তাদের প্রতি আমার এই প্রতিবেদন৷ ঐতিহাসিক ভাবেই হিন্দু মহাসভা, অর্থাৎ বিজেপি আরএসএস এর পূর্বপুরুষও একই কাজ করতেন৷
রাজা রামমোহন রায় যখন সতীদাহ প্রথার মতন অমানবিক, পাশবিক, বর্বর এই প্রথা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন৷ তখন সমাজে কারা উনার বিরোধিতা করে, গ্রামে গ্রামে সমগ্র শহরে ছড়িয়েছিলেন উনি ব্রিটিশদের দালাল ? এই হিন্দু মহাসভার লোকজনেরা৷ সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে এদের বিরুদ্ধেই মূলতঃ লড়াই করতে হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়কে৷ সেই কাজে ব্রিটিশরা বরঞ্চ আইন এনে উনার সাহায্যই করেছিলেন৷ তাই আজকে ভারতের নারীরা এই বর্বর অমানবিক প্রথা থেকে মুক্ত ও স্বাধীন৷
কিন্তু আজকেও কেন্দ্রীয় দলের প্রতিনিধিদের বক্তব্যের দিকে কান পেতে দেখুন, ওরা এখনও বলেই চলেছে রাজা রামমোহন রায় নাকি ব্রিটিশদের দালাল৷
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়, যখন বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে চাইলেন, যে প্রথা কিশোরী ও যুবতীদের পরাধীনতার শিকল পরিয়ে বন্দী জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছিল, তখন বিদ্যাসাগর বাবুকেও এই হিন্দু মহাসভার প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল৷ শেষ পর্যন্ত সমাজের সামনে উদাহরণ স্থাপনের জন্য উনি উনার পুত্রের বিবাহ দেন এক যুবতী বিধবার সাথে, অবশ্যই পুত্রের সহমত নিয়ে৷ এছাড়া উনি বাংলা ভাষার জন্য যা যা করেছেন সেটাও অকল্পনীয়৷
তাই ফলস্বরূপ আজও দেখুন, বিজেপির কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হলে বাংলায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙে৷
স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অবদান ওদের ব্যথা দেয়, কারণ তাদের প্রভু ছিল ব্রিটিশ৷ তাই সেই ব্রিটিশ বিরোধিতার তীব্রতা ও তাতে বাংলার অবদান চুরি করতে, আন্দামান জেল থেকে ধরে ধরে বেশিরভাগ বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম মুছে, বাংলার অবদান মুছে ফেলার চেষ্টা করছে৷
রবীন্দ্রনাথ এর এই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প কলা নিয়ে যা অবদান, পাশাপাশি দেশের আদর্শের কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপনে যা ভূমিকা, সেটার বিরোধীও বিজেপি ও তাদের পূর্বসূরীরা ঐতিহাসিক যুগ থেকেই৷
রবীন্দ্রনাথ হিন্দু মুসলিম বিভাজনের আজীবন বিরোধিতা করেছেন, বঙ্গ ভঙ্গ রোধ করে দুই বাংলাকে এক করেছিলেন, হিন্দু মুসলিম সকলকে রাখি পরিয়ে সকল মানব ভাই, ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত, এই আদর্শের প্রচার ও প্রসার করেছিলেন৷ এই সকল কারণে হিন্দু মহাসভা তখনও রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করেছিলেন৷ আজও তাদের উত্তরসূরি বিজেপি বলে রবীন্দ্রনাথ জন গণ মন লিখেছিলেন নাকি পঞ্চম জর্জকে খুশি করার জন্য৷ উনিও নাকি ব্রিটিশদের দালাল ছিলেন৷
এবং শেষে বর্তমানে আমরা চাক্ষুষ দেখছি আমাদের দেশের প্রধান পর্যন্ত লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলছেন বঙ্কিম দা৷ মানে উনাকে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে, ভারতের জাতীয় সঙ্গীত বন্দেমাতরম এর স্রষ্টাকে কিভাবে সম্মান জানাতে হয় ? এরা এদের স্বভাবগত, ডিএনএ গত বৈশিষ্ট্য৷ এছাড়া কিভাবে উনি বন্দেমাতরম জাতীয় সঙ্গীতের পেছনের যে উদ্দেশ্য সেটা মুছে ফেলতে কিভাবে মিথ্যাচার করলেন৷ উনি বললেন ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র মহাশয় নাকি বন্দে মাতরম লিখেছেন শুধু হিন্দু দেশের উদ্দেশ্যে ?
কংগ্রেস নাকি শুধু কয়েকটা লাইন ওখান থেকে নিয়ে দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করেছেন, নাহলে ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র মহাশয় নাকি হিন্দু দেশ বানানোর কথা বলতে চেয়েছেন৷
কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, বন্দেমাতরম গানটি একটি উপন্যাসের অংশ, সেই উপন্যাস সম্পূর্ণ বাংলার পটভূমিতে, আপামোর বাঙালির উদ্দেশ্যে লেখা, বাংলার জনগণের কথা, আন্দোলনের কথা সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ধর্মীয় বিভাজনকে সেখানে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হয় নি৷
পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ সেই বন্দেমাতরম থেকে প্রথম কয়েকটি পংক্তি নিয়ে সেটাকে প্রচার করেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্বুদ্ধ করতে, কংগ্রেসের সমাবেশ থেকে, কারণ তারাই তখন স্বাধীনতার লড়াই করছিল, হিন্দু মহাসভা আরএসএস তখন কংগ্রেসের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরোধিতা করে ব্রিটিশদের সাহায্য করতো, ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ করার বদলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন করেও ব্রিটিশদের সাহায্য করতো, বাঙালিকে দুর্বল করতে৷
এরা ঐতিহাসিক ভাবে বাংলা বিরোধী, তাই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা থেকে, রাজা রামমোহন রায়কে ব্রিটিশদের দালাল থেকে বঙ্কিম ড, এরকম উদাহরণ বারে বারে আসবে, বাঙালিকে বাংলা বলতে শুনলে বাংলাদেশী বলে বিদেশী চিহ্ণিত করবে৷ এটাই এদের ডিএনএ৷
- Log in to post comments