শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েই শুরু করি৷ তবে শুভেচ্ছা জানাবার সময় এটা নয়৷ সময় তো কালের মানসিক পরিমাপ৷ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এই কালের পরিমাপ একসঙ্গে শুরু হয় না৷ পৃথিবীতে তাই বৎসর গণনা এক এক সময় এক এক অঞ্চলে শুরু হয়৷ বাঙলারও নিজস্ব বৎসর গণনা আছে৷ সে এমন শীতের আমেজ নিয়ে আসে না৷ সে আসে চৈত্রের চিতাভস্ম উড়িয়ে বৈশাখের খরতাপে৷
কিন্তু প্রায় ২০০ বছর ইংরেজ শাসনে পরাধীন থেকে ইংরেজী নববর্ষ বাঙালীর রক্তে মিসে গেছে৷ তাই তার দৈনন্দিন জীবনের কাজ-কর্ম ইংরেজী নববর্ষের হিসেবেই চলে৷ শুধু বাঙলা নয়, দীর্ঘদিন পৃথিবীর এক বৃহৎ অংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকায় ইংরেজী নববর্ষ আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে৷ তাই আন্তর্জাতিক নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েই স্বদেশী শাসকের হাতে বাঙালীর দুঃসহ যাতনার ইতিকথা এই সম্পাদনায়৷
যতই শুভেচ্ছা জানাই, সময়টা মোটেই বাঙালীর জীবনে শুভ যাচ্ছে না৷ গণতন্ত্রের বেদীতে স্বৈরাচারী শাসকের বিষাক্ত নিঃশ্বাস৷ বাঙলার সম্পদে পেট চালিয়ে বাঙলাকেই বঞ্চনা৷ দিল্লীর এই চাতুরী স্বাধীনতার প্রথম রাত থেকেই, মোদি জমানায় তা পাহাড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত বাঙালীকে রাষ্ট্রহীন, নাগরিকত্বহীন করার হাতিয়ার শাসকের হাতে---এন.আর.সি, সিএএ, এস আই আর৷ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে তার মহড়া শুরু হয়েছে৷ বছরের শেষ কটা মাস বাঙালীর আত্মীয়ের হাতে লাঞ্ছনা, অত্যাচার, নির্যাতন নীরবে সহ্য করেই কাটলো৷ প্রতিবেশী রাজ্যে বাঙালী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর বর্বরচিত আক্রমণ, পিটিয়ে মারা, পুড়িয়ে মারা---বহু ঘরে স্বজন হারানোর যাতনা নববর্ষের প্রথম প্রভাতের সুর্র্যেদয়কে অমানিশার অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে৷ তবু বিবেকহীন বাঙালীর কন্ঠে কোন প্রতিবাদ নেই৷ বাঙালীর বিবেক বিকিয়ে গেছে ধর্মান্ধ মৌলবাদের কাছে, বাঙালীর বিবেক বিকিয়ে গেছে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী কদর্য রাজনীতির কাছে৷
বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় পরাধীন ভারতে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে দুর্বল করতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক লর্ড কার্জন বঙ্গ-ভঙ্গ আইন পাস করেছিল৷ কিন্তু সেদিন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দের মত ব্যষ্টিত্ব ও দামাল তরুণ বাঙালীর প্রতিবাদ প্রতিরোধের সামনে মাথানত করতে বাধ্য হয়েছিল সূর্য অস্ত না যাওয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসক৷ পরাধীন ভারতের ইতিহাসের সেই অগ্ণিযুগের কথা স্বাধীনোত্তর ভারতের নব প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত থেকে গেছে, অজ্ঞাত রেখে দেওয়া হয়েছে৷
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতে-তথাকথিত স্বাধীনতায় খণ্ডিত বাঙলার ভারতের অংশ পশ্চিমবঙ্গ সাম্র্যাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শোষকের হাত বদল হয়৷ বিদেশী ব্রিটিশ শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর হয় স্বদেশী সাম্রাজ্যবাদী শাসকের হাতে৷ বাঙলা ঔপনিবেশিক শোষনের বলি হলো স্বদেশী বেনিয়ার হাতে৷ ৭৮ বছরে বাঙালী আর্থিক সম্পদে নিঃস্ব৷ স্বাধীনতার প্রথম রাতেও খণ্ডিত বাঙলা ছিল ভারতের সব থেকে সমৃদ্ধশালী রাজ্য৷ শুধু আর্থিক দিক থেকে নয়, অবদমিত হচ্ছে তার ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতি৷ আজ মোদি জমানায় বাঙালীর অস্তিত্বই বিপন্ন৷ তাকে রাষ্ট্রহীন, নাগরিকত্ত্বহীন করে ডিটেনশন ক্যাম্পের কারাগারে বন্দি করার চক্রান্ত৷ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালী শ্রমিকরা হেনস্থা হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, খুনও করা হচ্ছে৷
সামনে বিধানসভা নির্বাচন, বাঙলায় স্বৈরাচারী শাসকের আনাগোণা বাড়ছে৷ বাঙালী বিদ্বেষী বঙ্গ সংস্কৃতি বিরোধী বিজেপির সোজাপথে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা একপ্রকার অলীক স্বপ্ণ৷ তাই সবরকম স্বৈরাচারী অপকৌশল সে বাঙলার ওপর প্রয়োগ করবে ক্ষমতায় অব্যবহার করে৷ রাজ্যে রাজ্যে বাঙালী শ্রমিক নির্যাতন, নির্বাচন কমিশনের এস আই.আরের প্রয়োগ তারই পদধবনি৷ ২০২৬-এর সূর্র্যেদয় বাঙালীর দুয়ারে বড় দুঃসময়ের বার্র্ত বহে এনেছে৷ তার প্রতিটি রাত আতঙ্কের প্রহর গুনে কাটবে৷ বাঙালীকে সব বিভেদ বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এই দুঃসময়ের মোকাবিলা করতে হবে৷ নতুবা ভারতের মানচিত্র থেকে বাঙালীর অস্তিত্ব মুছে যাবে৷
- Log in to post comments