মানুষের জীবনটা তো একটা আদর্শের প্রবাহ৷ চলার ধারাটা স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে,--- বাইরের জগতের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চলতে অসীমের পানে চলা৷ এই চলার সংবেদ বা আকর্ষণ হচ্ছে ‘সমদর্শিত্ব’৷ অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুই পরমপুরুষের সৃষ্টি, তাঁরই সন্তান , আবার তাঁরই সমীম প্রকাশ৷ কেউ ছোট নয়, কেউ তুচ্ছ নয়৷ সবাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ--একটা একাত্মবোধ,এক আত্মবিম্বন - তাদাত্মতা৷ তাই সকলেরই সমান গুরুত্ব, সমান মর্যাদা৷ সকলেরই সার্বিক কল্যাণ কাম্য ও অবশ্য করণীয় --- এরই নাম ‘সমদর্শিত্ব’৷ স্মরণীয়, এই বিশ্বে বা মহাবিশ্বে মানুষের তথা জীবের অস্তিত্ব-অগ্রগতি-প্রগতিতে ক্রিয়াত্মিক শক্তির প্রকাশ ঘটে এই সমদর্শীত্বকে ভর করে৷ দার্শনিক দৃষ্টিতে এর বৈবহারিক রূপ হচ্ছে তথা ভাবাত্মকরূপ হচ্ছে সম অনুভূতি , সমমানসতরঙ্গ৷ আর এর ক্রিয়াত্মক রূপ বা গতি বা চলমানতা হচ্ছে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলা৷ এটাই জন্ম দেয় যূথচারিতার সঙ্ঘবদ্ধতার, ‘কালেক্টিভিটির’৷ কাজেই বাস্তবে সমাজ সংরচনার জন্যে বা আদর্শ তথা কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে অপরিহার্য প্রাণশক্তি হচ্ছে সম অনভূতি, সমমানসতরঙ্গ৷ বাস্তব জীবনে এর ফলিত রূপ পেতে হলে পূরণ করতে হবে প্রধান তিনটি শর্ত বা শূত্র বা সূত্র, যথাক্রমেজীবিকা, মাতৃভাষা ও আধ্যাত্মিকতা৷ এই ত্রয়ীই মানুষের জীবনসংগ্রামের, ক্রমবিকাশের ও ‘ সর্বজনঃ হিতায় - সর্বজনঃ সুখায়’--- মন্ত্রই প্রধান হাতিয়ার৷ একে বলা যায় ‘ত্রি-ফলা’---যা ত্রয়ী সত্তা বিশিষ্ট মনুষ্য পদবাচক জীবের ব্যষ্টিজীবনের ও সমষ্টিগত জীবনের তথা সমাজজীবনের ভৌতিক মানসিক ও আত্মিক ---এই ত্রয়ী সত্তা জুড়ে পরিব্যাপ্ত৷ কত কিছু থাকতে এমন সংবৃতি ( ফোকাস - করা, নিউক্লিয়াস ধর্ম আরোপ করা) কেন? উত্তর তো একটাই! কেননা এই রাজহংসবৃত্তি (সারাৎসার কে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা) যেমন বিজ্ঞান চেতনায় ঋদ্ধ তেমনি জীবনধর্মী ও মাটির সোঁদাগন্ধে ভরপুর৷ জীবন তো জীবনেরই জন্যে, ‘যথা হইতে আসি তথায় ফিরিয়া যাই’৷ উৎস থেকে বেরিয়ে সেই উৎসমূলেই ফেরা৷ এখন তো আর একথা মানুষের অজানা নয়৷ প্রসঙ্গক্রমে আরো মনে রাখা দরকার যে মানুষের আছে আত্মনিয়ন্ত্রনশক্তি, বিচারশীলতা, ইচ্ছাশক্তি-উইলফোর্স৷ তাই সে চলে বিচার বুদ্ধির আলোয় চালিত-তাড়িত হয়ে৷ কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীরা চলে প্রকৃতিদত্ত সহজাত প্রবৃত্তি (ইন্স্টিঙ্ট্) চালিত হয়ে---যা সীমাবদ্ধতায় - বাঁধা - সার্কিটের যন্ত্রের মত৷ প্রকৃতিই তাদের সব কিছুর নিয়ন্তা৷ অর্থাৎ পশুর আছে কেবল জীববৃত্তি , অর্থাৎ আহার-নিদ্রা-ভয়-মৈথুন৷ তবে দেহপ্রধান জীব পশুর পেট ভরা থাকলেই সব শান্তি৷ জীব হিসেবে মানুষেরও আছে জীববৃত্তি , কিন্তু সঙ্গে অধিকন্তু আছে বুদ্ধিবৃত্তি৷ অর্থাৎ তার কেবল পেট ভরা থাকলেই চলে না , মনের জানালায় খোলা হাওয়া যে তার চাই-ই চাই৷ আত্মিক বিকাশে সে উন্মুখ৷ এখানেই মানুষের সঙ্গে পশুর মৌলিক পার্থক্য৷ তাই সমাজে মানুষের জীবনের ত্রিধারার পুষ্টি-বিকাশে , জীবিকা-মাতৃভাষা ও আধ্যাত্মিকতার সুদৃঢ় ভিত্তি না থাকার অর্থ অনৈক্য , অবিচার , পক্ষপাতিত্ব ও শোষণকে সমাজের বুকে জামাই আদর করে ডেকে আনা৷ সমাজদেহের এই রাক্ষস-খোক্ষস , রক্ত-মজ্জা চোষক বাদুড়দের হাত থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে উল্লিখিত সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক মৌলনীতিগুলো যথাযথ ভাবে প্রতিপালিত ও সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী৷ বিশ্ব জুড়েই এর বড় অভাব বলেই যত গণ্ডগোল৷ তাই এই তিনটি মৌলনীতিকে - ত্রি- ফলাকে কখনো অমান্য করা উচিত নয়৷ প্রয়োগভৌমিক ক্ষেত্রে , মানুষের সার্বিক বিকাশে ও কল্যাণের স্বার্থে সমাজের বা রাষ্ট্রের অবশ্য - মান্য-কর্তব্য হচ্ছে বিকল্প ব্যবস্থা না করে কখনই কোন অবস্থাতেই কাউকে জীবিকা থেকে ছাটাই না করা বা জীবিকার পথটা বন্ধ না করা , আর চাপসৃষ্টি করে , জোর করে কাউকে ধর্মান্তরিত না করা , এবং কোন মাতৃভাষাকেই দাবিয়ে না রাখা৷ এই তিনের সঙ্গে জড়িত ভাবাবেগ আহত হলে মানুষ মাত্রই গভীর ভাবে প্রভাবিত , প্রতিস্পর্ধী ও প্রতিরোধী হয়৷
প্রথমেই ধরা যাক জীবিকার কথা ---- খেয়ে পরে বাঁচার বা গ্রাসাচ্ছাদন বা অন্যান্য চাহিদা মেটাবার উৎস বা ব্যবস্থাপকতা (চালিকা শক্তির ) নামই এক কথায় ‘ জীবিকা’, ‘বৃত্তি’ বা পেশা৷ মানুষ আগে বাঁচবে, তবেই তো সে চলবে , বেঁচে থাকলে তবেই না উদ্বর্তনার প্রশ্ণ ! কাজেই জীবনযুদ্ধে আগে বাঁচতে হবে৷ বাঁচতে গেলে চাই নূ্যনতম প্রয়োজন ( খাদ্য , বস্ত্র , বাসস্থান , শিক্ষা ও চিকিৎসা ) পূতর্ির যথাযথ ব্যবস্থা ও নিশ্চিতি ---যা সংশ্লিষ্ট সময়ের মূল্যস্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ক্রয়ক্ষমতার সামর্থ বাচক৷ এগুলো পাওয়ার গ্যারাণ্টি এসে গেলে তার পরেই আসে সর্বাধিক সুখ -সুবিধা পাওয়ার অবস্থা৷ ভৌতিক জগতে এমনকি মনো-জগতে সভ্যতার অগ্রগতি ও ক্রমোন্নতি এর ওপরেই অনেকাংশে নির্ভর করে৷ কেবল অস্তিত্ব রক্ষাই নয় সচ্ছল ও মনস্তত্ত্ব সম্মত জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে উদ্যোম- কর্মস্পৃহা- উৎপাদনশীলতা , এবং জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক , সামাজিক ও ভাষা- সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা , বৈয়ষ্টিক ও সামূহিক ক্ষেত্রে প্রগতির প্রশ্ণ৷
আধুনিক মানুষের জীবিকার কার্যকরী শক্তি হচ্ছে ন্যূনতম প্রয়োজন পূর্ত্তি নিশ্চিতি৷ তবে অনুসঙ্গ হিসেবে ---একথাও সঙ্গে থাকে সময়ের মূল্যস্তরের সাথে ভারসাম্য রেখে চলা ও উত্তরোত্তর সুখ-সুবিধার বৃদ্ধি ঘটানো৷ এ কথা আগেই বলা হয়েছে৷ বলাবাহুল্য , এটাই সমাজবিজ্ঞান অনুযায়ী রাষ্ট্রের বা দেশের শাসনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য৷ আবার এই উদেশ্য সিদ্ধির পথে সমস্ত বাধা আর অসুবিধা দূর করাও সমাজের অবশ্য কর্তব্য ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে৷ স্মরণীয় , জীবিকার এই ক্রিয়াত্মক শক্তি প্রতিটি প্রাণীন সত্তার মধ্যেও ব্যাপ্ত রয়েছে৷ মনুষ্যেতর প্রাণী --- অণুজীব থেকে বৃহৎ প্রাণীর ক্ষেত্রে জীবিকা মানে ‘ খাদ্য অন্বেষণ-সংগ্রহ ‘৷ ব্যবস্থাপনার নাম হল গ্রাসাচ্ছদন , অর্থাৎ - খাদ্য আর আশ্রয়৷ খাবার আর আশ্রয় পেলেই পশুর চলে যায়৷ তবে লোম ও ত্বকের ঘনত্ব দিয়ে প্রকৃতি পশুকে মানুষের পোষাকের বিকল্প গড়েও দিয়েছে৷ শিক্ষা পশুর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই হয়ে থাকে৷ এখন মানুষ পশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকলেও পশু সহজাত ভাবেই নিজেদের চিকিৎসা কোন কোন ক্ষেত্রে করে থাকে৷ মানুষ পশুর স্ব-চিকিৎসার লক্ষ্য করে কিছু রোগের ওষুধও আবিস্কার করেছে৷ কাজেই বিকাশ তো দূরের কথা , জীবিকা ছাড়া প্রাণের অস্তিত্বই থাকেনা , সমাজটাও থাকেনা৷ সেকারণে কোন অবস্থাতেই বিকল্প ব্যবস্থা না করে কখনও কাউকে জীবিকা থেকে ছাঁটাই করা উচিত নয়৷ করলে - সমাজে সামূহিক ও বৈয়ষ্টিক জীবনে ভয়াবহ দুদর্ৈব ও বিপর্যয় নেমে আসে৷ উদাহরণ ভুরিভুরি৷ তবে একটি দৃষ্টান্ত--- রাঢ়ের বাগদী , মেদিনীপুরের চুয়ার , লোধা গোষ্ঠীর মত সাবেক বাঙলার বেশ কিছু জনজাতি গোষ্ঠী অনেক কাল ধরেই বংশ পরম্পরায় বাঙলার আরক্ষা বা সেনা বাহিনীতে কাজ করতেন৷ ক্ষাত্রজীবী পেশা ভিন্ন এঁদের স্থাবর সম্পত্তি বা বিকল্প পেশা বলতে কিছু ছিল না৷ কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে এঁদের সাবেক পেশায় নিয়োগ রদ হয়ে যায়৷ ফলে এঁরা কর্মচ্যুত হয়ে ক্রিমিন্যালে পরিণত হয়৷ সেই সময় এঁদের যদি মিলিটারি বা পুলিশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হত তাহলে তাদের সমাজবিরোধী হয়ে সমাজের ক্ষতি করতে বাধ্য হতে হ’ত না৷ অর্থাৎ বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে মানুষকে জীবিকাচ্যুত করা মানে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক দূষণের জন্ম দেয়া , মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন করা , সামাজিক ভারসাময ভেঙে দেয়া৷ একই ভাবে দেশ বা সমাজ বা রাষ্ট্র নাগরিকদের স্থায়ী উপার্জনের পথ খুলে দিতে না পারলে তারও পরিণাম একই৷স্মরণে আসে চারণ কবির সেই সতর্ক বাণী--- ‘সকল কাজের পাবি রে সময় , আগে তোরা ভাতের যোগাড় কর ’৷ (ক্রমশ)
- Log in to post comments