ভূতের মুখে রাম নাম---এই বাংলা প্রবাদটি ব্যবহার হয় সাধারণত যখন কোন অসৎ বা পাপাচারী ব্যষ্টির মুখ থেকে সৎ বা ভালো উপদেশের কথা শোনা যায়৷ কোন ব্যষ্টি যখন তার চরিত্রের বিপরীতধর্মী কথাবার্তা বলেন তখন লোকে তার সম্পর্কে এই বাংলা প্রবাদটি বলে থাকেন৷ অবশ্য আজকাল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মানুষের মুখে বিপরীত ধর্মী কথা শুনেও এই প্রবাদটি তার ও তাদের সম্পর্কে ব্যবহার করে না৷ কারণ রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র বদলানোর সঙ্গে আজকাল বহুরূপী সরীসৃপ প্রাণীটির রং বদলানোর মিল অনেক বেশি৷ কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার হাত বদলানোর কয়েকদিন পরেই বঙ্গ রাজনীতির ওই বহুরূপী সরীসৃপের ন্যায় চরিত্রগুলির নির্লজ্জ আত্মপ্রকাশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রত্যক্ষ করেন ও এখনো তাদের আচার-আচরণ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন৷
রাজনৈতিক নেতারা কতখানি নির্লজ্জ বেহায়া হতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত তৃণমূল দলের কিছু সংসদ বিধায়ক ও কেন্দ্রের শাসকদলের নেতারাও৷ নির্বাচনী ফলপ্রকাশের কয়েক ঘন্টা আগেও যারা দেশের প্রধানমন্ত্রীর চরম সমালোচক ছিলেন ক্ষমতার হাত বদলের কয়েক দিন পরেই তারা সেই প্রধানমন্ত্রীর পরম ভক্ত হয়ে গেলেন৷ প্রধানমন্ত্রীও ভাবে গদগদ হয়ে ওই বিপদ বহুরূপী সরীসৃপদের সঙ্গে প্রাতরাশে বসে গেলেন৷ যার আঁচল ধরে বিধানসভা বা সংসদে পৌঁছানো তার চরিত্র বুঝতে সময় লাগলো ক্ষমতাচ্যুত হতে৷ সত্যিই ওই বহুরূপী সরীসৃপটির যদি মনন করার ক্ষমতা থাকতো তাহলে দ্বিপদ জীবের এই পদস্থলন দেখে লজ্জায় নিজের স্বভাব পরিবর্তন করে ফেলতো৷ ডালে ডালে পাতায় পাতায় রং বদলানোর স্বভাবটি দ্বিপদ রাজনৈতিক জীবের প্রজাতিগত স্বভাব হয়ে থাকত৷
সম্প্রতি নিউইয়র্ক শহরে আর.এস.এস প্রধান মোহন ভাগবতের ভাষণ শুণে--- ভূতের মুখে রাম নাম প্রবাদটি মনে পড়ে গেল৷
নিউইয়র্ক শহরে মোহন ভাগবতের বক্তব্য তুলে ধরার আগে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি নেতাদের বিভিন্ন সময়ের কিছু বক্তব্য তুলে ধরলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে৷ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন লুঙ্গি পরা দেখে চেনা যায়৷ আর এক বিজেপি নেতা স্পষ্টই বলেছেন মুসলিমদের এদেশে থাকা উচিত নয়৷ ওরাই জনসংখ্যার ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরি করেছে৷ আর এক নেতার উক্তি ছিল সমস্ত মুসলিমদের যে একেবারে পাকিস্তানে পাঠানো হয়নি সেটা আমাদের পূর্বপুরুষদের বড় ভুল৷ এই কথাগুলো কোনটাই সংঘের আদর্শ বিরোধী নয় বরং হিন্দু রাষ্ট্র করতে জনমত তৈরির প্রচেষ্টা৷ তাই সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত এইসব কথার কোন প্রতিবাদ করেননি৷ কিন্তু নিউইয়র্ক শহরে দাঁড়িয়ে তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী কথা বলেছেন৷ তার কথা---বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের মূল মন্ত্র--- এই চরিত্র ভারতের ডিএনএতে আছে৷ বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা ও গ্রহণ করতে হবে৷ তিনি এমনও বললেন---যদি কোন হিন্দু বলে ভারত মুসলিমদের থাকা উচিত নয়, তিনি আর যাই হোন হিন্দু নন৷ একজন হিন্দুকে যত মত তত পথ মন্ত্রকে বিশ্বাস করতেই হবে৷ কথাগুলো শুনে মনে হতে পারে, রামায়ণের সেই বিখ্যাত সংলাপ৷ ‘একী কথা শুনি আজি মন্থরার মুখে’৷ অথবা একটি লোক সঙ্গীতের সেই লাইনটি ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে৷’
নিউইয়র্ক শহরে দাঁড়িয়ে সংঘপ্রধানের এই বক্তব্য এখন শাসক বিরোধী সব পক্ষের চর্চার বিষয় হয়ে গেছে৷ তবে পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে পড়েই হোক অথবা ক্ষমতার টানাপোড়েনে সংঘ বিজেপির মধ্যে দূরত্ব তৈরীর কারণেই হোক ভারতীয় রাজনীতিতে বহুরূপী সরীসৃপটি এখন প্রতীক হয়ে গেছে৷
শতবর্ষ পার হওয়া আরএসএস দলটির রাজনৈতিক লক্ষ্য ভারতবর্ষকে হিন্দুরাষ্ট্ররূপে পরিচিত করা৷ এটাই দলটির আদর্শ৷ তাদের সোজা কথা দেশটি ভাগ হয়েছে দ্বিজাতিতত্ত্বের দোহাই দিয়ে হিন্দু মুসলিম রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে৷ যে সংঘর্ষের ক্ষতের জ্বালায় বাঙালী আজও জ্বলছে৷ তবু বাঙালীর বোধোদয় হলো না৷ যে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতা বাঙালীকে নিজভূমে পরবাসী করে দিয়েছে, স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও যাকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তবুও এই বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হবার কোন প্রয়াস তার মধ্যে নেই৷
তবে এখানে আলোচ্য বিষয় বাঙালীর রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক ক্ষত নিয়ে নয়৷ ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলা যাদের আদর্শগত ভিত্তি, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও যারা প্রকাশ্যে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষ ছড়ায়, সেই আরএসএসের প্রধান সংঘ পরিচালক মোহন ভাগবত গত ২৯শে আগস্ট আমেরিকার মাটিতে নিউইয়র্ক শহরে অনাবাসী ভারতীয়দের সামনে যা বললেন তা শুনে মনে হতে পারে আরএসএস তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথবা দিক পরিবর্তন করেছে৷ তবে এই দুটোর কোনটাই নয়৷ চাপের মুখে পড়ে হয়তো তাকে এরকমটা বলতে হয়েছে৷ যে শহরে তিনি সংঘের মতাদর্শ তুলে ধরতে গিয়েছিলেন সেই শহরের মেয়র ভারতীয় বংশদ্ভুত জোহরান মামদানি৷ তিনি মন ভাগবতের অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছেন৷ তাছাড়া বহু প্রবাসী ভারতীয় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন৷ পরিস্থিতির চাপে পড়ে কি মোহন ভাগবত নিজের রং সাময়িকভাবে পরিবর্তন করলেন যখন ভারতীয় রাজনীতিতে বহুরূপী সরীসৃপ এক প্রতীক৷
- Log in to post comments