ভারতবর্ষে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটি৷ এই বিশাল জনসংখ্যার দেশে সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো খুবই অপ্রতুল ও দুর্বল৷ ব্লক স্তরে গ্রামীণ হাসপাতাল থাকলেও পরিকাঠামোর ঘাটতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে৷ ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ব্লক স্তরের হাসপাতালে অমিল৷ সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার এই বেহাল অবস্থার সুযোগ নিয়ে গত দুই তিন দশকে কলকাতা সহ মেট্রো শহরগুলোতে আধুনিক পরিকাঠামো ও চিকিৎসার সুবিধা যুক্ত বহু বেসরকারি হাসপাতাল বিস্তার লাভ করেছে৷ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের লোকেরা এই সমস্ত হাসপাতালে তাদের রোগীদের ভর্তি করে৷ কিন্তু বর্তমানে সমস্ত বেসরকারি কর্র্পেরেট হাসপাতাল রোগীদের চিকিৎসার কল্পনার অতীত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে৷ কোন রোগী বেসরকারি হাসপাতালে গেলেই রোগীকে ডাক্তার প্রথমেই একগাদা টেস্টের নিদান দেবেন৷ দেখা গেল হয়তো ওই রোগীর ক্ষেত্রে দুটো টেষ্ট যথেষ্ট৷ বাধ্যবাধকতার কারণে দুটোর জায়গায় তিনি ৮-১০ টা টেস্ট দেবেন৷ এইজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে সেখানে কর্মরত প্রতিটি ডাক্তারের ক্ষেত্রে ডায়গোনেষ্টিক টেষ্টের কোটা নির্দিষ্ট থাকে৷ যদি কোন ডাক্তার কোন রোগীদের ওপর প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক টেষ্টি না দিতে পারে তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই ডাক্তারকে ছাঁটাই করে দেয়৷ এছাড়া টেষ্ট গুলো ওই হাসপাতাল থেকেই রোগীর পরিবারকে বাধ্যতামূলকভাবে করাতে হয়৷ বাইরের নামী ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে টেস্ট করালেও বেসরকারি হাসপাতালে তা গ্রহণযোগ্য হয় না৷ আর বেসরকারি হাসপাতালে মেডিকেল টেষ্টের এর খরচ কয়েকগুণ বেশি৷ রোগীর চিকিৎসার ওষুধ ছাড়া আরও যেসব আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র লাগে হাসপাতালের পরিভাষায় তাকে হসপিটাল কনজিউমেবেলস্ বলা হয়৷ এই সমস্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম বেসরকারি হাসপাতাল গুলি পাইকারি দামেই কেনে৷ কিন্তু কয়েক গুণ বেশি দামেই রোগীর পরিবারের কাছ থেকে ওই সমস্ত চিকিৎসার সরঞ্জামের দাম নেয়া হয়৷ কখনো কখনো তা কয়েকশগুণ পর্যন্ত বেশি৷ জনৈকা সুজাতা দত্ত তার ষাটেধর্ব অসুস্থ মাকে বাইপাসের কোন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন৷ ১২দিন ভর্তি ছিলেন তার মা৷ বিল হয়েছিল ১০ লক্ষ ১০ হাজার টাকা৷ খরচের ধাক্কা আর সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে অর্থাৎ এসএসকেএম এ ভর্তি করেন৷ চার দিন পর সেইখানেই রোগীর মৃত্যু হয়৷ রোগীর পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতাল যে ইনজেকশনের সিরিঞ্জ পাইকারি ২১টাকায় কেনেন৷ সেই সিরিঞ্জের রোগীর পরিবারের কাছে দাম নেয় ২০০ টাকা৷ কতগুণ হল প্রায় ১০ গুণ৷
পাইকারি বাগড়ী মার্কেটে একটি সার্জিকাল গ্লাব্স যেখানে বিক্রি হয় ২০ টাকায়৷ ওই বেসরকারি হাসপাতাল তার জন্য রোগীর পরিবারের কাছ থেকে দাম নিয়েছে আশি টাকা৷ এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে৷ বেসরকারী হাসপাতালের এই ব্যাধি অনেক পুরানো৷ বর্তমানে তার লাগাম ছাড়া অবস্থায় পৌঁছে গেছে৷ মাঝেমধ্যেই খবরে আমরা দেখতে পাই বেসরকারি হাসপাতালে রোগীকে ভর্তির পর রোগীর অবস্থা অনুযায়ী হয়তো আই সি ইউ তে ভর্তি করে চিকিৎসা করলেই চলে৷ কিন্তু অনেক বেশি মুনাফার লোভে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ম্যানেজমেন্ট চিকিৎসকের মাধ্যমে রেফার করতে বাধ্য করেন৷ ভেন্টিলেটরে রোগী মারা যাওয়ার এক দুদিন পর রোগীর পরিবারকে মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়৷ শুধুমাত্র রোগীর পরিবারের ঘাড় ভেঙে আরও বেশি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে৷ এ নিয়ে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়৷
ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কমিশনার তুকারাম মুন্ডে এই বিতর্কে নতুন করে আলো ফেলেছেন৷ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাজে গাফিলতি থেকে শুরু করে বালি মাফিয়া দের লুট সর্বক্ষেত্রের তিনি কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন৷
তবে এজন্য তাকে খেসারতও কম দিতে হয়নি৷ ২৫ বছরের আমলা জীবনে ২১ বার বদলি হয়েছেন৷ তিনি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেছেন বেসরকারি হাসপাতালে প্রায়শই ব্যবহৃত হয় এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম ২৮৪১ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে রোগীর পরিবারকে কিনতে হচ্ছে৷ ২০১৩ সালের জারি করা সরকারি নির্দেশ মোতাবেক তালিকাভুক্ত ওষুধের দামের সর্র্বেচ্চ সীমা নির্ধারিত থাকলেও চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোন নির্দেশ নেই৷ ফলে তাদের দাম সংক্রান্ত তথ্যের দিকে কারো নজর ই থাকে না৷
স্বাস্থ্য কমিশনের এক চিকিৎসক সদস্যের বক্তব্য--- কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের একটি সুইট আছে, যার ভাড়া প্রতিদিন ১৭ হাজার টাকা৷ তারপর রোগীর কাছ থেকে মশা তাড়ানোর ওষুধের দাম নেয়া হয়েছে৷ ওপরে উল্লিখিত রোগীর মেয়ে সুজাতা দত্তের বক্তব্য অনুযায়ী তার মায়ের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ধার্য বেডের চার্জ ছিল প্রতিদিন ১৫ হাজার টাকা৷ তারপরও তার কাছ থেকে কম্বলের জন্য পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে৷ শুধু তাই নয় সামান্য টুথপেস্ট এর জন্য কয়েকগুণ দাম ধরা হয়েছে৷ অনেক সময় দেখা যায় কিছু বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর পর তার পরিবার বিশাল বিলের অংক মেটাতে অপারগ হলে হাসপাতাল মড়দেহ আটকে রাখে৷ বেসরকারি হাসপাতালগুলি এতটা মুনাফালোভী অমানবিক নিষ্ঠুর রুপ দেখে সত্যিই মনে প্রশ্ণ জাগে এগুলো বেসরকারি হাসপাতাল না রোগী পরিবারের রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার???
- Log in to post comments