তথাকথিত ধর্মমত কে হাতিয়ার করে একটা জাতি কিভাবে পুরো জনগোষ্ঠীকে ধবংসের পথে নিয়ে যেতে পারে বাঙালী জনগোষ্ঠী তার প্রকৃত উদাহরণ৷ দ্বিজাতি তত্ত্বের আওয়াজ তুলে হিংস্র উন্মত্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে দেশ ভাগ করে কয়েক কোটি মানুষকে চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছাড়া করেও বাঙালীর বোধোদয় হলো না৷ একটা জনগোষ্ঠীকে ধবংসের কিনারে এনেও উন্মত্ত ধর্মান্ধতা ছাড়তে পারছে না৷ ধর্মের নামে যারা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, নরহত্যা করে সমাজে সন্ত্রাস ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে,তারা কখনো ধার্মিক নয়, মানুষও নয়, মনুষ্যত্বহীন দ্বিপদ জীব বিশেষ৷ যে ধর্মমতের ধবজা উড়িয়ে তারা বীভৎস আনন্দ পায় তা কখনো মানুষের ধর্ম---মানবধর্ম হতে পারে না৷ বাঙালী এই পরম সত্য কবে বুঝবে!
এক দার্শনিক বলেছেন মানুষ স্বভাবতই মন্দ৷ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক কবিতায় লিখেছেন---‘‘জন্মিয়াছি এমন বিশ্বে নির্র্দেষ সে নয়৷ মন্দ ও ভালোর দ্বন্দ্ব কে-না জানে চিরকাল আছে সৃষ্টির বক্ষ মাঝে৷’’ মন্দ ও ভালোর দ্বন্দ্ব যেমন সৃষ্টির বক্ষ মাঝে আছে তেমনি মানুষের মনেও আছে৷ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষও এই মন্দ-ভালোর দ্বন্দ্বে দূলে চলেছে৷
দার্শনিক ঋষি শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের দার্শনিক ভাবনায় মানুষ মনপ্রধান জীব৷ অন্যান্য জীব সহজাত সংস্কার দ্বারা পরিচালিত হয়৷ কিন্তু একমাত্র মানুষেরই সহজাত সংস্কারের উপর মননের প্রাধান্য আছে৷ তাই মন প্রধান জীব মানুষ৷ মানুষ শুধু মন প্রধান নয়, বুদ্ধিমান জীব৷ যে মানুষ তার মননের ওপর বুদ্ধিকে ব্যবহার করে সৎপথে পরিচালনা করে সে ভালো মানুস, যে মানুষ তার বুদ্ধির অপব্যবহার করে অসৎ পথে পরিচালনা করে সে মন্দ মানুষ৷
মানুষ তার জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার নিয়ে পৃথিবীতে আসে৷ তাই চাইলেও সে সহজে সৎ পথে চলতে পারে না৷ তার সংস্কার তাকে বাধ্য করে অসৎ পথে চলতে৷ তাই মানুষের মধ্যে মন্দ ভালোর দ্বন্দ্ব চিরকালের৷ সহজাত সংস্কার অনুযায়ী মানুষের মধ্যে মন্দ ভাবের প্রাধান্য থাকে৷ তাই মানুষ সহজেই অধঃপথের দিকে চলে যায়৷ তাই মানব দেহ নিয়ে জন্মালেই মানুষ মানুষ হয় না৷ তার মননের ওপর শুভবুদ্ধির আরোপ করে সৎপথে পরিচালিত করেই মানুষকে মানুষ হতে হয়৷ কিন্তু এটা সহজে হয় না এর জন্য মানুষকে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হয়৷ এই নিরন্তর প্রয়াসই সাধনা৷ এই সাধনাই মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলে৷ এই সাধনাই মানুষকে তার জীবনের পরম লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে জীবনকে সার্থক করে৷ এই সাধনাই মানব জীবনের ধর্ম৷ এই ধর্ম কোন একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর ধর্ম নয়, সমগ্র মানব জনগোষ্ঠীর ধর্ম৷ তাই আনন্দমার্গ দর্শনে বলা হয়েছে--- সব মানুষের ধর্ম এক৷
আজ অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের আবর্জনায় ভরা তথাকথিত ধর্ম নিয়ে মানুষ যে আত্মঘাতী বিবাদে লিপ্ত তা কখনো মানব ধর্ম হতে পারে না৷ এগুলোকে ধর্মমত বলা যায়৷ মানুষ প্রকৃত মানবধর্ম ভুলে ধর্মমত নিয়ে মাতামাতি করে৷ তাই সমাজে এত বিভেদ বৈষম্য এত রক্তক্ষয়৷ স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ীরা তথাকথিত ধর্মমতের উন্মাদনায় মানুষকে ছুটিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে৷
আজ হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী থেকে ভাবজড়তা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের আবর্জনায় ভরা ধর্মমতকে বিদায় দিয়ে মানুষ যদি যথার্থ মানব ধর্মের পথে না চলে তবে মানুষ তার মানব পরিচয়ের প্রতি অবিচার করে পরস্পরে হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি করে আরো পাঁচটা মনুষ্যত্বর জীবের মতো পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে৷
না এমনটা হবে না৷ অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কার আর ভাবজড়তার বেড়া ভেঙে মানুষ তথাকথিত ধর্মমতের গণ্ডি মুক্ত হয়ে মানব ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নব্যমানবতার পথে চলা শুরু করেছে৷ যে পথে কোন সীমারেখা নেই৷ কোন উঁচু নিচু ছোট বড় ভেদ ভাবনা নেই--- সবাই আপন৷ শুধু মানুষই নয় পশু, পাখিও মানুষের পর নয়, তরুলতারও বাঁচার সমান অধিকার আছে৷ এই উদার অসাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা মুক্ত নব্যমানবতাবাদী ভাবধারাই আজকের মানুষের একমাত্র আশ্রয়৷ মানুষ যত শীঘ্র আত্মঘাতী সংঘর্ষ ভুলে এই উদার অসাম্প্রদায়িক ভাবধারায় ভাবিত হবে তত দ্রুত পৃথিবীর কল্যাণ হবে৷
- Log in to post comments