প্রায় এককোটি মানুষের বোটাধিকার হরণ করে গণতন্ত্রের উৎসব শেষ হল পশ্চিমবঙ্গে৷ উৎসবই বটে! একই পরিবারে বাবা ভোট দেয় তো ছেলের বিষন্ন মুখ৷ বিপরীত চিত্রও আছে৷ স্বাধীনতার ৭৮বছর ধরে একাধিক সরকার নির্বাচিত করে আজ তার সামনে ডিটেনশন ক্যাম্পের নির্জন অন্ধকার জীবনের হাতছানি৷ যে জাতি স্বাধীনতার বেদীতে সব থেকে বেশী বলিদান দিয়েছে, তথাকথিত স্বাধীনতা ও দেশ ভাগের ৭৮বছর পরেও রাষ্ট্রহীন হবার দুঃস্বপ্ণ থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারল না৷
গিলোটিন, গ্যাস চেম্বার নরহত্যার নানা নৃশংস পদ্ধতি ইতিহাসে উল্লেখ আছে৷ কিন্তু মানুষকে এমন তিলে তিলে দগ্দে দগ্দে মারা এও তো কম নৃশংস নয়৷ কার দোষ আর কে বলি হচ্ছে! সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মধ্যযুগীয় বর্বরতার চেয়ে এ কম কীসে? অসহায় মানুষগুলোর কি দোষ! দোষ যদি কারো হয় সে তো রাষ্ট্রের কর্ণধারদের৷ ক্ষমতার লিপ্সা, সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা, অপরিণামদর্শী দিশাহীন নেতৃত্ব, বিভেদ, সংঘাত আর দায়ী দেশভাগ৷ তবু সেই নেতৃত্বকে কোন জবাব দিতে হয়নি৷ কোনও প্রমাণ দাখিল করতে হয়নি৷ নিস্ব হয়ে আদালতের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতে হয়নি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আশায়৷
একটা চেকপোষ্ট আর একটা ভিত্তি বর্ষ ঠিক করে দেবে কে কোন্ পারের? কার বোট দেবার অধিকার থাকবে কার থাকবে না৷ তাতেও তো শেষ নয়৷ নাগরিকত্বহীন করতে আরও অনেক অমানবিক উপায় নেওয়া হয়েছে৷ সেই যাঁতাকলে পড়ে কোথাও পিতামাতা নাগরিক তো সন্তান বিদেশী৷ আবার উল্টোটাও হয়েছে৷ এমনও নজির কম নয়, যেখানে পূর্বপুরুষ দেশের জন্যে সংগ্রাম করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, সেনা অফিসার আর তারও উত্তরপুরুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে যায় অমানবিক আইনের প্যাঁচে৷ সব খবর খবরে আসে না৷ কত জন আত্মহত্যা করল, কত সব হারিয়ে নিঃস্ব হ’ল, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হবার আশাকে বুকে নিয়ে৷ তার খবর কে রাখে! আত্মসুখ সর্বস্ব মানুষ নিজেরটা নিয়েই ব্যস্ত৷
অর্ধকোটির বেশী মানুষকে তথাকথিত লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ট্রাইবুনালের সামনে দাঁড় করিয়েছে৷ তার বিচার ভোট গ্রহণের আগে হবেও না৷
কিন্তু কঠোর সত্যটি হলো এই যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকির মুখে দাঁড়ান এবং ব্যবস্থাটি এর জবাবে বলে, ’আমরা বিষয়টি পরে খতিয়ে দেখব,’ তখন তা নিরপেক্ষতা নয়বরং তা হলো দায়িত্ব এড়ানো৷
ভোটগ্রহণের ঠিক একদিন আগে, মাত্র ১,৪৬৮ জনের নাম তালিকায় পুনর্বহাল করা হয়েছে অথচ লক্ষ লক্ষ আবেদন পড়ে আছে সেইসব ট্রাইব্যুনালের স্তূপে, যেগুলোর কার্যকারিতাই এখন প্রশ্ণবিদ্ধ৷
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বাগচি মন্তব্য করেছেন--- ’এই নির্বাচনতা আমরা বুঝি৷ কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম বহাল রাখার যে আরও মূল্যবান অধিকারটি রয়েছে, আমরা সেটিই খতিয়ে দেখব৷’
ভারতের সুপ্রিম কোর্টও স্বীকার করে যে, ’ভোটার তালিকায় নাম বহাল রাখার অধিকারটি’ অধিকতর মূল্যবানথচ ভোটের ঠিক আগে তারা এই অধিকার রক্ষায় কোনো তাৎক্ষণিক সুরক্ষাই প্রদান করে না৷ যে অধিকারটি ঠিক সেই মুহূর্তে প্রয়োগ করা যায় না, যখন তা সবচেয়ে বেশি জরুরিসেই অধিকারের আসলে অর্থ কী?
বিচার পেতে বিলম্ব হওয়া এক কথা৷ কিন্তু এক্ষেত্রে, সেই বিলম্বই কার্যত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করে দিচ্ছে৷
যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলো অধিকারের চেয়ে সময়সীমা বা সময়সূচিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়, তখন তারা আর নিরপেক্ষ বিচারকের ভূমিকায় থাকে না বরং তারা পরোক্ষভাবে অন্যায় বা ত্রুটির সহায়ক হয়ে ওঠে৷
যখন লক্ষ লক্ষ নাগরিক ভোটগ্রহণের ঠিক প্রাক্কালে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঝুঁকির মুখে পড়েন এবং এর জবাবে বলা হয়, ’আমরা বিষয়টি পরে খতিয়ে দেখব,’ তখন তা একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা দেয়: আর তা হলোধিকার প্রয়োগের সময়টি আসলে আলোচনার বা আপসের বিষয়৷
সুপ্রিম কোর্ট বারবারই ভোটাধিকারকে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে৷ অথচ ঠিক এমন সংকটময় মুহূর্তে, বিচারিক বিলম্ব কার্যত সেই অধিকারকেই দুর্বল ও অর্থহীন করে তোলে৷
ভোটাধিকার কেবল তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা ভোটগ্রহণের দিনই প্রয়োগ করা সম্ভব হয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তা পুনর্বহাল করে কোনো লাভ নেই৷ অন্যথায়, ন্যায়বিচারের স্থান দখল করে নেয় কেবলই যান্ত্রিক প্রক্রিয়া৷ সত্যিই কি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমরা!
- Log in to post comments