রাজনীতির কদর্য চিত্রটা আর একবার নক্ষদন্ত বার করে জনমানষে আতঙ্ক সৃষ্টি করে প্রকাশ হয়ে পড়ল৷ সেই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভাজনের রেখাটা বড় হয়ে দেখা দিল৷ রাজ্যের শাসক দল যদি কেন্দ্রীয় শাসকদলের মন পছন্দ না হয় অথবা ডবল ইঞ্জিন সরকার না হয় তবে তার ক্ষেত্রে নিয়মটা একটু আলাদা হয়ে যায়৷ সবার জন্য সাংবিধানিক অধিকার সমান এই কথাটা গৌণ হয়ে যায়৷ ভোট পরবর্তী বেশ কয়েকটা হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে যেখানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের প্রথম শ্রেণীর নেতারাও আক্রান্ত৷ সেদিনের বিরোধীদল আজকের শাসকদলের শ্রেণী চরিত্রটাও পাল্টে গেল৷ কেন্দ্রে ক্ষমতা জোরে সেদিন নির্বাচন পরবর্তী হিংসার তদন্তভার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুল সিবিআই এর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল৷ আজ তারা ক্ষমতায় বসে এই নৃশংস হিংস্রতাকে বিরোধীদলের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ রাষ্ট্রের কিছু করার নেই বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল৷ প্রশাসন শাসক দলের অঙ্গুলি হেলনে চলে৷ তাই তাদের সম্পর্কে কিছু বলার নেই৷ কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম নিরপেক্ষ স্তম্ভ গণমাধ্যমের ভূমিকায় ধিক্কার জানাবার ভাষাও হারিয়ে গেছে৷
বাঙলার ইতিহাসের ভয়ংকর নির্মম বর্গী হামলার কথা আজ আবার মনে পড়ছে৷ বিশ্বাসঘাতক মীর হাবিব নবাব আলীবর্দির প্রতি প্রতিশোধ নিতে বাঙলায় নাগপুরের ভয়ংকর বর্গিদস্যুদের ডেকে এনেছিলো৷ পরিণতিতে প্রায় ১০ ধরে বাঙলার ধন-সম্পদ লুণ্ঠন, লক্ষাধিক মা বোনদের ধর্ষণ নির্যাতন বাঙলার ইতিহাসের এক নৃশংস নির্মম অধ্যায়৷ আর এক বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলী খাঁর হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করলো বিদেশি ব্রিটিশ বণিকের দল৷ পরিণতিতে দেশ ১৯০ বছর পরাধীন৷ তারপর দেশ স্বাধীন হলেও বাঙলার ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সূর্য আজও মেঘে ঢাকা৷
আজ আবার আর এক বিশ্বাসঘাতকের হাত ধরে কি বাঙলায় আবার বর্গী আক্রমণ শুরু হলো! তবে বিশ্বাসঘাতক মীর হাবিব ও বর্গিদস্যুদের শেষ পরিণতি ভালো হয়নি৷
বাংলার আজকের এই পরিণতির পেছনে কংগ্রেস কমিউনিষ্ট আরএস এস ও হিন্দু মহাসভার তিনেরই অবদান আছে৷ কমিউনিস্ট ও হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদের সুভাষ বিরোধিতার কদর্য ইতিহাস স্বাধীন ভারতের নতুন প্রজন্ম জানে না৷ কারণ সেদিন কংগ্রেসও সুভাষ বিরোধিতায় তলে তলে ব্রিটিশ কে সাহায্য করেছিল৷ স্বাধীন ভারতে দিল্লির নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস কমিউনিস্ট ৬৫ বছর বাঙলাকে শাসন করে ধবংসের কিনারে পৌঁছে দিয়েছে৷ দিল্লিতে প্রায় ৬৫ বছর কংগ্রেস শাসন করলেও নিজেদের কালী ঢাকতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত অধ্যায় কালাধারে ঢেকে দেয়৷ যাতে আরএসএস হিন্দু মহাসভা ও কমিউনিস্টদের কলঙ্কিত ইতিহাসও ঢাকা পড়ে যায়৷
আজ ক্ষমতায় বসে যারা ধরা কে সরা জ্ঞান করছে, তারা হিসাবে রাখছে না প্রায় এক কোটি ভোটার বাদ দিয়ে আড়াই লক্ষ আধা সেনা, বিজেপির শতাধিক সর্বভারতীয় নেতা আরো কয়েক হাজার পুলিশ বিভিন্ন রাজ্য থেকে এনে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে বাঙলা দখল করলেও তৃণমূলের ৪১ শতাংশ ভোট কিন্তু নেহাত কম নয়৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব থেকে বড় ভুল করেছেন ২০১১ সালে রবীন্দ্র সংগীত শুনিয়ে৷ তাই ঠিক জনরোষ কাকে বলে আজকের বাঙলার গদি মিডিয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই৷
আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেছনে আছে৷ সেদিন কংগ্রেসের কদর্য রাজনীতির প্রতি ঘৃণায় সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি পদত্যাগ করেছিলেন৷ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ঐতিহাসিক পত্রে সুভাষচন্দ্র কে বাংলাদেশের দেশনায়কের পদে বরণ করেছিলেন৷ সেই ঐতিহাসিক পত্রে বিশ্ব কবি লিখেছিলেন --- ’আত্মীয় ও পরের হাতে বাঙালীকে অশেষ লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে৷.... হিংস্র দুঃসময়ের পিঠের উপর চড়ে বাঙালীকে বিভীষিকার পথ অতিক্রম করতে হবে৷.... বাঙালী অদৃষ্ট কর্তৃক অপমানিত হয়ে মরবে না৷.... প্রচন্ড মার খেয়েও বাঙালী মারের ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবে৷ ’
পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে সুভাষচন্দ্রের আর বাংলাদেশের দেশনায়ক হয়ে ওঠা হয়নি৷ দেশীয় পুঁজিপতি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল দেশনেতাদের কুটিল চক্রান্তের শিকার হয়ে সুভাষচন্দ্র হারিয়ে গেছেন৷ কিন্তু তার দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আজও ছাত্র যুবদের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে৷ বাংলাদেশের দেশনায়কের পদ আজও শূন্য৷ বাঙালী সমস্ত প্রকার সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিভেদ-বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে, বাঙলার ছাত্র যুব আর একবার অগ্ণিযুগের মতো জেগে উঠলে বাংলাদেশের দেশনায়ক তাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসবে৷ এই কদর্য হিংস্র রাজনীতির মূল উৎপাটন করতে পারলে বাঙলা আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে৷
- Log in to post comments