সনাতন বলতে বোঝায় যা চিরন্তন ও শ্বাশত৷ সনাতনী ঐতিহ্য হলো চিরন্তন জীবনধারা ও সংস্কৃতির সমষ্টি৷ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী অঙ্গীকার করেছেন বাঙলায় সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবেন৷ ভয়টা এখানেই৷ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোন প্রতিশ্রুতি দিলে তা সাধারণত পালন করা হয় না৷ সে বছরে দুকোটি চাকরী হোক, সুইসব্যাঙ্কের কালো টাকা ফেরৎ বা নেতাজী সুভাষ সম্পর্কিত গোপন ফাইল৷ অপর দিকে চারমাস আগে নির্বাচনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল--- রাজ্যের সেস উঠিয়ে দিল্লির সমান পেট্রোলের দাম, ৪৫০ টাকায় গ্যাস৷ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসে নির্বাচন পূর্ব প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কোন তাগিদ নেই৷
এ হেন মুখ্যমন্ত্রীর মুখে বাঙলার সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার বঙ্গবাসীর কাছে আশার আলো নাকি অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আতঙ্ক! সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ থেকে এক বাগেশ্বর বাবা বাঙালীকে নিরামিষ খাবার উপদেশ দিতে এসেছিলেন৷ তিনি আমিষ খাওয়া নিয়ে বাঙালীকে পাখণ্ডী বলে উল্লেখ করেন৷ মুখ্যমন্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে৷ তারপরও তিনি বাগেশ্বরের উক্তির কোন প্রতিবাদ করেননি বরং তাকে সংবর্ধনা দেন৷ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী পাখণ্ডী শব্দের মানে বোঝেননি, নতুবা মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে বাঙালী অস্মিতার অভাব আছে৷ একটি জাতির আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে তার পক্ষে কি বাঙালীর সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব৷
আরএসএস বিজেপি দলটির বাঙলার ভাষা-সাহিত্য -সংস্কৃতি ও বাঙলার মনীষীদের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই৷ বাঙালীকেও আরএসএস বিজেপি করতে হলে বাঙালী অস্মিতা ত্যাগ করতে হয়৷ আরএসএস বিজেপি মূলত গোবলয়ের দল৷ বাঙলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি, আহার বিহার আচরণ চালচলন৷ এর সঙ্গে গোবলয়ের বিরোধ চিরকালীন৷ তাই আরএসএস বাঙলায় সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি৷ যুক্তিবাদী বাঙালী কোনকিছু অন্ধবিশ্বাসে মেনে নিতে পারে না৷ তাই বাঙালীর ধর্মবোধ জীবনধারার সঙ্গে গোবলয়ের ধর্মবোধ জীবনধারা মেলেনা৷ বাংলার সংস্কৃতি সভ্যতার ভিত্তি ও শৈব তন্ত্রের উপর গড়ে উঠেছে৷ তাই বাঙলার গ্রামে গ্রামে শিব মন্দির থাকলেও কয়েক বছর আগে পর্যন্ত হনুমান গনেশের মূর্তি খুব একটা দেখা যেত না৷ দিল্লির নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাঙলায় গণেশ হনুমানের প্রাবল্য দেখা দিয়েছে৷
যুক্তিবাদী বাঙালী যেমন সবকিছু সহজে মেনে নিতে পারে না, তেমনি অন্যায় অবিচার শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তার রক্তে স্বভাবজাত৷ তাই শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞানে অর্থনীতিতে রাজনীতিতে বাঙলা ছিল ভারতের প্রথম পথপ্রদর্শক৷ উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ঘটেছিল বাঙলা থেকে৷ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙলাকে ভাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাবার পর থেকেই নিম্নমানের হিন্দি ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার করে বাংলার ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি ঐতিহ্য ধবংসের কাজ শুরু দিল্লি সরকার৷ বিধান রায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাঙলার শাসকরাও দিল্লির দাসত্ব স্বীকার করে নেয়৷ ব্যতিক্রম ছিল ১৫ বছরের তৃণমূল শাসক৷ মমতা ব্যানার্জী চেয়েছিলেন বাঙলার হৃত গৌরব কিছুটা হল ফিরিয়ে আনার৷ কিন্তু আভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও বিরোধীদের নিকৃষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেও ১৫ বছর শাসন করা কম কথা নয়৷ এই ১৫ বছর বাংলা অন্তত দিল্লির বশ্যতা থেকে মুক্ত ছিল৷
বাঙলায় শাসক পরিবর্তনে জনমতের ছাপ কতটা আছে তা নিয়ে বিতর্ক থাকবেই৷ এস আই আর এর নামে ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া থেকে নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল৷ তবু রাজ্যের নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাঙলায় সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করতে পারবেন তা নিয়ে শিক্ষিত সচেতন বাঙালী যথেষ্ট সন্দিহান৷ কারণ আরএসএস বিজেপির হিন্দুত্ববাদ আর বাঙলার সনাতনী ঐতিহ্য সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারা৷ মুখ্যমন্ত্রী কি পারবেন স্রোতের বিপরীত মুখে গিয়ে বাঙলার সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে৷ সবাই কিন্তু মমতা ব্যানার্জি নয়৷ দল ছেড়ে দল গঠন করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়৷ মুখ্যমন্ত্রীও একসময় তৃণমূল ছিলেন৷ দল ছেড়ে তিনি কোন নতুন দল গঠন করতে পারেননি৷ অর্থ ক্ষমতায় তৃণমূলের চেয়ে বৃহৎ শক্তিশালী সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবধারার একটি দলে আশ্রয় নিয়েছেন৷ সেই দলের অনুশাসন মেনেই তাকে চলতে হচ্ছে৷ বিপরীত মুখে চলার যে শক্তি ও সাহস প্রয়োজন তা শুভেন্দু অধিকারীর নেই৷ তাই বাঙলার সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা নয়৷ বাংলার সনাতনী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদ্ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তাকে কাজ করতে হচ্ছে৷ তাই সনাতনী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি কথার কথা, বাজে কথা হয়েই থেকে যাবে৷
- Log in to post comments