প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়

সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণ

পূর্ব প্রকাশিতের পর

কিন্তু অল্পদিন পরে যখন তারা বিজ্ঞানের প্রয়োগ বা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তারা সেই সমস্ত বস্তুর বিরুদ্ধে সমালোচনা বা ঘৃণা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয় ও যে সমস্ত বস্তু তারা ্বাধ্য হয়ে ব্যবহার করত, এখন সেগুলোর ব্যবহার তাদের পক্ষে সহজ হয়ে ওঠে, কারণ পুরাতন বস্তুর দুষ্প্রাপ্যতা বা স্বল্পতা হেতু, তারা ক্রমেই নোতুন দ্রব্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়৷

সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণ

জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সর্বাত্মক জয়লাভের ইচ্ছা মানুষের মধ্যে আদিম ও অনন্ত৷ প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয়---জীবনের সকল ক্ষেত্রে ছোট হয়ে বাঁচাটা মানুষের পক্ষে অভাবনীয়৷ অনন্তকাল ধরে প্রকৃতির আজ্ঞাবহ ভৃত্য হিসেবে বাঁধাধরা পথে চলার ধারণা কোনদিনই তার মনঃপুত নয়৷ তবে সে যে অনেক সময় প্রকৃতির নিয়মমাফিক চলে জানতে হবে, সেটা, নিতান্তই অবস্থার চাপে পড়ে৷ আর সেটা হচ্ছে তার পর্যাপ্ত পরিমাণ বুদ্ধি বা Intellect ও Stamina-র অভাব৷ তার সর্ব সাধনা হচ্ছে কেবল এইসমস্ত অভ্যন্তরীণ দুলতাগুলোকে দূর করার প্রচেষ্টার নামান্তর মাত্র৷ মনোজগতের অপূর্ণতা দূর করার জন্যে তাই সে অহরহই আদর্শগত সংঘর্ষকে অভ্যর্থনা জানায় ও জন্ম দেয় নোতুন

পরিকল্পনার মৌল নীতি

যাঁরা বিভিন্ন স্তরে যোজনা পর্ষদের সঙ্গে সংযুক্ত সেই ধরণের বড় বড় অর্থনীতিবিদদের কোন পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে যে কয়েকটি বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত সেগুলি হ’ল–

* উৎপাদনের ব্যয়  * উৎপাদন–ক্ষমতা

* ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা    * সামূহিক প্রয়োজনীয়তা৷

এবার উপরি–উক্ত বিষয়গুলির প্রত্যেকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক৷

উৎপাদন–ব্যয়

শোষণমুক্ত বিশ্বায়ন

দুটি অঞ্চল উন্নয়নের প্রায় সমস্তরে এসে পৌঁছলে তাদের পক্ষে এক–সঙ্গে মিলিত হয়ে বৃহত্তর সামাজিক–র্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে’ তোলা সম্ভব৷

দুই বা ততোধিক সামাজিক–র্থনৈতিক অঞ্চল একসঙ্গে মিলিত হতে পারে যদি কয়েকটি শর্ত পূরণ হয়৷ শর্তগুলি হ’ল–

প্ত  সামাজিক–র্থনৈতিক অঞ্চলগুলির অর্থনৈতিক

                  বৈষম্যের ক্রমাবসান৷

প্ত  বিজ্ঞান ও যোগাযোগের উন্নতি ৷

প্ত  প্রশাসনিক যোগ্যতা৷

প্ত  সামাজিক–সাংসৃক্তিক মেলামেশা৷

সদবিপ্র বোর্ড

আগে আমি বহুবার বলেছি যে যাঁরা আধ্যাত্মিক নীতিবাদ তথা ‘‘যম–নিয়ম’’ পালন করেন আর যাঁরা পরম চৈতন্য সত্তার প্রতি অনুরক্ত তাঁরাই হলেন সদবিপ্র৷ মানুষ সদবিপ্রকে চিনে নেবে তাঁর আদর্শ আচরণ, নিঃস্বার্থ সেবা, কর্ত্তব্যপরায়ণতা আর নৈতিক দৃঢ়তার মধ্যে দিয়ে৷ একমাত্র সদবিপ্ররাই নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করতে পারে আর সকলকে সর্বাত্মক প্রগতির পথে নিয়ে চলতে পারে৷ এই সদবিপ্ররা–যারা সঠিক জীবনাদর্শকে অনুসরণ করে আর যথাযথ সাধনা পদ্ধতির অনুশীলন করে–তারাই ভবিষ্যতে মানবসমাজের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকবে৷

গণতন্ত্র ও সদ্বিপ্রতন্ত্র

নানারকম শাসন পদ্ধতি রয়েছে, আর তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশী প্রশংসিত৷

গণ + তন্ + ত্রৈ + ড = গণতন্ত্র৷ ‘তন্ত্র’ শব্দের অর্থ হ’ল নিয়ন্ত্রিতভাবে বা বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে কোন কিছুকে বাড়িয়ে দেওয়া৷ আবার তং  ত্রৈ  ড করেও ‘তন্ত্র’৷ এখানে ‘তন্ত্র’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জড়তা থেকে মুক্ত করা৷ ‘ত’ মানে জড়তা৷ ‘গণতন্ত্র’ মানে গণতার সাহায্যে মানুষকে জড়তা থেকে মুক্ত করা, অথবা বিধিবদ্ধভাবে তাদের জন্যে ত্রাণের রাস্তা তৈরী করে’ দেওয়া৷ ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি’–র যথার্থ প্রতিভু না হলেও মোটামুটি অর্থে চলতে পারে৷

রাঢ়ের সভ্যতা

মানুষের উদ্ভব পৃথিবীতে কয়েকটি বিশেষ বিশেষ বিন্দুতে হয়েছিল৷ কে আগে আর কে পরে–এই নিয়ে বিশদ আলোচনা না করেও বলতে পারি, রাঢ়ভূমিতে মানুষের উদ্ভব অতি প্রাচীন৷ এর চেয়ে প্রাচীনতর মনুষ্য–নিবাসের কোন সন্ধান পাওয়া যায় না৷ পৃথিবীতে যখন অরণ্য এল রাঢ়ের এই কঠিন শিলা, বিবর্তিত শিলা, আগ্ণেয় শিলা ও পাললিক শিলার ওপরে জন্ম নিল নিবিড় অরণ্য৷ সেই অরণ্যই একদিন মানুষ–জনপদ রাঢ়কে প্রাণ–সুধা জুগিয়েছিল, এই অরণ্যই রাঢ়ের নদীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করত৷ ওই অরণ্যই বরফ–ঢাকা পাহাড়গুলি ক্ষয়ে যাবার পরে আকাশের মেঘকে ডেকে আনত রাঢ়ভূমিতে৷ রাঢ়ভূমিতে পর্জন্যদেবের কৃপাবর্ষণ হ’ত অফুরন্ত, অঢেল৷ এই আমাদের রাঢ়ভূমি–অনেক সৃষ্টি–স্থিতি–লয়ের জীবন্ত

নেতৃত্বের অভ্যুদয়

সমাজ–চক্রের পরিঘূর্ণনে, একটা বিশেষ যুগে তার পরবর্ত্তী যুগ আসার আগে একটা বিশেষ শ্রেণীর আধিপত্য থাকে, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে৷ এই বিশেষ শ্রেণী যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকে, তাদের দ্বারা সমাজে শোষণ চলার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়৷ ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, শোষণের সম্ভাবনাই শুধু নয়, যুগে যুগে এই শোষণের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে৷

প্রাউট ও নব্যমানবতাবাদ

অস্তিত্বের সকল ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গতিশীলতার দ্রুতি থাকতেই হবে৷ গতির দ্রুতিই জীবনের মূল পরিচয় বহন করে৷ মানুষের দৈহিক সংরচনা পাঞ্চভৌতিক কিন্তু মানব জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে পরমপুরুষ (Supreme Entity)¼৷ সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমেই আমাদের যেতে হবে৷

প্রাউটের মূলেও রয়েছে এই গতিশীলতা৷ প্রাউট হচ্ছে একটি সামাজিক–অর্থনৈতিক দর্শন যা মানবজাতিকে অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে৷ পরমপুরুষের দিকে এগিয়ে চলা সকলের পক্ষেই একটা বিরামহীন প্রক্রিয়া৷ এই প্রক্রিয়ার অন্তে তুমি পরমপুরুষের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে৷

সম-সমাজ তত্ত্ব 

চলা জগতের ধর্ম৷ চলে চলেছে বলেই  এই পৃথিবীর নাম জগৎ৷ ‘গম’ ধাতুর উত্তর ক্কিপ্ প্রত্যয় করে ‘জগৎ’ শব্দ নিষ্পন্ন যার মানে হ’ল--- চলা যার  স্বভাব৷ ব্যষ্টিগত জীবনে যেমন চলতে হয়, সমষ্টিগত তথা সামুহিক জীবনেও তেমনি চলতে হয়৷ কিন্তু এই যে চলা, এই চলার জন্যে তিনটে জিনিসের প্রয়োজন আছে৷ একটা হচ্ছে--- চলার জন্যে একটা সম্প্রেষণ, পেছন থেকে একটা ধাক্কা যখন চলাটা বন্ধ হয় তখন ধাক্কা দিয়ে বলতে হয় চল্, চলতে হবে৷ দ্বিতীয়তঃ নিজে যে চলবে  তার চলবার সামর্থ্য থাকা অর্র্থৎ চলার উপযুক্ত রসদ তার থাকা চাই৷  নইলে সে চলবে কী করে? আর তৃতীয়ত হচ্ছে ঃ চলছে  একটা লক্ষ্যের দিকে৷ এই তিনটে জিনিস চাই৷