আনন্দমার্গ দর্শনের প্রবক্তা মহান দার্শনিক ধর্মগুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী তাঁর ‘চরম নির্দেশে’৷ ভক্তবৃন্দকে দুবেলা সাধনা করার কথা বলেছেন, যম-নিয়ম ব্যতিরেকে সাধনা হয় না৷ সেজন্য যম-নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারেও বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন৷ জীবনের সর্বক্ষেত্রে যম-নিয়মের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য, বিশেষ করে সমাজে বা রাষ্ট্রে যাঁরা পরিচালকের (প্রশাসকের) ভূমিকায় থাকেন তাঁরা যদি যম-নিয়ম অভ্যস্ত না হন তবে সে সব ক্ষেত্রে অরাজকতা বা অস্বাভাবিকতা অবশ্যম্ভাবী৷
যমের পাঁচটি অঙ্গ, তা হল (১) অহিংসা, (২) সত্য, (৩) অস্তেয়, (৪) অপরিগ্রহ, (৫) ব্রহ্মচর্য৷ নিয়মের পাঁচটি বিভাগ তা হল---(১)শৌচ, (২) সন্তোষ (৩) স্ব্যাধ্যায় (৪) তপঃ (৫) ঈশ্বর প্রণিধান৷ যমের প্রথম ও প্রধান অঙ্গটি হল---‘অহিংসা৷ পৃথিবীর সমস্ত ধর্মশাস্ত্রই অহিংসাকে পরমধর্ম বলে মেনে নিয়েছেন৷ যদিও কোন কোন ধর্মমতের অনুগামীদের শত্রু বলে ভাবেন এবং হিংসার আশ্রয় নেন, অহিংসার প্রকৃত সংজ্ঞা হল--- ‘মনোবাক্কায়ৈঃ সর্বভূতানাম্ অপীড়নম্ অহিংসা) ৷ অর্থাৎ মন, বাক্যও শরীরের দ্বারা কারও উপর পীড়ন না করাই হল অহিংসা৷
এই ‘অহিংসা’ শব্দকে নানা জন নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন৷ কোন কোন ধর্মীয় সংঘটন বা প্রতিষ্ঠান এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা মেনে চললে সংসার জীবনে দৈনন্দিন কার্যনির্বাহ অচল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়৷ তাঁদের মতে হলাকর্ষন করলে মাটির নীচে পোকামাকড় মারা যেতে পারে৷ অতএব ধর্মজীবনযাপন ইচ্ছুক ব্যষ্টি নিজে লাঙন না করে শূদ্রকে দিয়ে তা করাবেন৷ অনিচ্ছাকৃতভাবেও যাতে জীবহত্যা না হয় সেজন্য আগে রাস্তা পরিষ্কার বা ঝাঁটা দিয়ে তারপর সেই পথ দিয়ে তাঁরা হাঁটার কথা বলে থাকেন৷ প্রকৃতপক্ষে এগুলি অহিংসার অপব্যাখ্যা৷ এগুলি বাস্তবধর্ম বিরোধী---জৈবধর্মবিরোধী, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে অজস্র জীবানুর আগমন নির্গমন হচ্ছে--- তাদের অনেকেই মারা পড়ছে৷ তাদের বাঁচাবার স্বার্থে (অহিংসার পালনার্থে) আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়াও তাহলে বন্ধ করে দিতে হয়৷ শরীর মধ্যস্থ রোগজীবানু ধবংস করার জন্য ঔষধ সেবনও বন্ধ করে দিতে হয়৷ বিশুদ্ধ জলপানও বন্ধ রাখতে হয়৷ ফলতঃ অহিংসার এই জাতীয় ব্যাখ্যাকে মেনে নেওয়া যায় না৷
কারও কারও ব্যাখ্যা--- জীব জীবের খাদ্য, জীবকে কোন প্রকারে ক্লেশ দেওয়া, হিংসা বটে৷ কিন্তু খাদ্যার্থে পশুহত্যা হিংসা নয়, এখানেও বিচারে মস্ত বড় গলদ থেকে যাচ্ছে, কোন পশুই হাসিমুখে যূপকাষ্টে মাথা গলিয়ে দেয় না বা খাদ্যরূপে মানুষের কাছে এসে হাজির হয় না৷ সবার কাছেই নিজ নিজ প্রাণ অতীব প্রিয় সবাই নিজেকে ভালবাসে৷ আনন্দমূর্ত্তিজী বলেন---‘খাদ্য গ্রহণকালে দুটি বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার৷ প্রথমটি হল---খাদ্য নির্বাচন যতদূর সম্ভব অবিকশিতচৈতন্য জীবের মধ্য থেকে (অর্থাৎ শাকসব্জী পাওয়া গেলে পশুহত্যা না করে) করা উচিত৷ আর দ্বিতীয় কথা হল যে কোন অবস্থাতেই কোন জীবকে (তা বিকশিত চৈতন্যই হউক আর অবিকশিত চৈতন্যই হোক) খাদ্যার্থে হত্যা করার আগে ভেবে দেখতে হবে যে একে হত্যা না করেও আমি সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকতে পারি কি না৷’’
অহিংসার আরও একটি ব্যাখ্যা শুণতে পাই, এতে অহিংসার মানে ধরা হয় শক্তির অপ্রয়োগ (nonviolence)৷ এই জাতীয় ব্যাখ্যায় অহিংসার কদর্থ করা হয়েছে, কেননা কোন কোন শত্রু দেশ যদি আমাদের দেশকে আক্রমণ করে তবে সেখানে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য আমাদের বীর সেনানীদের অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, আপামোর দেশবাসীকেও সমস্ত বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে তাদের পাশে থাকতে হবে৷ এতে হয়ত অনিচ্ছাকৃত লোকক্ষয় হবে৷ কিন্তু এটাকে হিংসা বলা যাবে না৷ এটা অপরাধও নয়৷ যেখানে আমাদের চিন্তা বা ক্রিয়া কাউকে পীড়ন করার মতলবে সৃষ্ট বা পুষ্ট হয় তাই হিংসা পর্যায়ভুক্ত, পিতামাতা তার সন্তানকে শাসন করেন প্রয়োজনে বেত্রাঘাত করেন---তা কিন্তু হিংসা নয়৷ কারণ এখানে কল্যাণের ভাবনাটাই মুখ্য, অযথা কষ্ট দেওয়া তাদের লক্ষ্য নয়৷
অপরদিকে শক্তির সম্প্রয়োগ যাদের বিরুদ্ধে অবস্থার চাপে পড়ে করতে হয়, সংস্কৃত ভাষায় তাদের বলা হয় ‘আততায়ী’৷
‘‘ক্ষেত্রদারাপহারী চ শস্ত্রধারী ধনাপহাঃ
অগ্ণিদগরদশ্চৈব সড়তে আততায়ীনঃ৷’’
অর্থাৎ যে জবরদস্তি করে অনৈতিকভাবে কারও ভূসম্পত্তি দখল করতে চায়, যে পরস্ত্রীকে অপহরণ করতে চায়, যে অস্ত্রের সাহায্যে অপরকে হত্যা করতে চায়, যে পরদ্রব্য বা সম্পদ অপহরণ করতে চায়, যে অন্যের গৃহে অগ্ণিসংযোগ করতে এসেছে বা বিষপ্রয়োগ করে অন্যকে হত্যা করতে চায়--- এরা সবাই আততায়ী পদবাচ্য৷ আততায়ীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে৷ আমি অহিংসার পূজারী একগালে চড় মেরেছে আর এক গাল বাড়িয়ে দাও--- এই নীতি এখানে চলবে না৷ আততায়ীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাতেই পৌরুষের পরিচয় মেলে৷ রামায়ণে রামচন্দ্র পত্নীহরণকারী রাবণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছিলেন৷ মহাভারতে দেখতে পাই শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবগণকে অধার্মিক কৌরবদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে উৎসাহ দিয়েছিলেন৷ কারণ কৌরবরা ছিলেন ভূমি অপহরণকারী আততায়ী৷ প্রেমাবতার চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তমণ্ডলীকে নিয়ে অত্যাচারী কাজীর উপর সিংহবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন৷ তাঁরা সবাই ছিলেন সর্বজনপূজ্য প্রেমাবতার অহিংসার পূজারী৷ আততায়ীর বিরুদ্ধে শক্তি সম্প্রয়োগ করাতেই পৌরুষ৷ না করাই ক্লীবত্ব, ফলে হিংসা ও শক্তিসম্প্রয়োগ সমার্থক নয়৷
হিংসা ও অহিংসার ধারনা শুধু এইটুকু ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়৷ মনে মনে কারও ক্ষতি চিন্তা করলেও তা হিংসা হবে, আবার বাক্যের দ্বারা কাউকে অকারণে আঘাত করলেও তা হিংসা পদবাচ্য৷ আনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন---‘কারো সঙ্গে বাক্যালাপের সময় কর্কশ বা আঁতে ঘা লাগতে পারে এমন শব্দ প্রয়োগ করবে না৷’’
এই পৃথিবীতে সবাই নিজের প্রাণকে ভালবাসে বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে৷ সাপ আমাদের জাতশত্রু, বাঘ-সিংহ জাত-শত্রু, সেই সাপ যদি লোকালয় থেকে দূরে ঝোপঝাড়ে তার বাসা তৈরী করে বসবাস করতে থাকে, বাঘ-সিংহ প্রভৃতি হিংস্র পশুরা যদি বনে জঙ্গলে থাকে লোকালয় এসে শান্তি ভঙ্গ না করে তবে অবশ্যই আমরা তাদের আঘাত করব না হত্যা করব না৷ যদি করি তা হিংসা করা হবে৷
মুশকিলটা হল সভ্যতার মদগর্বে গর্বিত স্বার্থান্ধ কিছু মানুষকে নিয়ে, অহিংসা নীতি অনুসরণ করলে ব্যষ্টিজীবন বা সমষ্টিজীবন সর্বক্ষেত্রে শান্তি বিরাজ করবে ---এটা জানা সত্ত্বেও মানুষ ব্যষ্টিস্বার্থে বা গোষ্ঠীস্বার্থে কোথাও বা সাম্রাজ্য প্রসারের লক্ষ্যে এক দেশ আর একদেশের উপর আক্রমণ শানাচ্ছে লক্ষ্য লক্ষ্য নিরপরাধ মানুষ অকালে মারা পড়ছে, সুন্দর সুন্দর জনপদ ধবংস হচ্ছে, সভ্যতার ইমারত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, ভাই ভাই এর বুকে ছুরিকাঘাত করছে, বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে একে অপরের ক্ষতিসাধন করছে---যার কুফল সবাইকেই ভোগ করতে হচ্ছে৷
আনন্দমার্গ চায় এমন এক সমাজ-ব্যবস্থা যেখানে কেউ কাউকে হিংসা করবে না, শোষন করবে না বরং সবাইকে পরমপুরুষের সন্তান ভেবে ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে ভালবাসতে শিখাব ফলত রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে এবং বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে৷
- Log in to post comments