গত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতির কোন কথাই রাখতে পারেন নি৷ বছরে দু-কোটি চাকরী, সুইসব্যাঙ্কের কালোটাকা উদ্ধার, দুর্নীতিমুক্ত৷ ভারত সবই আমার প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে৷ আজ সরকার ষোলয়ানা পুঁজিপতি নির্ভর হয়ে পড়েছে৷ একের পর এক রাষ্ট্রয়াত্ব সংস্থা পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে৷ এমন বশংবদ শাসক পেয়ে বেলাগাম পুঁজিপতি শোষক গোটা দেশ শোষনের জালে আষ্টে-পিষ্টে বেঁধে ফেলেছে৷ তবে পুঁজিপতিরাও নিশ্চিন্তে নেই৷ দেশ আজ ভয়ঙ্কর আর্থিক দুর্র্যেগের সামনে৷ শুধু আমাদের দেশ কেন---আজ গোটা দুনিয়ার এই হাল! এই পুঁজিপতিদের দেশ আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানী প্রভৃতি দেশেও বেকার সমস্যা চরম আকার নিচ্ছে৷ ধনবৈষম্য চরম রূপ নিচ্ছে৷ আর তার ফলে পুঁজিপতিরা অর্থবলে সমাজের কেবল অর্থনীতি নয়, সমাজ-সংস্কৃতি- রাজনীতি সবকিছুকে কবলিত করে তাদের শোষণের জালকে এমনভাবে বিছিয়ে দিচ্ছে যে এর থেকে বাইরে বেরুনো এখন খুব কঠিন হয়ে উঠেছে৷
আর এইভাবে তারা গোটা সমাজকে কুক্ষিগত করে’ কলুষিত করছে৷ মানুষের উন্নত সংস্কৃতি, সভ্যতা, ধর্মচেতনা সব কিছুকেই ধবংস করে চলেছে৷ এখন পুঁজিবাদীদের শোষণের এই অক্টোপাশ থেকে মানব জাতিকে মুক্ত হতে হবে৷ নাহলে মানব সংস্কৃতি ও সভ্যতা ধবংস হয়ে যাবে৷ ধনবৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকার সমস্যাও সারা পৃথিবী জুড়ে চরমভাবে বেড়ে চলেছে এই ধনতান্ত্রিক অবস্থার জন্যে৷ এই অবস্থায় কিছু মানুষ পুঁজির সুবিশাল পাহাড় রচনা করছে৷ চরম বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপব্যবহার করে সমাজে অসংস্কৃতির ‘সুনামী’ বইয়ে দিচ্ছে৷
এককথায় এই পুঁজিবাদী শোষণের অক্টোপাশ থেকে সমাজকে মুক্তি পেতেই হবে৷ কিন্তু কী করে? পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদীরা মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে৷ শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চরণে আত্মসমর্পণ করেছে৷
এখন উপায় কী? উপায় একমাত্র ‘প্রাউট’---প্রগতি- শীল উপযোগ তত্ত্ব৷ একথা আমরা বহুবার নানান্ যুক্তি সহকারে বুঝিয়েছি৷ পুঁজিবাদ ও মার্কসবাদ দুই-ই অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণের ওপর আধারিত৷ ধনতন্ত্রে শিল্পপতিরা---ব্যবসায়ীরা অর্থের কেন্দ্রীকণরণ ঘটায়, আর মার্কসবাদ তো আসলে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ৷ জনগণের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসে না৷
প্রাউটের পথে কীভাবে জনগণের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসবে? তার উত্তর--- প্রাউট নির্দেশিত সমাজ আন্দোলনের পথ ধরেই জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসবে৷ প্রাউট বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে অর্থাৎ অথনৈতিক সম্ভাবনা, সম-অর্থনৈতিক সমস্যা, জনগোষ্ঠীগত (এথ্নিক) বৈশিষ্ট্য, সাধারণ সাংবেদনিক উত্তরাধিকার (সেণ্টি মেণ্টাল লিগ্যাসী) ও একই ধরণের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে স্বয়ং সম্পূর্ণ সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইয়ূনিট) গড়ে তোলার নীতিতে বিশ্বাসী৷ আর এই সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সর্বাত্মকভাবে শোষণমুক্ত করার আন্দোলন করতে হবে৷ প্রাউটের পরিভাষায় এটাই হ’ল যথার্থ ‘সমাজ আন্দেলন’৷ এই সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য হ’ল সংশ্লিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চলের ১০০ শতাংশ স্থানীয় মানুষের কর্ম সংস্থানের গ্যারাণ্টি প্রদান৷ আর তা করতে গেলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ স্থানীয় মানুষের হাতেই থাকবে অর্থনৈতিক ক্ষমতা, বহিরাগত পুঁজিপতিদের হাতে নয়৷ ব্লক ভিত্তিক পরিকল্পনা, সমবায়ের আদর্শে কৃষিভিত্তিক ও কৃষিসহায়ক শিল্পের দাবীতে অর্থনৈতিক শোষণমুক্তির আন্দোলনই হবে এর মাধ্যম৷ প্রাউটিষ্ট সর্বসমাজ সমিতি এই অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের নীতি নিয়ে ভারতবর্ষের সর্বত্র অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলছে৷ তাদের এই সর্বাত্মক শোষণমুক্তির আন্দোলনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য, নতুনত্ব তথা এর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবী, কর্ষক, শ্রমিক ছাত্র-যুব তথা মহিলাদের বিশেষভাবে অবহিত হতে হবে৷ সচরাচর অন্যান্য যে সব আন্দোলন আমরা দেখতে অভ্যস্ত তা থেকে এই আন্দোলন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র৷ কারণ এর পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক শ্রীবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বিশ্বৈকতাবাদের প্রতিষ্ঠার এক নোতুন আদর্শ৷
- Log in to post comments