ধর্মান্ধতা একটা জাতিকে শুধু দুই সম্প্রদায়ে নয়, ভৌগোলিকভাবেও দ্বিখণ্ডিত করে ধবংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে৷ তথাকথিত স্বাধীনতার পর ৭৮ বছর ধরে এপারে ওপারে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত লেগেই আছে, কখনও কখনও তা ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে ওঠে, ভাই অক্লেশে ভায়ের রক্তে হাত রাঙায়৷ স্বাধীন দেশের শাসকও যখন এই সাম্প্রদায়ীক সংঘর্ষকে ইন্ধন যোগায় তখন তা আরও ভয়ঙ্কররূপ ধারণ করে৷ এই হিংস্র সাম্প্রদায়ীকতার আড়ালে খলনায়ক চতুর পুঁজিপতি শোষক৷ কিন্তু সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসন অলংকৃত করেছে তার কেন এই বৌদ্ধিক অবক্ষয়, মানসিক দৈনতা!
এক দার্শনিকের কথায়--- কিছু সংখ্যক গুণ্ডা-বদমাস অপেক্ষা ভ্রান্ত দর্শনের অনুগামীরা সমাজের অনেক বেশী ক্ষতি করে৷ একদিকে তথাকথিত ধর্মের নামে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার অপরদিকে ভাঙতো জড়বাদী চিন্তাধারা এই ধবংসের মূলে৷ একমাত্র মার্কস্বাদই যেমন সমাজতন্ত্র নয়, তেমনি তথাকথিত ধর্মমতের ধবজাধরে এই যে পরস্পর সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে হানাহানি এও মানবধর্ম নয়৷ মহামতি মার্কস এই ধর্মমতকে দেখেই ধর্মকে অস্বীকার করেছেন৷ প্রকৃত মানবধর্মের সন্ধান আর করেননি৷ বিশ্বকবি ধর্ম সম্পর্ক বলেছেন---‘পশু বলছে ‘সহজ ধর্মের পথে ভোগ করো’--- মানুষ বলছে--- মানব ধর্মের সাধনা করো৷’ ধর্মীয় মতবাদ ও জড়বাদী চিন্তাধারা আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বিজ্ঞানের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে৷ আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে উচ্ছৃঙ্খলা, ব্যভিচার,অনাচার,দুর্নীতি, অশ্লীলতা, অসংস্কৃতির প্রকপ তার মূলে রয়েছে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার বিচ্ছেদ৷ একদিকে পুঁজিবাদী শোষক ও তাদের পোষ্য রাজনৈতিক দলগুলি ভ্রান্ত ধর্মমতের আবেগে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে ভ্রান্ত জড়বাদ ধর্মকে আপিং বলে মানুষকে অধর্মের পথে ঠেলে দিচ্ছে৷ বর্তমান সমাজের দুর্গতির মূল কারণ এখানেই৷
এ বিষয়ে বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ঋষি শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার আধ্যাত্মিক জগতে যিনি শ্রীশ্রীআননন্দমূর্ত্তি নামে পরিচিত--- তাঁর প্রবর্ত্তিত আনন্দমার্গ দর্শনে বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে মানুষের দৈহিক মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের সুস্পষ্ট পথ নির্দেশনা দিয়েছেন৷ তাঁর প্রবর্ত্তিত দর্শনে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও মানব জীবনের পরমলক্ষ্যের পথ নির্দেশনা আছে, আবার লক্ষ্যে পৌঁছাবার বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলনও আছে৷ অপরদিকে একটি বলিষ্ঠ সমাজ ঘটনের সবরকম উপকরণ সামাজিক অর্থনৈতিক তত্ত্বে দিয়েছেন৷
আজকের মানুষ আধ্যাত্মিকতার পথ ত্যাগ করে প্রকৃত মানব ধর্মের পথ থেকে সরে গিয়ে তথাকথিত ধর্মমতকে আঁকড়ে ধরে অন্ধ আবেগে নিজেকে ও মানব সমাজকে ধবংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে৷ ধর্ম ও ধর্মমতের পার্থক্য আজ পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়নে৷ এবিষয়ে আনন্দমার্গ দর্শনে স্পষ্ট বলা হয়েছে ধর্ম ও ধর্মমতের পার্থক্য৷ ধর্মমত অনেক কিন্তু বিশ্বের সকল মানুষের ধর্ম একটাই৷ ধর্ম প্রতিটি সত্তার সত্তাগত বৈশিষ্ট্য, এটা জীব-জড় প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ তাই জীব-জড় প্রতিটি বস্তুর ধর্ম জানতে হলে তার আচরণগত বৈশিষ্ট্য জানতে হবে৷
প্রতিটি জীব সুখ চায়, অর্র্থৎ তার এটা অভাব রয়েছে তা পূরণ করতে চায়,সেই অভাব পূরণ হলে সে সন্তুষ্ট হয়৷ যেমন একটা গোরু পেট ভরে খাবার পেলে সন্তুষ্ট আর কিছু চায় না৷ কিন্তু মানুষের চাওয়ার শেষ নেই৷ পেট ভরলেও মন ভরে না, সে যত পায় তত চায় ‘কবিগুরুর ভাষায় ‘যাহা পাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না৷’ তাই , আজ যে মোটা ভাত মোটা কাপড় চায়, তা পেলে সে বাড়ী, গাড়ী কত কিছু চায়, যত পায় তত চায়৷ এই যে অনন্ত চাহিদা এটাই মানুষের ধর্মষ (‘বৃহদেষণা প্রণিধানঞ্চ ধর্ম’৷ সংস্কৃতে বৃহৎ মানে সীমাহীন৷ মানুষের মধ্যে অসীমের চাহিদা রয়েছে, অসীমকে পাওয়ার জন্যে যে চেষ্টা--- তাই মানুষের ধর্ম৷
এখন অসীম কী? একমাত্র ভূমা চৈতন্য ছাড়া কোনোকিছু অসীম নেই৷ তাই প্রকারান্তরে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি মানুষই সেই ভূমা-চৈতন্যকে অর্র্থৎ ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকেই চায়৷ এই ভূমা চৈতন্যকে পেলে তবে সে পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করবে৷ এই ভূমা চৈতন্যকেই বলা হয় ঈশ্বর বা ব্রহ্ম৷ ভিন্ন ভাষায় একেই বলে গড্ বা আল্লা৷ বিশ্বের সমস্ত মানুষেরই এই সত্তাগত বৈশিষ্ট্য৷ তাই বিশ্বের সকল মানুষেরই ধর্ম একই, একে আমরা বলব মানবধর্ম৷ এই মানবধর্মের পথ ধরে মানুষ যত এগুবে ততই তার মন প্রসারিত হবে ও বিশ্বের সমস্ত সত্তার প্রতি তার মমত্ব ও ভালবাসা বাড়বে৷ এটাই মানবতার পরাকাষ্ঠা৷ একেই শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী বলেন বিশ্বমানবতাবাদ৷
এটাই মনুষ্যত্বের চরম বিকাশের পথ ৷ তাই সংকীর্ণ বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রিলিজিয়ন নয়, মানবতার চরম বিকাশই মানুষের প্রকৃত ধর্ম--- এটাই ‘মানবধর্ম’৷
বিশ্বের সমস্ত আগুনের যেমন এক ধর্ম, সমস্ত জলের যেমন এক ধর্ম, সমস্ত মানুষেরও এক ধর্ম৷ তাই রিলিজিয়নের বিকৃত ধারণা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক দ্বেষ, বিদ্বেষ, ঘৃণা--- এসব সম্পূর্ণরূপ অবলুপ্ত হওয়া উচিত৷ মানবসমাজ এক ও অবিভাজ্যা--- একে বিভিন্ন সেন্টিমেন্টে বিভক্ত হতে দেওয়া উচিত নয়৷ এজন্যে রিলিজিয়নের সেন্টিমেন্ট মানুষের মন থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত৷ এই পথ ধরে সবাই রিলিজিয়ন ভুলে এক মানবধর্মের পতাকা তলে এসে দাঁড়ালে মানব সমাজের সামূহিক কল্যাণ হবে৷
- Log in to post comments