মানুষ একটি বিশেষ জীব-প্রজাতি হলেও পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব সবার শেষে ( এই মানুষই বিধাতার সর্বশ্রেষ্ট জীব ) ৷ কেউ এসেছে আগে , কেউ এসেছে পরে ,আবার অনেক জীবপ্রজাতি পৃথিবীর বুক থেকে অবলুপ্তও হয়ে গেছে , এসেছে নোতুন জীব-প্রজাতি ৷৷ কেঊ খাদ্যাভাবে , কেঊবা প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ধরিত্রী থেকে মুছে গেছে ৷ এরা অবশ্য কেউই নিজেদের বাঁচার রসদ নিজেরা সৃষ্টি বা তৈরী করতে পারেনি , তাই অভিযোজনের অক্ষমতায় হারিয়ে গেছে ৷ উদ্ভিদ জগৎ ও মানুষের ক্ষেত্রে অবশ্য এই সম্ভবনা নেই ৷ উদ্ভিদ জগৎ প্রকৃতিগত ভাবে স্বতঃ - স্বনির্ভর, মানুষ প্রকৃতি ও আপন মণীষার সাপেক্ষে স্বনির্ভর৷ এ সব থেকে একটা কথা স্পষ্ট যে পৃথিবীটা মানুষের একার নয় ৷ শুধু কী তাই , কোন কোন বিশেষ বিষেষ নর গোষ্ঠীরও একার নয় ৷ ছোট-বড় , চেতন-অচেতন, জড় অজড় , অব্যক্ত-ব্যক্ত , স্থাবর-জঙ্গম সবারই পৃথিবীর ওপর প্রকৃতিদত্ত অধিকার ৷ জীব-অনুজীব, উন্নত জীব -অনুন্নত জীব , অনুজীবৎ, তরু-লতা-গুল্ম , পশু-পক্ষী সবাই বাঁচতে চায় ৷ তাই মানুষ একা বাঁচবে না , সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে ৷
ভুললে চলবে কি করে! দর্শন, অধ্যাত্মবিজ্ঞান বলে প্রতিটি জীবসত্তাই অণুচৈতন্য বিশেষ ৷ শুধু তাই নয়, জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু-ত্রসরেণু তা ব্যক্ত -অব্যক্ত, জড়াধার, সজীব যাই হোক না কেন সবই ভূমা চৈতন্যেরই কণা মাত্র / অংশ মাত্র ৷ অর্থাৎ’ আব্রহ্মস্তম্ব ‘৷ ঈশ্বর থেকে শুরুকরে সামান্য ঘাসের পাতা পর্যন্ত পরমাত্মারই তথা ভূমাচৈতন্যেরই অভিপ্রকাশ৷ তাই সবারই উৎস ও পরমাগতি (মোহানা) একই ৷ আর মানুষ যেন পৃথিবীর ক্ষণিকের অতিথি, সুদূরের যাত্রী আমরা ৷ তাহলে তো ব্যাপারটা দাঁড়াল, পৃথিবীটা দূরের যাত্রপথের হল্ট ষ্টেশন ৷
আমরা জানি , আমরা দেখি যে পৃথিবীটা স্থির নয় ৷ সূর্যের উদয় - বিলয় , দিন-রাত্রির আবর্তন , রাতের আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের স্থানান্তর তারই সাক্ষ্য দেয়৷ ত্রিভুবনের প্রতিটি সত্তার মধ্যেই এই চলমানতা ৷ সব কিছুই বিবর্তন-পরিবর্তন ---পরিমার্জন- রূপান্তরণ ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে একমুখিতার অধীন ৷ লক্ষণীয় , চলার মধ্যে রয়েছে ক্রমোন্নতমুখী সততস্বতঃক্রিয় ঘাত-প্রতিঘাত , সশ্লেষণ-বিশ্লেষণ , সংযোজন --- বিভাজন -উদ্বর্তন ৷ সবই , সবাই চলছে , ছুটছে৷ এই গতিধারার একটি গতি মার্গ আছে যা বৃত্তাকার৷ বিজ্ঞানাচার্যের ভাষায় --- চক্রবৃত্তে ’ আমরা যথা হইতে আসি , তথায় ফিরিয়া যাই ৷ ‘ সব কিছুই যদি ভূমাচৈতন্য ( কস্মিক্ কন্সাস্নেস্) থেকে এসে থাকে তাহলে সৃষ্টের আসাটা সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে, পঞ্চভৌতিক জগতে - স্থূলীভূত সত্তায় ৷ কিন্তু গতি কী এখানেই থেমে যাবে ! ষ্টার্টিং পয়েণ্ট থকলে তো ফিনিশিং পয়েণ্টও থাকতে হবে ! আবার সৃষ্টির কেন্দ্রাভিমুখী (স্রষ্টার দিকে বা পরমচৈতন্যাভিমুখী৷ প্রবল আকর্ষণ বলও তো সতত সক্রিয় ৷ তাই ফেরাটা এই স্থূল থেকে সূক্ষ্মে - সেই ভূমাচৈতন্যে ৷ গতির শক্তিটা অভিকর্ষজ -মহাকর্ষজ বল --- যা ভূমা চৈতন্য থেকেই সতত উদ্ভূত ৷ ‘ শক্তি সা শিবস্য শক্তি ৷’
উপস্থাপনার এই সূত্র ধরে অনিবার্যভাবেই কতকগুলো প্রসঙ্গ সামনে আসে ঃ-----
পৃথিবীটা মানুষ -মনুষ্যেতর প্রাণী- প্রতিটি নরগোষ্ঠী-জনগোষ্ঠী, কীট-পতঙ্গ, পশুপক্ষী তথা প্রতিটি সত্তার পৃথিবী৷ এখানে সকলেরই আপন আপন বৈশিষ্ট্যে বাঁচার সমান অধিকার, এ অধিকার প্রকৃতিদত্ত বা ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার ৷ একথা আগেই বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর কোন মান্যতা নেই ৷
ত্রিভুবনের প্রতিটি সত্তাই পরমেশ্বরেরই অভিপ্রকাশ ৷ সবার মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজ করছেন ৷ তাঁর দৃষ্টিতে সবাই সমান ৷ সকলেই তাঁর পরম আদরের সন্তান ৷ তাই তাঁর কাছে কেঊ ছোট নয় , কেঊ বড় নয় ৷ কেঊ হীন নয , নীচও নয় ৷ কিন্তু মাটির পৃথিবীতে তার কোনো নজির চোখে পড়েনা ৷ ঈশ্বরের সৃষ্টিতে বৈচিত্র্য আছে , কেননা বৈচিত্র্যই প্রাকৃত ধর্ম৷ তবু বৈষম্য নেই ৷ বৈষম্য হচ্ছে ধান্দাবাজ , ফিকিরবাজ ,পরসম্পদ লোভী -পরস্বাপহারী ,আত্মকেন্দ্রিক-আত্মসুখ বিলাসী, ঈর্ষাকাতর মানুষেরই সৃষ্টি ৷ বৈষম্য আর বৈচিত্র্য এক জিনিস নয়৷ বৈচিত্র্য সংশ্লিষ্ট সত্তার স্বভাব ধর্মে বাঁচার অধিকার ও আত্মস্থ গুণকে মান্যতা , মর্যাদা দেয় ও পোষণ করে ৷ বৈষম্য এর ঠিক বিপরীত ধর্মী ৷
পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট আকার আয়তন আছে ৷ অর্থাৎ পৃথিবীটা সীমাবদ্ধ , তাই সসীম পৃথিবীর সম্পদও সীমাবদ্ধ ৷ অথচ মানুষের চাহিদা অসীম ৷ একদিকে যেমন সীমিত সম্পদে মানুষের অসীম চাহিদা পূরণের প্রশ্ণ , অন্যদিকে রয়েছে মনুষ্যেতর প্রাণী , উদ্ভিদ জগৎ--- এদের বাঁচার প্রশ্ণ৷ কোনো ব্যষ্টি বা গোষ্ঠী যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহ্রণ করে , সঞ্চয় করে , কুক্ষীগত করে তবে অন্যেরা বঞ্চিত হবে , অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়বে ৷ এই পরিস্থিতিতে সকলকেই সুস্থ-সুন্দর করে বাঁচতে দিতে একটা বিজ্ঞানসম্মত , যুক্তিসঙ্গত ও বিচারশীল সর্বানুস্যূত ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার ৷ বাস্তবে এর অভাব রয়েছে৷
মানুষ বিধাতার সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্ট জীব ৷ মননশীলতায় বিচারশীলতায় তার পরিচয় ৷ মননশীল -বিচারশীল মন নিয়ে মানূষ ক্রমবিবর্তিত ও পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বুকে জীব জগতের মধ্যে, তিল তিল করে, হাজার হাজার বছর ধরে একটা স্বতন্ত্র জীবনধারা -জীবনশৈলী গড়ে তুলেছে৷ আভিধানিক পরিচয়ে একেই বলা হয় সভ্যতা ৷ আসলে আমাদের জীবনের বিভিন্ন অভিব্যক্তির মধ্যে শিষ্টাচারের যে সূক্ষ্ম ভাবটির সংস্পর্শে আমরা আসি তাকেই বলে সভ্যতা৷ আবার আমাদের জীবনের বিভিন্ন অভিপ্রকাশের ক্ষেত্রে যেখানে সংযম , যৌক্তিকতা ও বিচারশীলতার অভিপ্রকাশ ঘটেছে তাই হচ্ছে সভ্যতা ৷ পৃথিবীর জন্ম হয় আনুমানিক ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে ৷ পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাব আনুমানিক ১০ লক্ষ বছর আগে ৷ আধুনিক মানুষ পৃথবীতে পা রেখেছে, সভ্যতার ধারার পত্তন করেছে আনুমানিক পনের হাজার বছর পূর্বে ৷ আর প্রকৃতপক্ষে মানুষের সভ্যতার বিকশিত ধারার সূত্রপাত প্রায় সাত হাজার বছর পুর্বে মহাকৌল সদাশিবের হাত ধরে ৷ ইতোমধ্যে মায়া সভ্যতা , রোমান সভ্যতা, মহেঞ্জদাড়ো , মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার মত বহু সভ্যতা লুপ্ত হয়ে গেছে , নোতুন করে কিছু সভ্যতার আবির্ভাবও হয়েছে , আবার কিছু সভ্যতা ধবংস স্তূপের ভিতর থেকে নোতুন আশ্বাসে ও বিশ্বাসে দারূণ ভাবে জেগেও উঠেছে ৷ এই যে ভাঙা - গড়া , নোতুন করে জেগে ওঠা এর মধ্যে একটা চিরন্তনী লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কাজ করে ৷ এ হ’ল স্থান-কাল-পাত্রের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রগতির ধারাকে যুগ থেকে যুগান্তরে বইয়ে নিয়ে যাওয়া ৷ এই যে গতিমানতা / বহমানতা তিনটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল ৷ তারা হ’ল অস্তিমানে হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষা করা , যার জন্যে প্রয়োজন ন্যূনতম প্রয়োজনপূর্তি৷অর্থাৎ খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা -- এই পাঁচটি মৌল উপকরণের নিশ্চিততা- সুরক্ষা ৷ দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে ভাতি, ভাতি মানে ক্রমোন্নতি তথা প্রগতি ৷ তৃতীয়টি হচ্ছে ‘ আনন্দম্ ‘ -- মানে আনন্দ সম্প্রাপ্তি ৷ বস্তুতঃ, প্রগতি বা ক্রমোন্নতির তো একটা লক্ষ্য থাকবে , উন্নতি বা প্রগতি কোন দিকে? কোথায় বা কেন যাবে? এই লক্ষ্য একটাই -- অনন্ত সুখ পাওয়া, আনন্দসম্প্রাপ্তি৷ (চলবে)
- Log in to post comments