না এই নির্বাচনে দুর্নীতি কোন ইস্যু হতে পারে না৷ এই নির্বাচন এক কোটি বাঙালীর ভোটাধিকার তথা মৌলিক অধিকার হরণ করেছে নির্বাচন কমিশনার কেন্দ্রীয় শাসকদলের মদতে৷ শুধু তাই নয় গণতন্ত্রের ওপরেও আঘাত হানছে দিল্লি স্বৈরাচারী শাসক৷ সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের সমীক্ষার প্রতিবেদনে ভারতকে নির্বাচিতদের স্বৈরাচার ও আংশিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছে৷ এই স্বৈরাচারী শাসকের প্রধান লক্ষ্য বাঙলা ও বাঙালী৷ তাই এই নির্বাচনে বাঙালীর সামনে তার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ণ, তার অধিকার অর্জনের প্রশ্ণ৷
তবু রাজ্যের শাসকবিরোধী প্রধান দল ও অন্য সব দলই দুর্নীতিকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছে৷ কিন্তু এই নির্বাচনে দুর্নীতি কোন ইস্যু হতে পারে না বাঙালীর সামনে৷ দুর্নীতির কথা সত্যিই যদি ধরতে হয় ভারতবর্ষে এমন কোন রাজনৈতিক দল নেই যে ক্ষমতার সাধ পেয়েছে অথচ দুর্নীতি গায়ে মাখেনে৷ স্বাধীনতার আগে থেকেই ক্ষমতার অধিকারীরা দুর্নীতিকে সহোদর ভাই বানিয়ে নিয়েছে৷ তিরিশের দশকে পরাধীন ভারতে কংগ্রেস সাতটা প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল৷ সেই মন্ত্রিসভা গুলো সম্পর্কে ভারত বন্ধু ও জহরলাল এর বিশেষ বন্ধু এডওয়ার্ড টমসন জহরলাল কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন ----’ কংগ্রেসী মন্ত্রিসভা মাসে ৫০০ টাকা বেতন নিচ্ছে শুনে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম৷ শুনে খুবই খারাপ লাগছে ---- এই যে আত্মোৎসর্গ এর বেশির ভাগই ভুয়ো, কেননা তারা বাকিটা ভাতা হিসেবে নিচ্ছেন....৷ ভারতবর্ষে ক্ষমতার রাজনীতিতে দুর্নীতির অনুপ্রবেশ সেই দিনই ঘটে গেছে৷ আজ তো ভারতবর্ষে দুর্নীতি হিমালয় পর্বত সমান৷ তৃণমূল সেই পর্বতের ছোট্ট একটা চুড়া, আর বিজেপি দুর্নীতির এভারেস্ট৷ তাই কে কার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করবে!
ভারতবর্ষে বাঙালীর সামনে একটাই প্রশ্ণ--- তার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ণ৷ ভারতবর্ষে বাঙালি জনগোষ্ঠী থাকবে কি থাকবে না? স্বাধীনতার পর থেকেই ছিন্নমূল বাঙালী উদ্বাস্তুদের নিয়ে ফুটবল খেলে চলেছে রাজনৈতিক দলগুলি৷ ঠিক যেভাবে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তুদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য তার ছিটেফোঁটাও করা হয়নি৷ স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও বাঙালী আজও ভারতে ঘুষপেঠিয়া, অনুপ্রবেশকারী, বিদেশী বাংলাদেশী! আর আজ দিল্লির বাঙালী বিদ্বেষী স্বৈরাচারী শাসক বাঙলা দখলে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে৷ তথাকথিত এস আই আর এর নামে ( বিশেষ নিবিড় সংশোধন) প্রায় এক কোটি বাঙালীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে৷ এই নির্বাচনে বিজেপি ভোটে জিততে দালাল নির্বাচন কমিশনার, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রশাসক এনে গুটি সাজিয়েছে৷ মাথার ওপর আছে পক্ষপাত দুষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচন কমিশনার ও হাতের পাঁচ ইভিএম মেশিন৷ যেনতেনোপ্রকারে একবার ক্ষমতায় বসতে পারলে এই এক কোটি তো বটেই আরো কয়েক কোটি বাঙালীকে বেনাগরিক বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভরে দেবে বিজেপি৷ বিজেপিকে এই কাজে সহযোগিতা করছে কিছু বেইমান বিশ্বাসঘাতক বহিরাগত পোশাকি বাঙালী৷ দুর্নীতি তাই এই নির্বাচনে ইস্যু নয় বাঙালীর সামনে৷ আজ প্রথম কাজ হল বিজেপিকে রুখতেই হবে বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে৷ অস্তিত্ব থাকলে তবেই না রাজনীতি, তবেই না দলাদলি৷
প্রশ্ণ হল বিজেপিকে রুখতে কাকে সামনে রাখবে বাঙালী! কংগ্রেস! সিপিএম! এরাই তো স্বাধীনতার পর ৬৫ বছর বাংলা শাসন করেছে৷ এদের অপদার্থতার জন্যেই ৭৮ বছরেও উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান হলো না৷ দুর্নীতিতে এরাও পিছিয়ে ছিল না৷ আমরা বাঙালী নামের একটি সংগঠন আছে৷ বাম রাজত্বে আট-এ দশকে কলকাতা সহ গোটা রাজ্যেই চোখে পড়তো হিন্দি সাইনবোর্ডগুলোতে আলকাতরা লেপন৷ আমরা বাঙালীর এই আত্মপ্রকাশ দেখে ভয় পেয়েছিল প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি৷ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান প্রমদ দাশগুপ্ত একটা বই লিখে ফেলেছিল ---- এ বিপদ রুখতে হবে৷ বাঙালী জনগোষ্ঠী নয় সেদিন বিপদের সিঁদুরে মেঘ দেখেছিল ওই রাজনৈতিক দলগুলি৷ তাদের অপপ্রচার ও তথাকথিত সংবাদ মাধ্যমগুলির নীরবতা আমরা বাঙালী সংগঠনকে বেশিদূর এগোতে দেয়নি৷ তবু আজও আমরা বাঙালী সংগঠন তার অস্তিত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে৷ এই নির্বাচনেও কিছু আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে৷ কিন্তু ক্ষমতার আশেপাশে থাকারও কোনো সম্ভাবনা তার নেই৷ কিন্তু এই নির্বাচনে আমরা বাঙালীর নৈতিক জয় হয়ে গেছে৷ আমরা বাঙালী গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে সাবধান করে আসছিল আজকের দিনটির জন্য৷ কিন্তু সেদিন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি প্রাদেশিক সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদ অপবাদ দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বাঙালীর অগ্রগতি রুদ্ধ করেছিল৷ এই নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষার কথা৷ বাঙালি বলাটা হাজার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রাদেশিক সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়৷ আমরা বাঙালীর নৈতিক জয় এখানেই৷ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা বাঙালী এই দিনটির জন্যই চিৎকার করে আসছে যেদিন বাঙালী অন্তত নিজের বাঙালী পরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইবে৷ আজ ইচ্ছা থাক বা না থাক সেই কাজ করতে বাধ্য হয়েছে রাজ্যের শাসক দল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলো৷ আজ আমরা বাঙালীর কাজ এরাই করছে৷ তবু বাঙলায় একটা প্রবাদ আছে --- গাং পেরলে কুমির শালা!
তাই আমরা বাঙালীর কাজ আমরা বাঙালীকেই করতে হবে৷ কিন্তু এই নির্বাচনে বাঙালী কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপিকে রুখতেই হবে৷ আর বাঙালীর সামনে এই মুহূর্তে এই কাজে তৃণমূলের বিকল্প কেউ নেই৷ তাই সব মান অভিমান বিদ্বেষ ভুলে এই নির্বাচনেও বাঙালীকে তৃণমূলের পাশেই দাঁড়াতে হবে বাঙলা ও বাঙালীর বৃহত্তর স্বার্থে৷ ঘরে ডাকাত পড়লে ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ দূরে সরিয়ে রেখে রুখে দাঁড়াতে হয়৷ বাঙালীর ঘরে আজ সত্যিই ডাকাত পড়েছে৷ ভিন রাজ্য থেকে আগত বহিরাগত ডাকাত৷ চরম বাঙালী বিদ্বেষী ধর্মান্ধ এই ডাকাত শুধু বাঙলাকে লুণ্ঠন করতেই আসেনে, অশ্লীল অসংস্কৃতির স্রোত বইয়ে বাংলার উদার অসাম্প্রদায়িক ভাবধারাকে কলুষিত করছে এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক জাতিবিদ্বেষী ডাকাত৷ এই ডাকাতকে রুখতে এই নির্বাচনে বাঙালীকে তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতেই হবে৷ কারণ বাঙালী আজ সত্যিই হিংস্র দুঃসময়ের সম্মুখীন৷ দিল্লির স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় আসার আগেই প্রায় এক কোটি বাঙালীর মৌলিক অধিকার হরণ করে নিয়েছে৷ শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় সমগ্র পূর্ব উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাঙালীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন৷ এই বিপন্নতার মূলে দিল্লির স্বৈরাচারী শাসক৷ এই শাসককে প্রতিহত করতে দল-মত সম্প্রদায়ের উর্ধে উঠে বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে সামিল হতেই হবে৷
- Log in to post comments