সব দেশেই একসময় পেশী শক্তি বা অস্ত্র শক্তিতে বলীয়ানরা রাজত্ব চালিয়েছিল৷ তারা ক্ষত্রিয় শ্রেণী নামে পরিচিত৷ তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত অন্যদের বিষয় সম্পত্তি ও জীবন৷ সর্দারদের যুগ থেকেই রাজতন্ত্র সেই ক্ষত্রিয় যুগেরই নমুনা৷ রাজতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায়ে রাজারা রাজসিংহাসনে আসীন ছিলেন বটে, বুকের রক্ত দিয়ে দেশ রক্ষা বা দেশ জয়ও করতেন, কিন্তু তাঁরা চলতেন তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন বিপ্রের (ৰুদ্ধি যাদের বল) অঙ্গুলীহেলনে৷ চাণক্যের মত বিপ্রের পদতলেই ছিল এই ক্ষত্রিয়ের স্থান৷ সেটা ছিল বিপ্রযুগ৷ বুদ্ধিজীবী বিপ্রের তৈরী শাস্ত্রে ক্ষত্রিয়কে বিপ্রদাস বলা হয়েছে৷ সে সময় ক্ষত্রিয়রা তা মানতও৷ এরপর আসে বৈশ্য যুগ৷ শাসনতান্ত্রিক কাঠামোও পরিবর্ত্তিত হয়৷ রাজতন্ত্রের দলে আসে গণতন্ত্র৷ হয়ত তাতে রকমফের আছে৷ কিন্তু আসল কথা সমাজকে চালাত বৈশ্যরা৷ বৈশ্যের টাকার কাছে বিকিয়ে গিয়েছিল শস্ত্রধারী সান্ত্র্ত্রীর অস্ত্রশক্তি ও বিপ্রের বুদ্ধিবল৷ যেমন বর্তমান যুগটা৷ বুদ্ধিজীবীরা, সমাজের নেতা-মন্ত্রীরা পর্যন্ত পুঁজিপতিদের অর্থশক্তির কাছে নত৷ মুখে যে যাই বলুক, নির্বাচনের জন্যে কোটি কোটি টাকা খরচ৷ তাই পুঁজিপতিদের কাছে হাত পাততেই হবে৷ নাহলে তো নির্বাচনে জয়ের আশাই করা যায় না৷ আর এমনিতে তো পুঁজিপতিরা দান করে না৷ তারা আসলে পুঁজি বিনিয়োগ করে৷ আশা, এর বহুগুণ টাকা তারা তুলে নেবে নেতা, মন্ত্রী বা সরকারের সাহায্যে৷ অবশ্যই জনসাধারণের ঘাড় ভেঙ্গে৷ এই হ’ল বৈশ্য যুগের অর্থাৎ পুঁজিবাদী যুগের বৈশিষ্ট্য৷ বৈশ্য শোষণ চলে সূক্ষ্মভাবে, কখনও সহজে বোঝা যায়, কখনও অত সহজে বোঝা যায় না৷ ‘বিষকুম্ভং পয়মুখম্’ কলসীর ভেতরে বিষ, কিন্তু মুখে মিষ্টি পায়েস৷ কখনও অনেক রাখঢাক করে শোষণ চালালেও একটু চোখ-কান খোলা রাখলে সবই স্পষ্ট বোঝা যাবে৷
দ্বিতীয়বার কেন্দ্রের এন.ডি.এ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফ.ডি.আই) জন্যে ভারতের প্রায় সবকটি দরজাই খুলে দিয়েছিল৷ প্রতিরক্ষা, বিমান, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খুচরো ব্যবসা, সর্বক্ষেত্রেই বিদেশী পুঁজিপতিদের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত লগ্ণির অনুমতি দিয়েছিল৷ এইবার ধীরে ধীরে সর্বক্ষেত্রে বিদেশী অর্থের হাঙ্গররা এদেশে ব্যবসা খুলে, শিল্প-কলকারখানা তৈরী করবে৷ মোদী সরকার বলছেন, এটাই তো চাই৷ এদেশে ওরা টাকা ঢাললে---ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা খুললে এদেশের মানুষ বিশেষ করে বেকার যুবক-যুবতীরা চাকরী পাবে৷
আধুনিক প্রযুক্তিতে যে শিল্প কলকারখানা তা হ’ল মূলধন নিবিড় (ক্যাপিট্যাল ইনটেনসিব্)৷ এগুলিতে মূলধন বিনিয়োগের তুলনায় কমই মানুষকে কাজে নিয়োগ করা হয়৷ দেখা যাবে, ওই কারখানা খুলতে যত মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে, তার কয়েক ভগ্ণাংশ সংখ্যক মানুষের এখানে কর্মসংস্থান হবে৷ আর দু’হাত ধরে মুনাফার আকারে এদেশের সম্পদ লুটে নিয়ে যাবে৷
পুঁজিপতিরা কেবল যে অর্থনৈতিক শোষণ করে তা নয়, অর্থশক্তির সাহায্যে রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব কিছুকে কুক্ষিগত করে সবকিছুকেই তাদের পয়সা রোজগারের মাধ্যমে পরিণত করে৷ তখন হারিয়ে যায় মূল্যবোধ, হারিয়ে যায় মানবত্বের মহত্তর দিকগুলো৷ তখন সর্বস্তরে নেমে আসে অবক্ষয়, নেমে আসে দুর্নীতি, শোষণ, অনাচার, ব্যভিচার৷ শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এমনকি মানুষও পণ্যে পরিণত হয়৷ দেখা দেয় মানব সভ্যতার অধোগতি৷
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটাকেই বিচার করলে দেখব, একদিন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী এদেশে অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ পেয়ে ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দেয় রাজদণ্ডরূপে’৷ বর্তমানে আমাদের অতি বিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন অর্থনীতির বিশেষ জনের হাত ধরে এদেশে সাম্রাজ্যবাদী ধনকুবেররা আবার স্বমহিমায় ফিরে আসছে৷ তাদের কাছে দেশনেতারা দেশটাকেই বিকিয়ে দিচ্ছেন৷
এক্ষেত্রে দেশের মুক্তবুদ্ধির মানুষদের---শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে৷ সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে৷
পাশ্চাত্ত্যেরও ধনতন্ত্র, মার্কসবাদের বস্তাপচা দর্শনের গোলকধাঁধায় আমাদের দেশের তথাকথিত অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী হারিয়ে ফেলছেন তাঁদের স্বচ্ছ চিন্তাধারা৷ আমাদের বুদ্ধিটাই আজ বিভিন্ন ডগ্মার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে৷ আর এই বদ্ধ জলাশয়ের জল স্বাভাবিকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে৷ তাই স্বচ্ছ চিন্তার অভাব দেখা দিয়েছে৷
আসুন, সমস্ত ডগমার জাল ছিন্ন করে মুক্ত বুদ্ধি নিয়ে বিচার করুন আমরা কোথায় চলেছি৷ বৈশ্যযুগের সর্বগ্রাসী শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আজ নোতুন পথের অনুসন্ধান করতে হবে৷ প্রাউটের নব্যমানবতাবাদই সেই নোতুন পথ৷ আজকের নিপীড়িত মানবতাকে বাঁচাতে, মানব সভ্যতাকে চরম ধবংসের হাত থেকে বাঁচাতে প্রাউটের নব্যমানবতাবাদকে জানুন৷
- Log in to post comments