একসময় রাজনীতি শব্দটার বুকে একটা পবিত্র নদী বইত৷ যেমন ভোরের জল ছুঁয়ে থাকা কুয়াশার নরম ঘ্রাণ, কিংবা দূর গাঁয়ের স্কুলঘরে, বিবর্ণ মানচিত্রের পাশে, দাঁড়িয়ে থাকা এক আদর্শবাদী শিক্ষকের শান্ত চোখের চশমা৷
মানুষ তখন মিছিলে আসত কিছু নিঃস্বার্থ স্বপ্ণ নিয়ে দেশ বদলাবে, মানুষের কান্না কমবে, অন্যায়ের বুকে আছড়ে পড়বে প্রতিবাদ, এইসব বিশ্বাস বুকের গভীরতম প্রকোষ্ঠে জ্বলত জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো৷
ক্ষমতা তখনও ছিল, অর্থের মোহও ছিল, ছিল কিছু ধূর্ত শৃগালওকিন্তু তারা বুক ফুলিয়ে রাজপথে হাঁটত না, লুকিয়ে থাকত ক্ষমতার পিছনের দিকে অন্ধকার করিডোরে, নেপথ্য কানাগলিতে৷ তাদের চোখে আলো কম ছিল, চাতুর্যের হিসেব ছিল বেশি৷
তারপর একদিন শব্দের মায়াজাল বিছানো হলো৷ উত্তেজিত স্লোগান, চটকদার বুলি আর বিপ্লবের রঙিন পোস্টার, যেন এক মরীচিকার উৎসব! হাজারো তরুণ এসে দাঁড়ালো সেই মোহময় মিছিলে, কিন্তু তারা আদর্শকে সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেয়নি৷
তারা কোলাহলকে বিবেক ভেবে ভুল করেছিল, নেতার চড়া কণ্ঠস্বরকে ভেবেছিল মুক্তির গান৷ আর ঠিক তখনই, অলক্ষ্যে, রাজনীতির ধমনীতে ঢুকে পড়লো এক বিষাক্ত লোহিতকণিকা৷ টিকে থাকার জন্য এবার প্রয়োজন হলো পেশীশক্তি, প্রয়োজন হলো ভয়ের রাজত্ব আর নিস্তব্ধ রাতে ক্ষুধার্ত মোটরবাইকের গর্জন৷
যারা একদিন নেতাদের পেছনে থেকে শুধু পতাকা বহন করত, তারাই একদিন ক্ষমতার অলিন্দে সামনে এসে দাঁড়ালো৷ লুম্পেনরা তো আর রাজনীতির দরজা ভেঙে ঢোকেনি, স্বার্থের প্রয়োজনে তাদের লাল গালিচা পেতে ডেকে আনা হয়েছিল৷ তারপর একদিন সকালে জেগে উঠে দেখা গেল, তারাই এখন নিয়ন্তা, তারাই এখন শাসন, তারাই এখন রাজনীতি! সমাজ তখন আরও একধাপ পিছিয়ে গেল অন্ধকারে৷
মানুষের হৃদয়ে আজ হতাশা আর ক্লান্তি, হাতে তাদের শূন্য থলি, আর চোখে ক্রমশ নিভে আসা প্রতিবাদের আগুন৷
অধিকারের কথা বলতে গেলেই তেড়ে আসে পোষা ক্রোধ, প্রশাসনের শক্ত লাঠি আর পরিচিত কিছু মুখের চেনা হিংস্র হাসি৷ এমনকি গণতন্ত্রের চারটে স্তম্ভও আজ অদ্ভুত এক আনুগত্যে আর প্রাপ্তির মোহে নতজানু, কখনো বা তারা নীরব দর্শক, কখনো বা অগ্ণিকুণ্ডে ঘৃতাহুতি দিতে ব্যস্ত৷ মানুষ পরিশেষে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে৷ শোষণও একসময় প্রাত্যহিক অভ্যাসের খেরোখাতায় নাম লেখায়৷ সবকিছু মেনে নিতে নিতে, মানিয়ে নিতে নিতে, সে ভুলেই যায় তার প্রাপ্য কী ছিল, তার অধিকারের আকাশ কতটা চওড়া ছিল, সে আসলে মেরুদণ্ড সোজা রাখা কতখানি স্বাধীন মানুষ ছিল!
তবু... মহাকালের নিয়ম বড় অদ্ভুত, বড় অলঙ্ঘ্য৷ নদী যেমন এক ঘাটে চিরকাল স্থবির হয়ে থাকে না, ঋতুও যেমন একই জানালায় সারাবছর বুক পেতে বসে থাকে না, তেমনি সময়ের সে ঘূর্ণায়মান চাকা আবার ঘুরবেই৷
চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ৷
আজ যারা ভাবছে সবটুকু গিলে খেয়েছে, নীল আকাশের বুকেও যারা বসিয়েছে চতুর নজরদারি, তারাও বোঝে, মাটির অতল গভীরে নিঃশব্দে শিকড় ছড়াচ্ছে মহাবৃক্ষ৷ এই নির্বাক, শোষিত মানুষগুলো একদিন নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাবেই৷ চরম ধৈর্যের মধ্যেও একটা প্রলয়ঙ্করী গোপন শক্তি লুকিয়ে থাকে৷ সেখান থেকে মুক্তির প্রস্তুতি কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে, রাজপথ কাঁপিয়ে হয় না সবচেয়ে বড় প্রস্তুতিটা হয় খুব নিভৃতে, খুব নিঃশব্দে, ঠিক যেমন গভীর রাতে, সবার অলক্ষ্যে, রিক্ত গাছের ডালে নতুন পাতার জন্ম হয়৷
শুধু ওরা যেন টের না পায়, ওরা যেন কিচ্ছু জানতে না পারে! কারণ, মহাজাগরণের আদি শব্দটা প্রথমে কেউ শুনতে পায় না৷ শুধু আচমকা এক চিলতে বাতাস বদলে যায়, ভোরের আকাশের রঙে লাগে এক নতুন আলোর আভাস৷ আর যুগ যুগ ধরে শোষিত মানুষের নিষ্প্রাণ চোখে, বহুদিন পর, আবার জ্বলে ওঠে অপরাজেয় বিশ্বাসের মহিমান্বিত আলো৷ আসবে সেই মহাসময়, আসবেই৷ রাতের অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো ঠিক ততটাই অনিবার্য হয়ে ওঠে৷
- Log in to post comments