সেই কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আজ থেকে একান্ন বছর আগে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন, দেশপ্রিয় জয়প্রকাশ নারায়ণ কে সেই জুন মাসের শেষের দিকে বন্দী করেন৷ ২৬ শে জুন সারা ভারত যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ নিরীহ নাগরিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করে দেশকে বন্দীশালায় পরিণত করে৷ ভারতের সমাজ সেবামূলক সংঘটন আধ্যাত্মিক ও সমাজসেবামূলক সংস্থা আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘকে ও অন্য কয়েকটি সংঘটনকে নিষিদ্ধ করা হয়৷ তারা বন্দী দশায় প্রায় দীর্ঘ ২৩ মাস নির্যাতিত ও শোষিত হন কারাগারে৷ তাদের অনেকেই নিম্ন মধ্যবিত্ত স্কুল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষিকা আর সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ ও তাদের পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজন চরমভাবে অসহায় হয়ে পড়েন কারণ তাদের বেতন বন্ধ হয়, আর কিছু কিছু বন্দী বেসরকারি সমাজসেবক ও কর্মী ডাক্তার ও নাগরিক ছিলেন তাদের কিছু কিছু মাসিক ভাতা দেওয়া হতো৷ কিন্তু অনেক অসহায় পরিবার একেবারে ধবংস হয় মিথ্যা মিশা ও.ডি.আই আর কঠোর আইনে৷ চরম সেই স্বেচ্ছাচারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা নির্বাচনে হেরে যান বিশেষ করে সেই সব বন্দী নাগরিকগণ যারা ছিলেন, তারা বিরোধী দলের প্রার্থীদের সমর্থন করেন ভোট দিয়ে৷
বর্তমানে দেখা গেল মোদীজির সরকার বিজেপি দলের প্রধানমন্ত্রী সেই সময় যারা জরুরি অবস্থায় বিরোধিতা করেন তাদের সেই ৩২৫ জনকে লোকতন্ত্র সেনানি হিসেবে সংবর্ধনা ও পশ্চিমবাংলার রাজ্য সরকার মাসিক ১০০০০ টাকা করে সম্মান বরাদ্দ করেন৷ যারা কারাগারে বন্দি ছিলেন লক্ষ লক্ষ নাগরিক তাদের অনেকেই আজ নেই, কিন্তু হয়তো কিছু কিছু মানুষ আজও সেই অতীত বয়স্ক হয়ে বেঁচে আছেন, আর যারা নেই, তাদের পরিবার তো আছে৷ তাদের কথা কিন্তু মোদি সরকার একবার ভাবলেনই না৷ তারই মুখ্যমন্ত্রীও সেটা ভালোভাবে জানেন বাঙালী হিসাবে এটা কেমন হলো নিরপেক্ষ বিচার৷
সেদিন লড়াইতো শুধু ৩২৫ জন করেনি৷ লড়াই সেদিন করেছিল ইন্দিরার কংগ্রেস ছাড়া প্রায় সব দলই৷ সেইসব অনেক দলই আজ বিজেপির সাম্প্রদায়ীক বিভাজনের রাজনীতি পছন্দ করেনি৷ তাই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী তাদের কথা সম্ভব করেনি৷
প্রায় ২৩ মাস পর ৭৮ সালের প্রথম দিকে ইন্দিরা নির্বাচনে হেরে গিয়ে বন্দীশালা থেকে বন্দীদের মুক্তি দেন এই সময় যারা জয়ী হন তারা কেন্দ্রের জনতা দলও, যারা সেই বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসের অন্য দলের মিলনে তৈরী হয়, যার মধ্যে ছিল জনসংঘও৷ সেই দল বেশিদিন কেন্দ্রে ছিলেন না এই সময় ওই জনতা দল ভেঙেই ভারতীয় জনতা দল হয়৷ তাই আজকের যারা ভারতীয় জনতা দল তারা বিশেষ করে এই মুখ্যমন্ত্রী বর্তমানে পশ্চিমবাংলায় শাসনে তিনি সেই আন্দোলনের শরিক থাকেননি অনেক পরে তৃণমূলে আসেন ও তৃণমূল একজন নেতাকর্মী হন ও মমতা ব্যানার্জীর শাসনে একজন মন্ত্রী ছিলেন৷ তিনি সেই দল তৃণমূলী হয়ে আজকের বিজেপির এনডিএ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়ে৷ তাই সেদিনের আন্দোলন দেখেনি৷ তবে তিনি হয়তো কিছুটা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দলবদলের হিড়িক দেখেছেন৷ তাই তিনিও সেই হিড়িকের একজন মুখ্যমন্ত্রী৷ তাই মনে হয় নিপীড়িত অত্যাচারিত মানুষদের বড় ত্যাগ ও নিষ্ঠা সেটার মূল্যায়ন তিনি করতে পারেনি৷ তবে অতি বৃদ্ধ তাদের হয়তো টাকার প্রয়োজন আজ নেই৷
মনে পড়ে পশ্চিম বাঙলার বামফ্রন্টের শাসনে জরুরী অবস্থাকালীন খুব অত্যাচার হয় বন্দীদের উপর, তার জন্য একটি কমিশন গঠিত হয়৷ সেখানে কিছু কিছু অত্যাচারিত বন্দী আবেদন করেন বিচার হয়৷ তাতে বেশ কিছু গোয়েন্দা বিভাগের কিছু অফিসারের চাকরিতে ডিমোশন হয়৷ তাতে এটা বোঝা যায় না যে তাতে বন্দীদের সকলের যত প্রযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা পেয়েছে ন্যায় ও সত্যের দরবারে৷ এটা গণতন্ত্রের নাগরিকদের চরম অসম্মান৷ তাই আজও সেই কংগ্রেস দল সারা ভারত যুক্ত রাষ্ট্র সঠিক জন সমর্থন থেকে বঞ্চিত৷
10
ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান বাঙালীর স্বাধীনতার চেতনার অমর অগ্ণিশিখা...‘আমরা বাঙালী’র উদ্যোগে শহীদ স্মরণসভা
নিজস্ব সংবাদদাতা ঃ গত ১১ আগস্ট ২০২৬ অগ্ণিযুগের অমর বিপ্লবী, বীর শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর ১১৮তম আত্মবলিদান দিবস উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন প্রান্তে ‘আমরা বাঙালী’র পক্ষ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি সভার আয়োজন করা হয়৷ কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার হাজরা মোড়ে৷
সভায় বক্তারা বলেন, ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়৷ মাত্র ১৮ বছরের এক কিশোর কীভাবে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আত্মত্যাগ, সাহস ও দেশপ্রেমের এক অনন্য আদর্শ হয়ে ওঠে৷ ক্ষুদিরামের সেই অগ্ণিমন্ত্র পরবর্তী সময়ে কিশোর সুভাষচন্দ্র বসুর মননেও গভীর রেখাপাত করেছিল এবং তাঁকে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিলএই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের উপর বক্তারা বিশেষভাবে আলোকপাত করেন৷
সভা থেকে সম্প্রতি দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের কুরুচিকর ও অবমাননাকর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়৷ বক্তারা বলেন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কেবল বাঙলার নন, তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নায়ক৷ তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও আত্মত্যাগকে অবমাননা করার যে কোনও অপচেষ্টা বাঙালীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতি অবমাননা৷
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, হিন্দী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও অ-রাজবংশীয় বাঙালীদের মধ্যে কৃত্রিম বিভেদ সৃষ্টি করে বাঙালী জাতিসত্তাকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত৷ তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক বরেন্দ্রভূমির উর্বর কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অবাঙালী পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার চেষ্টা চলছে৷ ‘আমরা বাঙালী’র পক্ষ থেকে রাজবংশী সমাজের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলা হয়, এই বিভেদমূলক ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেদের বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে অক্ষুণ্ণ্ রাখতে হবে৷ বক্তারা বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়ছয়টি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাঙালী জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাজবংশী সমাজ৷ রাজবংশীরা কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয় তাঁরা বাঙালী সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷
এদিন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে এবং রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে ‘আমরা বাঙালী’র পক্ষ থেকে শিলিগুড়ি থানায় অভিযোগও দায়ের করা হয়৷
কলকাতার হাজরা মোড়ে কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত শহীদ স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন দলের কেন্দ্রীয় সচিব জ্যোতিবিকাশ সিনহা, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সচিব তপোময় বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়ন্ত দাশ, বাঙালী যুব সমাজের সদস্য অধ্যাপক বিপ্লব রায়, বাঙালী মহিলা সমাজের নেত্রী গোপা শীল ও প্রণতি পাল, কলকাতা জেলা সচিব সুদীপ দাশগুপ্ত, সুশীল জানা, শুভজিৎ পাল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ৷ সভাটি পরিচালনা করেন বিশ্বজিৎ বণিক৷
একই সঙ্গে অসমের শিলচরে ‘আমরা বাঙালী’র অসম রাজ্য সচিব সাধন পুরকায়স্থ, আগরতলায় ত্রিপুরা রাজ্য সচিব গৌরাঙ্গ রুদ্রপাল এবং ঝাড়খণ্ডে ‘আমরা বাঙালী’র কেন্দ্রীয় সহসচিব সুশীল কুমার মাহাত, অঙ্গদ মাহাতো ও রেখা মাহাতো-র নেতৃত্বে বীর শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর ১১৮তম আত্মবলিদান দিবস উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি সভার আয়োজন করা হয়৷
অসম রাজ্য সচিব সাধন পুরকায়স্থ বলেন, ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান শুধুমাত্র অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়এটি অন্যায়, শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ ও জাতিসত্তার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের চিরন্তন প্রেরণা৷ তাঁর আত্মত্যাগের অগ্ণিশিখাকে সামনে রেখে বাঙালীর ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়৷
‘বন্দেমাতরম’-এর অগ্ণিমন্ত্রে যে কিশোর হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, তাঁর আত্মবলিদানের উত্তরাধিকার বাঙালী সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা যুগিয়ে যাবেসভা থেকে এই অঙ্গীকারই ব্যক্ত করা হয়৷
- Log in to post comments