহীন লোভের তাড়ণায় মানব সমাজকে  বিভিন্ন  গোষ্ঠী সম্প্রদায়, ধর্ম, বর্ণ, জাতের ভেদাভেদে খণ্ড-বিখণ্ড করে শোষণযন্ত্র কায়েম রাখার ব্যবস্থা করেছে৷  এই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিসেবে মানুষে মানুষে বিরোধ বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ৷ বৈশ্যতান্ত্রিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিচালিত সামাজিক পরিবেশে নৈতিকতার মান ক্রমশঃ তলানিতে এসে ঠেকেছে৷ আচারসর্বস্ব মেকি ধর্মান্ধতা , লোকদেখানো ধর্মীয় উন্মাদনা ও উন্মার্গগামিতা, পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার অনুপ্রবেশ প্রতি নিয়ত সামাজিক পরিমণ্ডলকে  কলুষিত করে চলেছে৷ মানুষের মনে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রেম, প্রীতি ভালভাসা ইত্যাদি শুভ গুণাবলীর পরিবর্তে হিংসাদ্বেষ, অশ্রদ্ধা, অহংকার,  ঘৃণা, লোভ লালসা, যৌনতা প্রভৃতি কু-প্রবৃত্তিগুলি বাসা বেঁধেছে৷ বিত্তশালীদের অর্থ, সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের দম্ভই নীতিবান, ধার্মিক,সত্যনিষ্ট মানুষজনকে শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট করে চলেছে৷ এই শোষকের দল  নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও  সম্পদ বৃদ্ধির জন্যে যে কোনো হিংস্রতম ও অনৈতিক কাজ করতে কুণ্ঠা বোধ করে না৷  

মানব সমাজকে এই অসহনীয় যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্ত করতে  নীতিবাদী, সৎ, ধার্মিক, আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে চলা মানুষজনকেই এগিয়ে আসতে হবে৷ আধ্যাত্মিকতার পথ অনুসরণ না করলে নীতিবাদে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়৷  বলিষ্ঠ নৈতিক চরিত্র বিশিষ্ট মানুষ  যতবেশি সংখ্যায় বৃদ্ধি পাবে সমাজ থেকে দুর্নীতি ও শোষণ ততই অপসৃত হতে থাকবে৷ তাই আজকের মানব সমাজের অন্ধকার ময় অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে আধ্যাত্মিকতার আলোকে  সমুজ্জ্বল নীতিনিষ্ঠ  মানুষের  সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির প্রয়োজন৷ এই উদ্দেশ্যে মহান দার্শনিক শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার ,যিনি  ধর্মগুরু হিসেবে শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী নামে  সর্বজনবিদিত, মানব সমাজের সর্বাত্মক কল্যাণে  ও শোষণমুক্ত মানব সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একদিকে আধ্যাত্মিক দর্শন আনন্দমার্গ, অপরদিকে সামাজিক - অর্থনৈতিক দর্শন  ‘‘প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব’’ Progressive  Utilisation Theory) বা সংক্ষেপে PROUT  ও নব্যমানবতাবাদ প্রবর্তন করেছেন৷ আনন্দমার্গের সাধনা পদ্ধতিতে অষ্টাঙ্গিক যোগসাধনার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষকে ব্রহ্মভাবে নিষিক্ত করে সত্যিকারের মানুষে পরিণত করার প্রক্রিয়া সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে৷  এগুলি হলো---  যোগ, আসন, প্রাণায়াম, যম, নিয়ম, ধ্যান, ধারণা ও সমাধি৷ এই সাধনা পদ্ধতিতে মানুষের মনকে ক্রমশঃ জাগতিক কামনা, বাসনা, লোভ, লালসা থেকে প্রত্যাহার করে  বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরমপুরুষের পানে এগিয়ে চলার দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে৷  আমরা জানি, পৃথিবীর জাগতিক সম্পদ সীমিত কিন্তু  মানুষের চাহিদা অনন্ত৷ কালের প্রবাহে মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্দ্ধমান আর বর্ধিত সংখ্যার মানুষের অনন্ত  চাহিদা বা তৃষ্ণাকে তৃপ্ত করার ক্ষমতা  পার্থিব  সম্পদের নেই৷ তাই প্রতিটি  মানুষকে  জীবন ধারণের জন্যে  ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটানোর মতো পার্থিব সম্পদ গ্রহণ করে বাকী অতৃপ্ত তৃষ্ণাকে অনন্ত মানসিক  ও আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি পরিচালিত করলে  তাঁর মনে আসবে প্রশান্তি ও ঈশ্বর - সান্নিধ্যের আনন্দ৷ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মানুষ সর্বদাই সুখ পেতে চায় অর্থাৎ যা পেলে মানুষের মনে খুশির উদ্রেক হয় তা-ই পেতে চায়৷ এই খুশির  বা সুখের পরিমাণ বাড়াতে হলে অনন্ত সত্তার দিকে এগিয়ে চলতে হবে৷  পৃথিবীর যে কোনা সম্পদ বা মানুষ বা বস্তু থেকে এই অনন্ত সুখ পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এইসবই একসময়ে হারিয়ে যাবে নতুবা ফুড়িয়ে যাবে৷  তাই একমাত্র অনন্ত সত্তা পরমব্রহ্মই সর্বত্র ও সদা সর্বদা বিরাজমান৷  তাই অনন্ত সুখ পেতে হলে  সেই অনন্ত অসীম অক্ষর পরমব্রহ্মকে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে৷  আনন্দমার্গের সাধনা পদ্ধতিতে  প্রতিটি মানুষকে এই প্রক্রিয়ায়  আনন্দ (অনন্ত সুখ) পাওয়ার  মার্গের (পথের) সন্ধান দেওয়া হয়েছে৷

মানুষকে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে  ন্যূনতম প্রয়োজন খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা শিক্ষা পেতেই হবে৷ কিন্তু পার্থিব সম্পদ অনন্ত অসীম নয়৷ সীমিত পার্থিব সম্পদকে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ভাগবন্টনের মাধ্যমে সকলে মিলে ভোগ করতে হবে যাতে সকলেরই প্রয়োজন মেটে৷ তাই এই সীমিত ভৌতিক সম্পদের সুষমবন্টনের জন্যে সত্যদ্রষ্টা মহান দার্শনিক শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার প্রবর্তন করেছেন প্রাউট দর্শন৷ এই দর্শন অনুসারে  পৃথিবীর  কেউই কোন পার্থিব সম্পদের মালিকানা দাবী করতে পারে না৷  কারণ ব্যষ্টিগত মালিকানা স্বীকৃত হলে  কতিপয় মানুষ সমগ্র সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করে  বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে  বঞ্চিত নিপীড়িত ও শোষণ  করতে থাকবে যা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় চলছে--- আর এই ব্যবস্থা কিছুতেই কাম্য নয়৷ নচেৎ এই শোষণ অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে৷  প্রাউট দর্শন অনুসারে, একমাত্র পরমব্রহ্ম পরমপুরুষই  এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও বিশ্বের সমগ্র সম্পদের মালিক৷ বিশ্বের সমস্ত  সৃষ্ট জীব, জড়, উদ্ভিদ , মানুষ সকলেই  পরমপুরুষেরই সন্তান আর একই পিতার সন্তান হিসেবে  এই সম্পদ  সকলেরই মিলে মিশে ভোগ করার অধিকার রয়েছে৷  এই সম্পদের দ্বারা প্রত্যেকের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷ কেউ বেশি গ্রহণ করলে  অন্যেরা বঞ্চিত হবে ও শোষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে৷  বরং ন্যূনতম প্রয়োজনকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করার জন্যে  মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের দ্বারা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ক্রমাগত উন্নত করতে হবে৷  এই সর্বাত্মক উন্নতির ফল সবাইকে  সুষম বন্টনের মাধ্যমে ভাগ করে দিতে হবে৷

পরমপিতার সৃষ্ট এই অনবদ্য বিশ্বসংরচনার  বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমতাভাব অর্থাৎ বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্ট সত্তাই পরমপুরুষের স্নেহের সন্তান-সন্ততি৷  জীবজন্তু, উদ্ভিদ, জড়, মানুষ সকলেই তাঁর আদরের সন্তান৷ বৌদ্ধিক ও মানসিক বিকাশের  ক্রমবিন্যাসে আজ যে জড়, কালাদিক্রমে সে ক্রমশঃ জড়ষ্ফোটের মাধ্যমে জীবে রূপান্তরিত হবে, অবিকশিত জীব উচ্চতর বিকশিত জীবে ও পরবর্তী পর্র্যয়ে মনুষ্যরূপে উন্নীত হবে৷ এইভাবে বিশ্বস্রষ্টার সৃষ্টি লীলা চলেছে অনন্তকাল ধরে৷  তাই আজকের বুদ্ধিদীপ্ত মানুষকে শুধুমাত্র মানুষের কথা ভাবলেই চলবে না , তার চারপাশে যে অনন্ত সৃষ্টি রয়েছে (ধূলিকণা থেকে অন্যান্য জীবজন্তু পর্যন্ত) সকলেই  পরমপিতার সন্তান ও সকলের প্রতিই তার সমান দায়িত্ব৷ এই ভাবনা থেকেই উদ্ভব ‘‘নব্যমানবতাবাদ’’-এর ৷ মাটি, হাওয়া, জল, উদ্ভিদ, জীবজন্তু সকলের কাছ থেকেই মানুষ ও অন্যেরা পারস্পরিক সহায়তা ও জীবনের রসদ পায়৷ তাই প্রত্যেকের কাছে প্রত্যেকের প্রয়োজন অপরিহার্য৷ সেকারণেই সকলের জন্যে আমাদের ভালবাসা প্রেমপ্রীতির ভাবনাকে সদা জাগ্রত রাখতে হবে৷ প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার পথে চললে ও ব্রহ্মভাবনায় ভাবিত হলে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যেই পরমব্রহ্মে র উপস্থিতি অনূভূত হয় ও সকলের জন্যে আত্মীয়তার ভাবনা ও কল্যাণকামনার উদ্রেক হয়৷ এই পর্যায়ে সমগ্র মানব সমাজ এক ও অবিভাজ্যরূপে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়৷ তখন কারুর সম্পর্কে বিদ্বেষ বা বিভেদ ভাব মনে স্থান পায় না, অন্যকে বঞ্চিত করার চিন্তাও  মনে আসে না--- এখানেই নব্যমানবতাবাদের সার্থকতা৷  তাই আনন্দমার্গের সাধনা পদ্ধতিতে মানব মণীষাকে দেবত্বের মহিমায় উন্নত করে বিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সুবিকশিত মানুষ পর্যন্ত  সকলকে ভালবাসা প্রেমপ্রীতি, মায়া-মমতার নিগড়ে বাঁধতে পারলেই নব্যমানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা সম্ভব৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে  মানুষ মূলতঃ শাকাহারী জীব ও জীবনধারণের জন্যে অন্য কোনো পশুপাখী জীবজন্তু হত্যা করার প্রয়োজন নেই৷ প্রকৃতপক্ষে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যে  মানুষের সাত্বিক আহার গ্রহণ করাই বিধেয়৷ এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানও শারীরিক সুস্থতার জন্য লাল মাংস বা জন্তু জানোয়ারের মাংস ভক্ষণে নিরুৎসাহ প্রদান করে৷  তাই নব্যমানবতাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষজন প্রাণীহত্যার  সমর্থক নন৷ সুতরাং নব্যমানবতাবাদের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে মানব সমাজকে একটি শোষণহীন হিংসা, দ্বেষ, দুর্নীতিমুক্ত মানব সমাজে পরিণত করতে হবে৷ আর তখনই বর্তমানের অন্ধকার পূতিগন্ধময় সমাজের কু-ব্যবস্থাগুলি দূরীভূত হবে৷ সেজন্যেই অতিদ্রুততার সঙ্গে পৃথিবীর সকল মানুষকে নব্যমানবতার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সুন্দর নোতুন পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে  এগিয়ে আসতেই হবে৷ 

  • Log in to post comments

আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

দগ্ধৰীজ
শ্রাবণী পূর্ণিমা
পরমপুরুষের বিশ্বরূপ
যজ্ঞ প্রসঙ্গে
ঈশ্বর–প্রণিধানের মানসাধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া
আরও

প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়

বাঙলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন 
শোষণের বহুবিধ রূপ
মানবিক মৌলনীতি
পাপ, পুণ্য ও অপরাধ
প্রাউটের দৃষ্টিকোন থেকে : ত্রিপুরার উন্নয়ন
আরও

সম্পাদকীয়

পরিযায়ী শ্রমিক সমস্যা কেন্দ্রীত অর্থনীতির বিনাশই সমাধান
শ্রাবণী পূর্ণিমা
সরিবে দুর্নীতিরাজ
পেট্রল ও ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি!
সমাজ–সভ্যতা বাঁচাতে চাই আদর্শ শিক্ষা

প্রবন্ধ শিরোনাম

  • দিব্য অনুভূতি
  • আমার বাঙলা
  • গল্প হলেও সত্যি 
  • সমাজ-এর সৃষ্টিই সভ্যতার প্রথম বিকাশে তাই সমাজ রক্ষা করা মানবতাবাদী শাসকের কাজ
  • বিধবস্ত দার্জিলিং---প্রকৃতির প্রতিশোধ
  • একটি ঐতিহাসিক তথ্য
  • ফাঁসীর মঞ্চে গাইলেন যিনি জীবনের জয়গান
  • আমার সন্তান যেন থাকে  দুধে ভাতে

পুরানো মাসিক খবর

  • October 2017 (106)
  • September 2017 (136)
  • August 2017 (105)
  • July 2017 (111)
  • June 2017 (104)
Pagination
  • Previous page ‹‹
  • Page 12
  • Next page ››
আরও আগের খবর
Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved