পশ্চিমবঙ্গ দখলে উন্মত্ত কেন্দ্রীয় শাসকদল দানবীয় স্বৈরাচারের পথ ধরেছে৷ গণতন্ত্রের বেদীতে এই দানবীয় স্বৈরাচারের শুরু ২০১৪ সালের মার্চ মাসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ৷ তারও আগে কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তন করে কমিশনার নিয়োগের অধিকার প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে তুলে নেয়৷ নিরপেক্ষ প্রশাসন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ৷ কিন্তু মোদি সরকার শাসন ব্যবস্থায় দলীয় প্রভাব বিস্তার করতে একের পর এক আইন পরিবর্তন করছে৷ মোদি সরকার ভুলে যাচ্ছে দানবীয় স্বৈরাচারের শেষ পরিণতি খুবই ভয়ঙ্কর৷ বাঙলা দখল করতে এসে এস.আই.আরের নামে প্রায় এক কোটি বাঙালীকে বাতিল করেছে৷ পুরো প্রশাসনকে বদলে দিয়েছে৷ অবাক করার বিষয় প্রতিবাদে এখনও একটা মানুষকে পথে দেখলাম না৷ আসলে বাঙলার রাজনৈতিক দলগুলি দলীয় সংঙ্কীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে সমগ্র বাঙালী জনগোষ্ঠীর স্বার্থের কথা এখনও ভাবেনি৷ হয়তো রাজনীতির হিসাব কষতে ব্যস্ত৷
এই দানবীয় স্বৈরাচারের পিছনে আছে দেশীয় পুঁজিপতিগোষ্ঠীর মদত৷ পুঁজিবাদ ও স্বৈরাচার একে অপরের পরিপূরক৷ একজন না থাকলে আর একজন থাকবে না৷ তাই শুধু বাঙালী বিদ্বেষী বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেই হবে না পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে৷ সমৃদ্ধশালী বাঙলাকে লুন্ঠনের লক্ষ্য দেশী-বিদেশী সব পুঁজিপতির৷ সামাজিক, অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বৈরাচারকে শেষ করতে হবে৷ এই আন্দোলনে তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি সামিল হবে না৷ কারণ এই রাজনৈতিক দলগুলিও পুঁজিবাদের পুঁজির উপর নির্ভরশীল৷
হাজার হাজার ত্যাগব্রতী মানুষের জীবনপণ আন্দোলন, কারাবাস, দীপান্তর ও ফাঁসী বরণের পর আমরা এই আধা স্বাধীনতা লাভ করেছি৷ আধা স্বাধীনতা এই জন্যে বললুম যে, ব্রিটিশ শাসকের শাসন থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি৷ কিন্তু দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের শোষণ থেকে মুক্তি পাইনি৷ মুক্তি পাওয়ার কথা তো দূর অস্ত্ আমরা ওই পুঁজিপতিদের মোহ বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছি৷
শুধু আমাদের দেশ কেন---আজ গোটা দুনিয়ার এই হাল! এই পুঁজিপতিদের দেশ আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানী প্রভৃতি দেশেও বেকার সমস্যা চরম আকার নিচ্ছে৷ ধনবৈষম্য চরম রূপ নিচ্ছে৷ আর তার ফলে পুঁজিপতিরা অর্থবলে সমাজের কেবল অর্থনীতি নয়, সমাজ-সংস্কৃতি- রাজনীতি সবকিছুকে কবলিত করে তাদের শোষণের জালকে এমনভাবে বিছিয়ে দিচ্ছে যে এর থেকে বাইরে বেরুনো এখন খুব কঠিন হয়ে উঠেছে৷
আর এইভাবে তারা গোটা সমাজকে কুক্ষিগত করে’ কলুষিত করছে৷ মানুষের উন্নত সংস্কৃতি, সভ্যতা, ধর্মচেতনা সব কিছুকেই ধবংস করে চলেছে৷ এখন পুঁজিবাদীদের শোষণের এই অক্টোপাশ থেকে মানব জাতিকে মুক্ত হতে হবে৷ নাহলে মানব সংস্কৃতি ও সভ্যতা ধবংস হয়ে যাবে৷ ধনবৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকার সমস্যাও সারা পৃথিবী জুড়ে চরমভাবে বেড়ে চলেছে এই ধনতান্ত্রিক অবস্থার জন্যে৷ এই অবস্থায় কিছু মানুষ পুঁজির সুবিশাল পাহাড় রচনা করছে৷ চরম বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপব্যবহার করে সমাজে অসংস্কৃতির ‘সুনামী’ বইয়ে দিচ্ছে৷
এককথায় এই পুঁজিবাদী শোষণের অক্টোপাশ থেকে সমাজকে মুক্তি পেতেই হবে৷ কিন্তু কী করে? পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদীরা মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে৷ শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চরণে আত্মসমর্পণ করেছে৷
এখন উপায় কী? উপায় একমাত্র ‘প্রাউট’---প্রগতি- শীল উপযোগ তত্ত্ব৷ একথা আমরা বহুবার নানান্ যুক্তি সহকারে বুঝিয়েছি৷ পুঁজিবাদ ও মার্কসবাদ দুই-ই অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণের ওপর আধারিত৷ ধনতন্ত্রে শিল্পপতিরা --- ব্যবসায়ীরা অর্থের কেন্দ্রীকণরণ ঘটায়, আর মার্কসবাদ তো আসলে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ৷ জনগণের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসে না৷
প্রাউটের পথে কীভাবে জনগণের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসবে? তার উত্তর--- প্রাউট নির্দেশিত সমাজ আন্দোলনের পথ ধরেই জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আসবে৷ প্রাউট বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে অর্থাৎ অথনৈতিক সম্ভাবনা, সম-অর্থনৈতিক সমস্যা, জনগোষ্ঠীগত (এথ্নিক) বৈশিষ্ট্য, সাধারণ সাংবেদনিক উত্তরাধিকার (সেণ্টিমেণ্টাল লিগ্যাসী) ও একই ধরণের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে স্বয়ং সম্পূর্ণ সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইয়ূনিট) গড়ে তোলার নীতিতে বিশ্বাসী৷ আর এই সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সর্বাত্মকভাবে শোষণমুক্ত করার আন্দোলন করতে হবে৷ প্রাউটের পরিভাষায় এটাই হ’ল যথার্থ ‘সমাজ আন্দেলন’৷ এই সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য হ’ল সংশ্লিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক অঞ্চলের ১০০ শতাংশ স্থানীয় মানুষের কর্ম সংস্থানের গ্যারাণ্টি প্রদান৷ আর তা করতে গেলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ স্থানীয় মানুষের হাতেই থাকবে অর্থনৈতিক ক্ষমতা, বহিরাগত পুঁজিপতিদের হাতে নয়৷ ব্লক ভিত্তিক পরিকল্পনা, সমবায়ের আদর্শে কৃষিভিত্তিক ও কৃষিসহায়ক শিল্পের দাবীতে অর্থনৈতিক শোষণমুক্তির আন্দোলনই হবে এর মাধ্যম৷ প্রাউটিষ্ট সর্বসমাজ সমিতি এই অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের নীতি নিয়ে ভারতবর্ষের সর্বত্র অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলছে৷ তাদের এই সর্বাত্মক শোষণমুক্তির আন্দোলনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য, নতুনত্ব তথা এর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবী, কর্ষক, শ্রমিক ছাত্র-যুব তথা মহিলাদের বিশেষভাবে অবহিত হতে হবে৷ সচরাচর অন্যান্য যে সব আন্দোলন আমরা দেখতে অভ্যস্ত তা থেকে এই আন্দোলন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র৷ কারণ এর পেছনে রয়েে’ছ আঞ্চলিক শ্রীবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বিশ্বৈকতাবাদের প্রতিষ্ঠার এক নোতুন আদর্শ৷9
- Log in to post comments