মার্কসীয় দর্শনে শোষণকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করা হয়েছে৷ অর্থাৎ পুঁজিপতিরা তাদের উৎপাদিত পণ্য থেকে যে মুনাফা অর্থাৎ লভ্যাংশ পায় সেটাই শোষণ৷ কারণ ওই মুনাফায় শ্রমিকেরও শ্রম আছে৷ অথচ শ্রমিক তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়৷ মার্কস তাই শোষণের স্বরূপ বলতে শুধু আর্থিক শোষণকেই দেখেছেন৷ কিন্তু মানুষ শুধু উদর সর্বস্ব জীব নয়৷ তার মন আছে, আত্মা আছে৷ মননশীল জীব বলেই মানুষকে মানুষ বলা হয়৷ সমাজে শোষণের বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ বিদ্রোহ করে তার মননশীলতায় বিবেক জেগে উঠলে৷ তাই জাগতিক সম্পদ শোষণ করতে হলে মানুষের মননশীলতাকে স্তব্ধ করে দিতে হয়৷ কাল মার্কসের যুগ পার হয়ে আজকের শ্রমিক কর্ষক অনেক বেশি সচেতন তাই আজ শোষক তার শোষণ শুধু ভৌতিক সম্পদে সীমাবদ্ধ রাখেনি, মানুষের মানসিক আত্মিক বিকাশ স্তব্ধ করে তার মানসিকতাকে হীনমন্যতায় পর্যবসিত করে আর্থিক সম্পদের শোষণের পথ প্রশস্ত করে৷
তাই আজ শোষণের প্রকৃত সংজ্ঞা পাওয়া যায় প্রাউট দর্শনে৷ প্রাউট প্রবক্তা শোষণের সংজ্ঞা সম্পর্কে বলেছেন ---‘‘একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত তথাকার জনগোষ্ঠীর দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক বিকাশকে স্তম্ভিত করে,ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শ্রম ও মানসিক সম্পদের অবাধ লুন্ঠনই শোষণ৷’’
আজ পশ্চিমবাঙলায় যে সামাজিক অপরাধ ঘটছে---সমাজ থেকে এই অপরাধ দুর করা কি কয়েকটি এনকাউন্টারে অপরাধীকে খুন করলেই সম্ভব হবে৷ মনে রাখতে হবে বারুইপুর এনকাউন্টারের পরেও রাজ্যে বেশ কয়েকটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে গেল কয়েকদিনের মধ্যেই৷ এনকাউন্টারে একটা অপরাধীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ায় সমাজ এই অপরাধ থেকে মুক্ত হয় না, বরং অনেক সময় প্রকৃত অপরাধী জনচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়৷
এই ধরণের সামাজিক অপরাধের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে প্রাউট প্রবক্তার দেওয়া শোষণের সংজ্ঞার বিস্তারিত বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন৷ অর্থাৎ ফ্যাসিষ্ট শোষক ভালো করেই জানে তার শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্র যুবসমাজ৷ বিশেষ করে বাঙলার ছাত্রযুব সমাজের রক্তে সেই বিদ্রোহের আগুণ আছে৷ তাই দেশীয় শোষকরা শোষণের পথ থেকে সমস্ত প্রকার বাধা অপসারণ করতে স্বাধীনতার ৭৮ বছরে অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে ভারতবর্ষের সব থেকে উন্নত জনগোষ্ঠীকে ধবংসের পথে ঠেলে দিয়েছে৷
রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সবে দুমাস অতিক্রান্ত৷ ইতিমধ্যে রাজ্যে বেশ কয়েকটি নৃশংস নারী নির্যাতন ঘটে গেছে৷ রাজনৈতিক উৎশৃঙ্খলাতার কথা বাদই দিলাম৷ নতুন সরকারের রাজ্যের নেতা-নেত্রীরা ও দিল্লি থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারী নিরাপত্তা নিশ্চিততা দিয়েছিলেন৷ কিন্তু তা কতটা অসার ছিল দু মাসেই বাঙালী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷
এই প্রসঙ্গে আমরা বাঙালী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়ন্ত দাশ বলেন---ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলে যাবার সময় কংগ্রেসের বকলমে দেশীয় পুঁজিপতিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায়৷ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাঙলা দেশীয় হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী শোষকের কবলে পড়ে৷ সেই শোষক আজ ফ্যাসিষ্টরূপ ধারণ করেছে৷ রাজনৈতিক দলগুলিরও ওই ফ্যাসিষ্ট শোষকের অঙ্গুলী হেলনে চলে৷ তাই জনগণের এই শোষনের হাত থেকে মুক্তির আশা নেই৷ একমাত্র প্রাউটিষ্টদেরই দায়িত্ব নিতে হবে বাঙলাকে শোষণ মুক্ত করা৷
শ্রী দাশ বলেন---আজ যে উচ্ছৃঙ্খলতা, যে অসংযমী আচরণ প্রতিনিয়ত সমাজের সুচিতা নষ্ট করছে-এর দায় পুঁজিপতি শোষক ও রাজনৈতিক দলগুলিকে নিতেই হবে৷ কারণ এদের মদতেই বাঙলার উন্নত ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিকে ধবংস করে চটুল রসের নিম্নমানের হিন্দি ভাষা চলচিত্র সঙ্গীতের মাধ্যমে যুব সমাজকে বিপথগামী করে বাঙলার সম্পদ লুটে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমী শোষকরা৷ শাসক পরিবর্তন হলেই শোষণ নির্যাতন ব্যভিচার বন্ধ হবে না কারণ শোষকের ইলেক্টোরাল বন্ড এদের পার্টি তহবিলের উৎস৷ এই শাসক শোষকের শোষণে সহায়ক, শোষিতের বন্ধু কেউ নয়৷ এই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমরা বাঙালীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৃহত্তর সমাজ আন্দোলনে নামতে হবে প্রতিটি বাঙালীকে৷
- Log in to post comments