‘‘একদিকে বিদেশীরা বাঙলাদেশকে অধিকার করেছে৷ অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য করায়ত্ত করে অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বাঙলার বৈষয়িক সম্পদ গ্রাস করেছে৷ বড়ো বড়ো বাঙালী ব্যবসায়ী পরিবার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কৃপায় জমিদার হয়ে জড় বিলাসীতে রূপান্তরিত হয়েছে৷ আর মধ্যবিত্ত বাঙালী হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃতদাস--- দেশী বিদেশী ব্যবসায়ীদের৷’’
উপরের কথাগুলি ১৯২২ সালে এক যুব সম্মেলন বিশ্বখ্যাত বাঙালী বৈজ্ঞানিক ডঃ মেঘনাথ সাহা বলেছিলেন৷ ডঃ সাহার কথায় সেই দিন থেকে বাঙালীর চারিত্রিক অবনতি ও আর্থিক দুর্দশার শুরু হয়েছে৷ কি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, কি স্বাধীনতা পরবর্তী দেশীয় সাম্রাজ্যবাদ উভয়ের লক্ষ্য একটাই--- বাঙালী জনগোষ্ঠীকে বিনাশ করে বাঙলার সম্পদ গ্রাস করা৷ সেই লক্ষ্যেই সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ পূর্বের মেধাশক্তি ও পশ্চিমের বৈষয়িক সম্পদে সমৃদ্ধ বাঙলাকে ভাগ করে লুঠতে চেয়েছিল ব্রিটিশ৷ ১৯০৫ সালের বঙ্গ-ভঙ্গের এটাই ছিল লক্ষ্য৷ সেদিন ব্রিটিশের লক্ষ্যপুরন হয়েনি কারণ বাঙলায় ছিল বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঋষি অরবিন্দের মত ব্যষ্টিত্ব, রাজনৈতিক দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্ব ও মাতৃভূমির জন্যে অক্লেশে প্রাণ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যুবশক্তি৷
চক্রান্ত শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছিল না, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভারতীয় মদতদাতা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় পুঁজিপতিরাও এই চক্রান্তে সামিল হয়ে ছিল৷ সেই লক্ষ্যপুরণ হয় ১৯৪৭ সালে, কারণ তখন জাতীয় কংগ্রেস হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী লবির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে৷ বাঙলার রাজনৈতিক শক্তি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্রের মতো নেতৃত্বের ও যুবশক্তির অভাবে দিল্লির দাসত্বে পরিণত হয়েছে৷
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত থেকেই বাঙলাকে অবলুপ্ত করার নতুন চক্রান্ত শুরু হয় প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর হাত ধরে৷ সেই কাজে সহায়তা করে বিধান রায়ের মতো ব্যষ্টিও৷ তাই দেশভাগের বলি পঞ্জাব যেভাবে তার উদ্বাস্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে নেয় নেহেরু পটেলকে চোখ রাঙিয়ে, বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় তার ছিটে ফোঁটাও আদায় করতে পারেনে৷ হয়তো তিনিও নেহেরুর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে স্বাধীন ভারতে বাঙালীকে অবলুপ্ত করার ষড়যন্ত্রেই সামিল হয়েছিলেন৷ তাই স্বাধীন ভারতে নেহেরুর ষড়যন্ত্রে ও বিধান রায়ের হাত ধরেই বাঙলার অধঃপতন শুরু হয়েছিল৷
ভাগ করো ও শাসন করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই বিভাজন নীতিই বাঙলার ওপর প্রয়োগ করে দেশীয় পুঁজিপতিদের বাঙলা শোষনের সুযোগ করে দেয় নেহেরু৷ তাই স্বাধীনতার পরও বাঙলা ঔপনিবেশিক শোষন থেকে মুক্ত হয়নে৷ পরাধীন ভারতে বাঙলার সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েছে লণ্ডন ম্যাঞ্চেষ্টার, ব্রিটিশ মুক্ত ভারতে বাঙলার সম্পদে সমৃদ্ধ হচ্ছে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান৷ আর বাঙালী! কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি হিন্দু মুসলমান৷ ভ্রাতৃঘাতী রাজনীতিতে মত্ত বাঙালী৷ এ রাজনীতি বাঙলার নিজস্ব নয়৷ স্বভাব বিপ্লবী বাঙালী পশ্চিমী বিকৃত রাজনীতির শিকার হয়ে বিপথে চলছে৷ এ চলার শেষ কোথায়? কবে ঘুরে দাঁড়াবে বাঙালী!
দিল্লির দাস নেতৃত্ব, জড়বাদে আচ্ছন্ন মেধাশক্তি বাঙলাকে ধবংস করার দিল্লির ষড়যন্ত্রে সামিল৷ বাঙলার অর্থশক্তি পঙ্গু করে বাঙলার বৈষয়িক সম্পদ লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম ভারতীয় পুঁজিপতিরা, ভাষা সংস্কৃতিও অবদমিত হিন্দি মার্র্ক অশ্লীল অসংস্কৃতির দাপটে, তৃণমূল গঠিত পাওয়ার আগে বাঙলার শাসকেরা ছিল দিল্লির নিয়ন্ত্রিত৷ রাজ্যের শাসন ক্ষমতা দিল্লির নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়াতে উন্মত্ত পশ্চিমি শক্তি বাঙলাকে ধবংস করার খেলায় নেমেছে৷ মির্জাফর,রায়দুর্লভ, নরেনগোঁসাইর দেশ থেকে কিছু সহযোগীও হয়েছে৷ তবু কি বাঙলা করায়ত্ব হবে! একটা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ৷ হঠাৎ দেখলে মনে হবে দেশে বুঝি বহিঃশত্রুর আক্রমন হতে পারে এ তারই প্রস্তুতি৷ বহিঃশত্রুই বটে! বাঙালী আজ তার স্বভূমিতেই পরবাসী উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশকারী৷ তার রাজ্যের নির্বাচনে তার ভোটাধিকার নেই৷ অথচ এক কোটিরও বেশী পরিযায়ী ভোটার বাঙলার নির্বাচনে ভোট দেবে৷ কিন্তু তারপর! বাঙালী মারের ওপর মাথা তুলতে জানে৷ শুধু অগ্ণিযুগের ঘুমন্ত আগ্ণেয়গিরি জেগে ওঠার অপেক্ষায়৷ ৭৮ বছরের সব হিসেব তখন দিতে হবে৷
- Log in to post comments