আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

মানবজীবনে সাফল্য লাভের রহস্য

বলা হয়েছে, পরমাত্মার কৃপা হলে ‘মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙঘয়তে গিরিম্’৷ অর্থাৎ যে মূক–বোবা সেও বাচাল হয়ে যায়, খুব কথা বলতে থাকে, আর পঙ্গুও পর্বত লঙঘন করতে পারে৷ পরমপুরুষের কৃপাতেই যে তা সম্ভব, এটা খুব সহজেই বোঝা যায়৷ কিন্তু আমি বলতে চাই– যে কোনো কাজই, মনে কর, মূক হয়তো বাচাল হচ্ছে না, কিন্তু কিছুটা কথা বলছে, পঙ্গু পর্বত লঙঘন করছে না, কিন্তু ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠছে– এটা কি মানুষ তার নিজের শক্তির সাহায্যে করে?

নির্ভয় হও

কখনও এই পরিস্থিতি আসতে পারে তুমি বিরাট শক্তিশালী সত্তার কাছে পৌঁছে গেছ, যাকে তুমি খুব ভয় পাও৷ এই যে শক্তিশালী সত্তা, তার শক্তি বা তার সাহস আসছে কোথা থেকে? সেও তোমার পিতার কাছে থেকেই আসছে৷ নিজের শক্তি বলে কারোর কিছু আছে কি? না, তা নেই৷ খাদ্য, হাওয়া, জল, মাটি ইত্যাদি দ্বারা পরমপিতা শক্তি প্রদান করেন৷ ধর, এক বিরাট শক্তিশালী পালোয়ান– সেটা কি তার নিজের শক্তি? না, তা নয়৷ সে শক্তি তোমার পরমপিতার৷ তাই তার থেকে তুমি ভয় কেন পাবে?

পরমপুরুষ কাউকে ঘৃণা করেন না

মানুষ যদি সব সময় এই কথাটা মনে রাখে যে, আমাকে যে যাই বলুক না কেন, যত গালিই দিক না কেন, লোকের চোখে আমি যত ছোট, যত মূর্খ, যত গরীবই হই না কেন, আমি তো পরমপুরুষের বিস্তারিত দেহের একটা টুকরো মাত্র, তখন তার মধ্যে আর কোন গ্লানিই থাকে না, থাকতে পারে না৷ মানুষ হ’ল অসম্পূর্ণ, পরমপুরুষ সম্পূর্ণ৷ তাই মানুষের মধ্যে ত্রুটি থাকবেই৷ সে যত পরমপুরুষের বিরাট ভাবের দিকে এগিয়ে যাবে ততই সে ত্রুটিমুক্ত হতে থাকবে, আর যখন সে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হবে, তখন দেখা যাবে, সে পরমপুরুষের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, আর সে আলাদা নেই৷

পরমপুরুষের অনেক নাম

গোপাল ঃ পরমপুরুষের একটি নাম হ’ল গোপাল৷  সংস্কৃতে ‘গো’ অর্থে কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় উভয়কেই  বোঝায়, আর  ‘পাল’ মানে  যিনি পালন  করেন৷

ধর, একটা মানুষ৷ এখন তার কেবল শরীরটাই রয়েছে, মন নেই আত্মা  নেই কিংবা চিতিশক্তি বা ভূমাচৈতন্যও অবর্ত্তমান ৷ তাহলে সেই  মানুষটা সমস্ত ইন্দ্রিয় থাকা সত্ত্বেও  কাজ করতে পারবে না৷ গোপাল মানে হ’ল জীবাত্মা.....অণুচৈতন্য৷

গোবিন্দ ঃ সংস্কৃতে ‘গো’ মানে হ’ল কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়  সমূহ৷ আর ‘বিন্দ’ মানে যিনি কোনো  সত্তা  বিশেষের বৈশিষ্ট্যকে স্ফূর্ত্তি ও প্রগতির  ব্যাপারে  সহায়তা করেন৷ তাই ‘গোবিন্দ’ মানেও  দাঁড়াচ্ছে অণুচৈতন্য ৷

সৎসঙ্গেন ভবেন্মুক্তি

                ভগবান শংকরাচার্য বলেছিলেন–

                ‘‘ত্যজ দুর্জনসংসর্গং ভজ সাধু সমাগমম্৷

                কুরুপুণ্যম্ অহোরাত্রম্ স্মরনিত্যম্ অনিত্যতাম্৷৷’’

জীবের প্রকৃত বন্ধু কে?

‘‘এক এব সুহৃদ্ধর্ম নিধনেহপ্যনুযাতি যঃ’’৷ ধর্মই তোমার একমাত্র সুহৃদ্ (এক ধরণের বন্ধু যা মৃত্যুর পরেও মানুষের সঙ্গে থেকে যায়)৷ সংস্কৃতে ‘বন্ধু’ শব্দের কয়েকটিই প্রতিশব্দ রয়েছে৷

‘‘অত্যাগসহনো বন্ধুঃ সদৈবানুমতঃ সুহৃদ্৷

একক্রিয়ং ভবেন্মিত্রং সমপ্রাণাঃ সখা স্মৃতঃ৷৷’’

‘‘অত্যাগসহনো বন্ধুঃ’’৷ যে বিচ্ছেদ–বেদনা সহ্য করতে পারে না সে–ই বন্ধু৷ যার সঙ্গে তোমার ভালবাসার সম্পর্ক এতই দৃঢ় যে তোমার বিচ্ছেদ তার কাছে অসহনীয় বলে মনে হচ্ছে তাকেই বলব বন্ধু৷ পারস্পরিক স্নেহ–ভালবাসার এই বন্ধন এতই দৃঢ় যে সে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারে না–তোমার সঙ্গে বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারে না৷

পরাজ্ঞানের তিনটি প্রধান শর্ত

শাস্ত্রে বলা হয়েছে---

‘‘শ্রবণায়াপি বহুভির্র্যে ন লভ্যঃ শৃন্বন্তোহপি বহবো যং ন বিদূ্যঃ৷

আশ্চর্র্যে বক্তা কুশলোহস্য লব্ধা আশ্চর্র্যে জ্ঞাতা কুশলানুশিষ্টঃ৷’’

মানুষের সমাজে  কত লোকেরই না বাস৷ তাদের মধ্যে মুষ্টিমেয় মানুষই অধ্যাত্মজ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেয়ে থাকেন৷ আবার তাদের মধ্যে খুব  কম শতাংশ মানুষই হাতে কলমে  আধ্যাত্মিক  শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়ে থাকেন৷ এর মূল কারণটা কী? কারণ  হ’ল  সাধনা  বিজ্ঞান জিনিসটাই দুলর্ভ, আবার প্রকৃত অধ্যাত্মজিজ্ঞাসুর  সংখ্যা আরও দুর্লভ আবার প্রকৃত গুরুর সংখ্যা আরও  বেশী দুর্লভ৷

মানব ধর্ম

বৃক্ষলতার কিছু বিশেষ গুণ আছে৷ যেমন, মাটির নীচে থেকে রস টেনে নেওয়া৷ মানুষ নিতে পারে না৷ জন্তু–জানোয়াররাও নিতে পারে না৷ কিন্তু বৃক্ষলতারা মাটির থেকে রস টেনে নিতে পারে৷ বাতাস থেকেও এরা কিছু খাদ্য নেয়৷ যদিও জীবজন্তু, মানুষও কিছুটা তা করে, কিন্তু উদ্ভিদের মত অতটা নয়৷ একে আমরা বলতে পারি উদ্ভিদ–ধর্ম৷ বৃক্ষলতা পায়ের সাহায্যে খাদ্যগ্রহণ করে৷ তোমরা জান কি না?

যুদ্ধায় কৃত নিশ্চয়

জগতে যেসব বস্ তুকে আমরা নিত্য বলে মানি তাদের নিত্যতাপ্রদানকারীও  পরমপুরুষ৷ বস্ তু হ’ল প্রতিফলিত সত্তা–রিফ্লেক্টেড এণ্ঢিটি৷ চেতন বস্ তুর মনঃশক্তিও তাঁর থেকেই এসেছে৷ তিনি সকলের প্রয়োজনের পূর্তি ঘটান–পিঁপড়ে থেকে হাতী পর্যন্ত, ছোট ছোট জীব থেকে সমুদ্রের বড় বড় জানোয়ার পর্যন্ত সকলের৷ এতই উদার তিনি৷ সেইজন্যেই তিনি জগতের কর্তা, অধিকর্তা, প্রভু৷ এই রকম উদারতা লাভ করতে পারলে তুমিও তিনি হয়ে যাবে৷

চার প্রকারের সেবা

মানুষের করণীয় কী? জীবন একটা ব্রত৷ আমি বলেছি মানুষের জীবন একটা আদর্শের ধারাপ্রবাহ বিশেষ৷ অর্থাৎ মানব জীবন একটা ব্রত–জীবন মানেই ব্রত অস্তিত্ব মানেই ব্রত৷ ‘‘আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’’–মানুষ যা–ই করুক না কেন, তা করা উচিত আত্মমোক্ষের জন্যে–তার নিজের মোক্ষের জন্যে, আর করা উচিত সমগ্র বিশ্বের উন্নতির জন্যে৷ মানুষের এই দু’টো কাজ করতে হবে অর্থাৎ মানুষের ব্রত হচ্ছে এই দু’টো কাজ৷