(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
যে ধর্মের স্বভাব বা সহজ প্রবণতা হচ্ছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে পরিণত হওয়া জীবভাব থেকে শিবভাবে যাওয়া, অপূর্ণ থেকে পূর্ণ হয়ে ওঠা সোজা কথায় পরমপুরুষকে পাওয়া বা ঈশ্বরের ভাবনা নিতে নিতে ঈশ্বর হয়ে ওঠা প্রতিটি সত্তার মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করা এই নিখাদ ধর্ম চেতনাই সংশ্লিষ্ট দেশের মানুষের মন থেকে উবে গেছে৷ ধর্মের নামে চলে ধর্মমতের সন্ত্রাস আর ধর্মমতান্তর৷ এর থকে বাঁচতেই মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে অনিশ্চিতের অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়৷ প্রতিটি কাজের আমরা জানি যে’ যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী অনুরূপ ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটবেই৷ এরই ক্রিয়াত্মিকা বৈবহারিকী নিত্যপয়াসই স্পিরিচ্যুয়্যাল কাল্ট) হচ্ছে ধর্মসাধনা৷ অর্থাৎ-‘আমাদের বহির্মুখী মনকে অন্তর্মুখী করে ---তথা বিন্দুস্থ করে সর্বসত্তায় সদা বিরাজমান পরমব্রহ্মের চিন্তায় মনকে হিন্দোলিত করতে করতে --- নিজের সমস্ত অণু-পরমাণুকে সেই বৃহতের চিন্তায় দোলায়িত করতে করতে এক অদ্বিতীয় আনন্দ স্বরূপে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার যে বিধিবদ্ধ মনোবৈজ্ঞানিক অনুশীলন বা মানস-আধ্যাত্মিক প্রয়াস তাকে বলে সাধনা আসলে এটাই হচ্ছে ধর্মসাধনা৷ কাজেই তাৎপর্যগত দিক থেকে ধর্ম পকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিকতারই প্রতিশব্দ৷ আধ্যাত্মিক নিত্যপ্রয়াসই (স্পিরিচ্যুয়্যাল কাল্টই) ধর্মের তথা আধ্যাত্মিকতার লাক্ষণিক পরিচয় তথা অন্তর্নিহিত অভিপ্রকাশ৷ বলাবাহুল্য, একটা আদর্শ সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আধ্যাত্মিকতার আব্রহ্মস্তম্ব বোধ-বোধি নিরপেক্ষ - অপক্ষপাত দৃষ্টি, যুক্তিবিজ্ঞান ও বিচারশীলতা, সর্বজনের সার্বিক হিতাকাক্ষা ও সকলের প্রতি সমান অহৈতুকী অপাপবিদ্ধ ভালবাসা ছাড়া সম্ভব নয়৷ সবচেয়ে বড় কথা এর কোন বিকল্পও নেই৷ দুর্ভাগ্যের বিষয় মানুষেরই ( রাষ্ট্রনেতা তথা সমাজপতি ) অনবধানতা- অনবহিতায় প্রায় ৩০০ বছর আগে সমাজ জীবন থেকে আধ্যাত্মিকতা পুরপুরি হারিয়েই গেছে বলতেই হয় ঊ কিন্তু মানুষ তার বিশেষ জৈববৈজ্ঞানিক যন্ত্র রূপ শরীরটা পেয়েছেই আধ্যাত্মিকতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যেই৷ মানুষের আন্তর-প্রকাশ মর্মধবনির জ্রঞ্জ নামটাই আধ্যাত্মিকতা (সাইলেন্ট ইনহেরিটেন্স) কার্য্যতঃ তা মনকে বিস্তার করার অনুশীলন৷ তাই সমাজে বা রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের সর্বস্তরে এর অন্তঃসলিত্ব ও নিত্যপ্রয়াস আশু প্রয়োজন৷ আধ্যাত্মিকতার প্রতিষ্ঠা তথা প্রকৃত ধর্মসাধনার ব্যবস্থা করা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা আদর্শসমাজ বা রাষ্ট্রের অবশ্য-কর্তব্যের মধ্যে পড়ে৷ বিভ্রান্তি বা চমকে ওঠার কোন জায়গা নেই৷ ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রীস্টধর্ম জৈনধর্ম ইত্যাদি তথাকথিত ধর্মমতগুলোর সংগে আধ্যাত্মিকতার কেবল আমান-জমিন পার্থক্যই নেই আছে অহি-নকুল সম্পর্কও৷ প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিকতা একটা বিদ্যা, একটা শিক্ষা একটা কাল্ট -নিত্যপ্রয়াস৷ ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে পরিণত হওয়ার আত্যন্তিক -বৈবহারিক- প্রয়াস৷ আধ্যাত্মিকতা অন্যান্য শিক্ষনীয় বিষয়ের মত একটি বিদ্যা ---যা বয়সী বা আবাল- বৃদ্ধ-বনিতা জাতি-বর্ণ-ধর্ম, ধনী-দরিদ্র আলোকিত-পশ্চাদদ নির্বিশেষে নিরপেক্ষে প্রতিটি মানুষের একটি আত্যন্তিক নিত্যপয়াস -- যা প্রাত্যহিক নিত্যকর্মের মতই৷ এর সঙ্গে ধর্মান্তরণের বা ধর্মনাশের কোন সম্পর্ক নেই৷ আধ্যাত্মিকতা মানুষ পরিচায়ক বিশেষ জীবপ্রজাতির মর্মগত ও বৈবহারিক ক্রিয়াত্মিকতাও বটে৷ আসলে প্রতিটি জীবপ্রজাতির (স্পেসিসের) সহজাত স্বভাব বৈশিষ্ট্য আছে--যা প্রতিটি জীবসত্তার অস্তিত্বকে ধারণ করে থাকে বা আপন জীবসত্তাত্ব বজায় রাখে৷ এই সত্তাগত বৈশিষ্ট্য বা গুণকেই তো এক কথায় বলে ধর্ম৷ এটা মানুষের সেই স্বভাব যা তাকে পূর্ণতার প্রতি-বৃহতের প্রতি আকর্ষণ করে বা ঈশ্বরমুখী করে তলে যা তার মধ্যে পরমচৈতন্য সত্তার প্রতি অকৃত্তিম প্রেম ও আকর্ষণ জাগিয়ে দেয়৷ এই অন্তর প্রবণতা (প্রোপেন্সিটি ) বা এই বৃহতের প্রতি এষণা আকর্ষণই মানুষের ধর্ম৷ বৈবহারিক জীবনে এরই প্রতিফলনে মানুষের অন্তরে জাগে যে ব্যক্ত-অব্যক্ত স্থাবর জঙ্গম, ক্ষুদ্র-বৃহৎ অণু- পরমাণু ত্রসরেণু---প্রতিটি সত্তাই ভূমাচৈতন্যময়৷ স্বাভাবিকভাবেই সর্বজীবের কল্যাণভাবনায় মানবহৃদয় পূর্ণ হয়ে ওঠে ৷ এই যে বৃহতের প্রতি এষণা ও তাঁকে পাওয়ার বা উপলব্ধির বা এই অনন্ত সত্তায ভূমাচৈতন্যে পরমপুরুষে সমাহিত হওয়ার যে সীমাহীন আকুতি ও নিত্য প্রয়াস -- সেই আবহ সঞ্জাত ভাবাত্মক -ক্রিয়াত্মক ব্যঞ্জনার নামই হল এক কথায় আধ্যাত্মিকতা৷ সাধারণ মানুষের কাছে ‘ধর্ম’ বা ‘ধর্মসাধনা’ নামেই এর পরিচয়৷
মানুষের বৈবহারিক জীবনে ধর্ম-এর আরও একটি অভিপ্রকাশ আছে ঊ এটা হছে মানুষের সত্তাগত গুণ বা বৈশিষ্ট্য অনুস্যূত বৈবহারিক জীবনধর্ম বা জৈবধর্ম সোজা কথায় আচরণ ধর্ম৷ যেমন কৃষকের ধর্ম, শিক্ষকের ধর্ম, ব্যবসায়ীর ধর্ম, চিকিৎসকের ধর্ম ক্ষত্রিয়ের ধর্ম৷ এই জৈব ধর্মের মধ্যে দুটি চেতনা কাজ করে৷ এক. প্রতিটি সত্তার সঙ্গে একাত্মবোধ ( স্রষ্টার অনন্ত অভিপ্রকাশেরই এক একটি রূপ মাত্র ওয়াননেস-- সমদৃষ্টি) দুই. সকলের হিতের প্রতি দায়বদ্ধতা - অন্যোন্যজীবিতা --- একে বলা যায় কালেক্টিভিটিও৷ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে যুগে যুগে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিলেন তা মানুষের সত্তাগত বৈশিষ্ট ও বৈবহারিক জীবনধর্ম উভয়কেই বুঝিয়েছেন৷ কেননা ব্যষ্টি মানুষের জীবন ও সমষ্টিগত সমাজ জীবন উভয় ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ছিল৷ কিন্তু আধ্যাত্মিকতা বিহীন সমাজে প্রকৃত কল্যাণ হয়না৷ কেননা যুক্তি-বিচার-বুদ্ধি- কর্মৈষণার সঙ্গে অন্তরের অহৈতুকী ভালবাসা --- নিত্যপ্রয়াসের মেলবন্ধন না ঘটলে (এককথায় ভক্তি না জাগলে) কল্যাণ হওয়া বা করা সম্ভব হয়না৷ আধ্যাত্মিকতায় দৃঢ়--প্রতিষ্টিত ভক্তিরসসিক্ত মানুষই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী, জাতিভেদ প্রথা, শোষণ - বঞ্চনা - অত্যচার-অবিচার করা মানসিকতার ঊর্ধে উঠে যায়৷ পরমপুরুসে-- ভূমাচৈতন্যে সমর্পিত অপাপবিদ্ধ হৃদয়ই করুণানিধান, মমতাময়,ও কল্যাণব্রতধা সায়র৷ তাই সমাজের কর্তব্য হচ্ছে সমাজে আধ্যাত্মিকতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা৷জেনেরাখা ভাল ধর্মান্তরণ সমাজের ঐক্য নষ্ট করে৷ সমাজকে বিভিন্ন কম্পারমেণ্টে ভাগ করে দেয়৷ দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা পারস্পরিক নির্ভরতায় বেড়ে ওঠা আর্থ-সামাজিক জীবনের ভারসাম্যও ধবংস হয়ে যায়, রাষ্ট্রের ঐক্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি স্বরূপ৷ দেশের মাটিতে জন্ম খেয়েপরে বড় হওয়া আনুগত্য যেন স্বধর্মের ভিন রাষ্ট্রের প্রতি৷ অবাক হওয়ার কিছু নেই ! এটাই যেন ভবিতব্য৷ যদি কোন দেশে একটি বিশেষ ধর্মমত দেশীয় বা জাতীয় ধর্মমত বলে ঘোষিত হলে অন্য ধর্মতের অনুসরণকারীরা সেই দেশের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে না৷৷ যেমন-- উত্তরপূর্ব ভারতের ধর্মান্তরিত গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ভারতীয় বলেই ভাবতে ভুলে গেছে ইউরোপীয় মিশনারীরাই যেন তাদের আপন জন৷ ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে একই চিত্র৷ ওপার বাঙলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মনজুড়ে আছে হিন্দুস্থান --- ভারত, ভারতের সাংখ্যা গরিষ্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষপাতিত্ব বাঙলাদেশ পাকিস্থান সহ ইসলামিক দেশগুলোর প্রতি৷ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায় ও ভারতীয় ধর্মসম্প্রদায় ছাড়া ধর্মান্তরিত সম্প্রদায় গুলো স্পম্প্রদায়গত ভাবে অংস গ্রহণ করে নি৷ বাঙলার জাতীয় সম্রাট শশাঙ্কের গৌড়সাম্রাজ্যের পতন ঘটে উত্তরাপথিনাথ হর্ষবর্ধনের গুণগ্রাহী বাঙলার বৌদ্ধসমপ্রদায়ের বৌদ্ধসমপ্রদায়ের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইন্ধনে ৷ একই ভাবে একালে অনিবার্য ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতা লাভে ভারত ভাগ করে তার মূল্য চোকাতে হয়েছে৷
গুণগ্রাহী বাঙলার,এটাতো ঐতিহাসিক সত্য মানব সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে জাতিকসত্তাকে ভর করে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হয়েই প্রাচীন সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল৷ ধর্মান্তরবাদীরা ধর্মমতান্তরকরণে পরেও তা অর্থাৎ জাতিকসত্তার প্রভাবকে মানুষের মন থেকে উপরে ফেলতে পারেনি৷ আরব উপদ্বীপ, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরেশিয়ার ইসলামিক দেশগুলর মধ্যে যে বিবাদ - বিসংবাদ - লড়াই তা আদতে জাতিকসত্তাগত৷ সুদূর অতীতে যা ছিল ‘রেসবা নরগোষ্ঠী কেন্দ্রিক ঐতিহাসিক কাল থেকে একালে তা সংঘটিত হয়েছে এথ্রনিক গ্রুপ বা জনগোষ্টী ভিত্তিক জাতিসত্তার ( এথ্রনিসিটি ) স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তা বা প্রাণধর্মের স্বীকৃতি-মর্যাদা অর্থাৎ জাতিকসত্তাশ্রয়ী আপন স্বভাব বৈশিষ্ট্যে বেড়ে ওঠার সামর্থ্য-সুযোগ-অধিকার -নিশ্চিততা তার মধ্য মণি৷ ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে প্রাকৃতজ স্বাতন্ত্র্য মাফিক প্রকৃতির ক্রিয়াত্মিকা শক্তিতে গড়ে ওঠা জাতিকসত্তা কতগুলো বিষয়ে উত্তরাধিকার লাভ করে ঐতিহ্য বহন করে৷ যেমন-স্বতন্ত্র ভাষা ( ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ ), নিজস্ব স্বয়ম্ভর অর্থনৈতিক বুনিয়াদ, সামাজিক ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি৷ গড়ে ওঠে জাতিকসত্তাগত জীবনধর্ম৷ ধর্মমত এই জীবনধর্ম তথা স্বাতন্ত্র্য বৈচিত্র্যকে স্বাতন্ত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্য মান্যতা দেয় না গুরুত্বও দেয়না৷ ধর্মমত তা যে পরিচয়েই হোক নাকেন তথাকথিত ধর্মান্তরণ এই স্বাতন্ত্র্য-বৈচিত্র্যকে ধবংস করে দেয়৷ ফলে বস্তুজগতের সঙ্গে সন্তুলনের সংশ্লেষণাত্মক শিক্ষা-ভাবনা-অভ্যাসটাই হারিয়া ফেলে মানুষ৷ আর আর বিষফল স্বরূপ সমাজে জাতপাতের বড় বাড়বাড়ন্ত৷ বলাবাহুল্য আজকের বিশ্বে যত বিভেদ - বৈষম্য জাতপাতের জঞ্জাল তার মূলে প্রধান হোতা হচ্ছ ধর্মমত আর ধর্মান্তরণ৷ এবং অবশ্যই সমাজ ও জীবনে আধ্যাত্মিকতা বিস্মৃত হওয়া বা কল্কে না পাওয়া ৷
- Log in to post comments