গণতন্ত্র সম্পর্কে বহুল প্রচলিত প্রবাদটি হলো--- জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য জনগণের শাসন৷ কিন্তু পৃথিবীর কোথাও কি প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! অন্যদেশের কথা থাক, ভারতবর্ষের সাধারণ নাগরিকদের কাছে সার্থক গণতন্ত্র আজও অধরা৷ ভারতে যে গণতন্ত্র চলছে তাকে বলা যায়---অর্থের দ্বারা, অর্থের জন্য ধনকুবেরদের শাসন৷ বস্তুত স্বাধীন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের অনেক আগেই ভারতীয় গণতন্ত্রের বেদীতে ধনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়৷ অর্থাৎ স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই দেশীয় পুঁজিপতিরা দেশীয় অর্থনীতির সঙ্গে দেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক দলগুলি ও নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে৷ এ ব্যাপারে রাম, বাম ও ডান সবপক্ষই ধনকুবেরদের চরণে আশ্রয় নিয়েছে৷
একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু--- ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম ব্যষ্টিত্ব যাঁর চরিত্রে শঠতা, ভণ্ডামি, কপটচারিতা কখনও স্থান পায়নি৷ তিনি প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষের ভারতবাসীর স্বাধীনতা চেয়েছিলেন৷ পশ্চিম ভারতের কিছু নেতার মত তিনি কখনও ক্ষমতার খোয়ার দেখেননি৷ ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি হয়ে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি ঘটন করেছিলেন৷ তিনি চেয়েছিলেন দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন৷ সেই কারণেই তিনি দেশীয় পুঁজিপতিদের চক্ষুশূল হয়ে যান৷ এর আরও কারণ লণ্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সামনে তিনি দেশীয় পুঁজিপতিদের মুখোশ খুলে দেন৷
সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলেন৷ সুভাষচন্দ্রই একমাত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা যিনি সর্ব সাধারণের আর্থিক মুক্তির চিন্তা করেছিলেন৷ তাই দেশীয় পুঁজিপতি ও তাদের অর্থপুষ্ট নেতারা সুভাষ বিরোধিতায় আদা জল খেয়ে নেমে পড়ে৷ সুভাষ বোস হারিয়ে গেলেন৷ সেদিন গান্ধী পটেল গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দ্বিতীয়বার ১৯৩৯ সালে নির্বাচিত সভাপতি সুভাষচন্দ্রকে সামান্য মর্যাদা দেয়নি৷ ভারতীয় গণতন্ত্রের অবক্ষয় সেই দিনই শুরু হয়৷ সেইদিন অহিংসার পূজারীর সুভাষ বিরোধিতা এত নীচে নেমেছিল যে বিশ্বকবিকেও তার বিরুদ্ধে কলম ধরতে হয়েছিল৷ দেশীয় পুঁজিপতিদের অর্থে ছাগ-দুগ্দ পেয় নেতা বিশ্বকবির পত্রকেও উপেক্ষা করেছিলেন৷ সেইদিন থেকেই অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও দেশীয় পুঁজিপতিদের দখলে যায়৷
সুভাষচন্দ্রের অনুপস্থিতিতে ক্ষমতালোভী ব্যষ্টিত্বহীন নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশীয় পুঁজিপতি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ দেশকে টুকরো করে ভারত অংশের ভার সেইসব নেতৃত্বের হাতে তুলে দিয়ে যায় পুঁজিপতিদের কথায় ওঠে বসে, তাই স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকরা জীবন ধারণের নূ্যনতম প্রয়োজনটুকুও পায়নে৷ আজ জনগণের শুধু ভোট দেবার অধিকারটাই আছে৷ সেখানেও বোট নেবার নানা ছল-চাতুরী, নানা ফন্দি-ফিকির রাজনৈতিক দলগুলো করে থাকে৷ এক কথায় দেশীকে পুঁজিপতি ও রাজনৈতিক দলগুলি (রাম-বাম-ডান সবপক্ষই) জনগণের সঙ্গে প্রতারনা করে চলেছে ৭৮ বছর ধরে৷ জনগণের নামে পুঁজিবাদ তোষণের এই গণতন্ত্র ধনতন্ত্রেরই নামান্তর৷ এখানে ধণিক শ্রেণীর অবাধ লুন্ঠনের সুযোগ আছে কিন্তু সাধারণ মানুষের দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোটাতেই দিন শেষ হয়ে যায়৷
- Log in to post comments