পরাধীন ভারতে দেশীয় পুঁজিপতি ও জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী পটেল গুজরাটি লবি সুভাষ চন্দ্রের বিরোধিতা করতে গিয়ে ভারতে বাঙালী বিদ্বেষের যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিল, আজ মোদী সাহু আরো দুই গুজরাটির হাতে পড়ে সেই বিষবৃক্ষ বিষাক্ত ফুলেফলে ভরে উঠেছে৷ হিংস্র দুঃসময়ের সম্মুখে বাঙালী৷
এই দুর্দিন হঠাৎ আসেনি, একদিনে আসেনি দীর্ঘ চক্রান্তের পরিণতিতে আজ রাজ্যে রাজ্যে বাঙালী নিধন, পশ্চিমবঙ্গেই আজ বাঙালীর জীবন বিপন্ন৷ চক্রান্তের শুরু ১৯৩৮ সালে ----- সুভাষচন্দ্র জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের এক সভায় দেশীয় পুঁজিপতিদের স্বরূপ উদঘাটন করেন৷ তিনি ওই সভায় বলেন --- দেশীয় পুঁজিপতিরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি জোগাচ্ছে৷ আমাদের ওদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ মানুষকে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে চমকে উঠেছিল দেশীয় পুঁজিপতিরা--- এ লোককে সরাতে না পারলে স্বাধীনতার অমৃত ভোগ করা যাবে না৷ চক্রান্তের শুরু সেই দিন থেকে৷ জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী পটেল গোষ্ঠী ও আরএসএস নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষক ছিল ওই দেশীয় পুঁজিপতিরা৷ ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র যখন গান্ধী মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে দ্বিতীয় বার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন তখনই জাতীয় কংগ্রেসের গণতন্ত্রের মুখোশধারী নেতৃত্বের ভদ্রবেশী বর্বরতার স্বরূপ উদঘাটিত হলো৷ গান্ধী পটেলদের নিম্নমানের নিকৃষ্ট রাজনীতি সেদিন দেশবাসী দেখেছিল যা আজ অনুসরণ করছে মোদী শাহ দুই গুজরাটি৷
সুভাষচন্দ্র কে কংগ্রেস থেকে সরাতে গান্ধী পটেল নেতৃত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল৷ দেশীয় পুঁজি পতিদের মদদপুষ্ট আরএসএস ও সেদিন সুভাষ চন্দ্রের বিরোধিতা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন করেছিল৷ কিন্তু দেশবাসীকে অবাক করেছিল কমিউনিস্টদের ভূমিকা৷ তারাও সেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালি করে অশ্লীল ভাষায় সুভাষ চন্দ্রের বিরোধিতা করেছিল৷ দেশীয় হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিপতি তাদের অর্থপুষ্ট পোষ্য রাজনৈতিক নেতাদের ( ডান বাম রাম সব পক্ষেই ছিল) ঘৃণ্য চক্রান্তের শিকার হয়ে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি পদ ত্যাগ করলেন৷ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে দেশ ছাড়লেন, জাপানে পৌঁছে আর এক বাংলাদেশের দেশনায়ক বিপ্লবী রাশবিহারী বসুর হাত থেকে আজাদ হিন্দ বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন সে অন্য এক ইতিহাস৷
স্বাধীনতার বেদিমূলে উৎসৃষ্ট জাতীয় কংগ্রেসের বিদ্বেষমূলক নিকৃষ্ট রাজনীতি দেখে ব্যথিত বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে এক ঐতিহাসিক পত্র লিখলেন ---- ’সুভাষচন্দ্র, বাঙালী কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি’৷ শব্দগুলো লক্ষ্য করুন---‘বাঙালি কবি’! ‘বাংলাদেশের দেশনায়ক’! ওই পত্রের ছত্রে ছত্রে তিনি লিখলেন ---- ‘নানা কারণে আত্মীয় ও পরের হাতে বাংলাদেশ যত কিছু সুযোগ থেকে বঞ্চিত, ভাগ্যের সেই বিড়ম্বনাকেই সে আপন পৌরুষের আকর্ষণে ভাগ্যের আশীর্বাদে পরিণত করে তুলবে--- এই চাই৷’
আরও লিখলেন --- ‘হিংস্র দুঃসময়ের পিঠের ওপর চড়েই বিভীষিকার পথ উত্তীর্ণ হতে হবে...... বাঙালি অদৃষ্ট কর্তৃক অপমানিত হয়ে মরবে না.... সাংঘাতিক মার খেয়েও বাঙালি মারের ওপর মাথা তুলবে৷’
পত্রের উপসংহারে লিখলেন ---‘বহুকাল পূর্বে একদিন আর এক সভায় আমি বাঙালি সমাজের অনাগত অধিনায়কের উদ্দেশ্যে বাণীদূত পাঠিয়েছিলুম৷ তার বহু বৎসর পরে আজ আর এক অবকাশে বাংলাদেশের অধীনেতাকে প্রত্যক্ষ বরণ করছি৷’
সুভাষচন্দ্র সেদিন বিশ্বকবির পত্রের মর্ম উপলব্ধি করতে পারেননি নাকি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্ণে বিভোর হয়ে উপলব্ধি করেননি সে রহস্য সুভাষচন্দ্রের অন্তর্রধান রহস্যের মতোই অজ্ঞাত থেকে যাবে৷ কিন্তু পরবর্তী বাঙালী নেতারা কেন সেই চিঠির গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন না! যার পরিণতিতে বাংলা ভাগ হলো৷ স্বাধীনতার পর মুহূর্ত থেকেই সুভাষ বিরোধিতাকে বাঙালী বিদ্বেষের রূপ দিল নেহেরু সরকার৷ বিধান রায়ের মতো মুখ্যমন্ত্রীও নেহেরুর দালালি করে চলে গেছে বাংলার স্বার্থ নিয়ে কথা বলেনি৷ তাই পাঞ্জাব সেদিন যেভাবে তার উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধান করেছিল নেহেরু সরকারের সাহায্য নিয়ে, বাঙলা তার ছিটে ফোঁটাও পায়নি৷ পশ্চিমবঙ্গের ডবল ইঞ্জিন সরকারের কোন মুখ্যমন্ত্রীও সেদিন বাঙলার প্রতি বঞ্চনা নিয়ে কোন কথা বলেনি৷ মুখ খুলে ছিলেন হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড ও আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক রঞ্জিত রায়৷ তার ধারাবাহিক প্রবন্ধ পুস্তক আকারে প্রকাশিত হলো --- ‘ধবংসের পথে পশ্চিমবঙ্গ’৷ যুগান্তর পত্রিকায় ধারাবাহিক লিখলেন সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য ---‘বাঙালি কোথায়’৷ রমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাধনা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন --‘ভারতের অন্যতম উপনিবেশ--- পশ্চিমবঙ্গ’৷ তাতেও চেতনা ফেরেনি বাঙলার রাজনৈতিক নেতাদের৷ নেহেরু রোপিত বাঙালী বিদ্বেষের সেই বিষবৃক্ষ আজ নরেনের হাতে পড়ে বিদ্বেষ বিষে ভরে উঠেছে৷ অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, বাঙালীর নৈতিক চরিত্রের অধোগতি--- এসবের মূলে আছে কেন্দ্রের বাঙালী বিদ্বেষী চক্রান্ত৷ সেই চক্রান্তই আজ রাজ্যে রাজ্যে হিংস্র রূপ ধারণ করেছে, ভারতে বাঙালী আজ সত্যিই হিংস্র দুঃসময়ের সম্মুখীন হয়েছে৷ দল-মত সম্প্রদায়ের বিভেদ ভুলে মারের ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবার এটাই উপযুক্ত সময়---- আজ আকাশ বাতাস মুখরিত করে আজানের সুর ধবনিত হোক মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে, মন্দিরে মন্দিরে বাজতে থাকুক শঙ্খ বাদ্য, কিন্তু বাঙলার পথে ঘাটে বাঙলার হাটে বাজারে, বাঙলার মাঠে ময়দানে আমাদের একটি মাত্র পরিচয় হোক--- আমরা বাঙালী আমরা বাঙালী আমরা বাঙালী৷
- Log in to post comments