অতি দুঃখের সঙ্গে অনেক প্রবীণ বলতে বাধ্য হচ্ছেন যে ধীরে ধীরে সারা সমাজটাই কি ধবংস হয়ে যাবে? চরম চারিত্রিক অধঃপতনে ও দল তন্ত্রী শাসকদের শাসনে সুশিক্ষার চরম অভাবে৷
মহান ভারতবর্ষ ধার্মিক আধ্যাত্মবাদের দেশ৷ সেই দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ একটি প্রগতিশীল রাজ্য যেখানে বহু মহান পুরুষ শুধু বাঙলা ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বমানব সভ্যতার ইতিহাস কে সমৃদ্ধ করেছেন৷ এখানে জাত-পাত সম্প্রদায়ের ঊধের্র্ব উঠে সকল শ্রেণীর মানুষ পরম আত্মীয়ের মত বাস করে৷ সেই রাজ্যে বারুইপুরে একটি ১১বছরের নাবালিকার ওপর একদল নরপিশাচ সমাজবিরোধী যে নির্মম নৃশংস অত্যাচার করে খুন করে বস্তাবন্দী করে জলে ফেলে দিয়েছে তা সারা মানব সভ্যতার লজ্জা৷ পশ্চিমবঙ্গবাসীর মাথা নত এই নৃশংস ঘটনা ঘটেছে বাঙলার মাটিতে৷
এ দায় শুধু ওই ছেলেগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে কঠোর শাস্তি দিলেই সমাজে এই পাপ থেকে মুক্ত হবে না৷ এর দায় নিতে হবে অভিভাবকদের পাড়া-প্রতিবেশীদের, সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসনকর্তাদের৷ বাদ যাবে না তথাকথিত সুশীল সমাজও৷
সন্তানকে মানুষ করার প্রাথমিক দায় অবশ্যই ছেলের পিতা-মাতার৷ সন্তান কেমন ভাবে মানুষ হচ্ছে তা প্রথম থেকেই লক্ষ্য রাখা উচিত মা-বাবার৷ কিন্তু আজকের সমস্যা জর্জরিত পৃথিবীতে সংসারের ভার সামলে ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকাবার সময় বড়ই অভাব৷
পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত দলতান্ত্রিক সরকার দল ও ব্যষ্টি স্বার্থে এই ধরনের অপরাধীদের নির্বাচনে জয়লাভ করতে ব্যবহার করে৷ পরিণতিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয়ে সমাজে এই ধরনের অপরাধ প্রণতা বাড়ছে৷ শিশুর উন্নত আচরণ ও নম্র স্বভাব তৈরীর শিক্ষা দেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব যেমন পিতা-মাতার তেমনি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তর থেকেও সুশিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত৷ কিন্তু সেখানেই অবহেলা সেখানেই রয়ে গেছে বড় গলদ৷ এর দায় প্রধানত কেন্দ্রীয় সরকারের হলেও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা রাজ্য সরকারকেও নিতে হবে৷ দুঃখের বিষয় সজীব মনের তত্ত্বের সঙ্গে বিদ্যার তত্ত্ব মিলিয়ে শিশুকে আদর্শ মানুষ করে গড়ে তোলার মত উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা আজো আমাদের দেশে তৈরি হয়নি৷
বহুদলীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি বড় প্রতিবন্ধক এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে৷ শিক্ষাব্যবস্থায় দলীয় আধিপত্য বিস্তার করতে ছাত্রকে আদর্শ মানুষ করা অপেক্ষা দলীয় ক্যাডার কর্মী তৈরি করার দিকে বেশি নজর থাকে৷ তাই স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও দেশে একটা আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি৷ যে দল যখন ক্ষমতায় আসে তার মতো করে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে৷ রাজ্যে বিরোধী দলের শাসক থাকলে কেন্দ্রের চরম অবহেলার শিকার হতে হয় শিক্ষার স্বাস্থ্য সবকিছুই কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে৷ গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ বিরোধী সরকার কেন্দ্রের কাছ থেকে সবদিক থেকেই বঞ্চিত ছিল অথচ কেন্দ্রের রাজস্বের একটা বৃহৎ অংশ যায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে৷ পশ্চিমবঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন সরকার আনতে একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশন থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী সংবাদ মাধ্যমের বৃহৎ অংশকে ব্যবহার করা হয়েছে তেমনি মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হার স্বীকার করে পদত্যাগ করেননি৷ তিনি আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন৷ কিন্তু নারী সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি ডাবল ইঞ্জিন সরকার দিয়েছিল তার নির্মম পরিণতি দু’মাস এই বাঙলার মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷
বারুইপুরের ঘটনাতে পিশাচেরা ঘটিয়েছে, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জনগণ যাদের ধরে পুলিশের হাতে সঁপে দিয়েছিল৷ সেখান থেকে ছাড়িয়ে আনতে শাসকদলের স্থানীয় নেতার তৎপরতা, সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার পিছনে রাজনীতি একটা থেকেই গেছে৷ তবে শুধুমাত্র রাজনীতি এই ধরনের অপরাধের জন্ম দেয় না৷ রাজনীতি এই অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়৷ নারী নির্যাতন জনিত অপরাধ বাড়ার এটা অন্যতম কারণ৷ শাসক ও দায় অস্বীকার করতে পারে না৷ কারণ সন্তানগণকে সুশিক্ষা দেবার প্রাথমিক দায় যেমন বাবা-মার তেমনি স্কুলে দলীয় মাতববরি ছেড়ে আদর্শ মানুষ গড়ার আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় শাসকের স্বাধীনতার ৭৮ বছরে কোন শাসক সেদিকে নজর দেয়নি৷ শুধু দলীয় প্রভাব বিস্তারের দিকে নজর দিয়েছে৷ অপরাধী যারা ধরা পড়েছে তারাই কি শুধু অপরাধী নাকি পশ্চাতে আরও কোন বড় মাথা আছে এ প্রশ্ণ অবান্তর নয়৷ তাই এ ধরনের অপরাধের দায় শাসককে নিতেই হবে ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সমস্ত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে৷ নতুবা সমাজ সভ্যতা ধবংস হয়ে যাবে৷
- Log in to post comments