পূর্বপ্রকাশিতের পর , সমাজে আধ্যাত্মিকতাকে প্রতিষ্ঠার জন্যে আশু প্রয়োজন একটা উপযুক্ত পরিবেশ রচনা করা ৷ বলাবাহুল্য, এই সংরচনার একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ধর্মমতগুলোর (রিলিজিয়নের) অতিসক্রিতায় লাগাম পরিয়ে জোর করে ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করা, আর দরকার ব্যাপকভাবে সর্বস্তরে সর্বজনীন বিজ্ঞান শিক্ষা,তথা প্রকৃত শিক্ষাকে অবৈতনিক ,আবশ্যিক ও বাধ্যতামূক করা ৷ বলার অপেক্ষা রাখেনা, ধর্মমতগুলি বৈজ্ঞানিক মনন ঋদ্ধ বা বিচারশীলতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় , স্পিরিচ্যুয়্যাল কাল্ট ভিত্তিকও নয় ৷ তবে কিছু ধর্মতে স্পিরিচ্যুয়্যাল কাল্ট থাকলেও তা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বজনীন নয় , সংখ্যা গরিষ্টের জন্যে যা আছে তা প্রার্থনা মূলক , বৈজ্ঞানিক মানস-আধ্যাত্মিক প্রয়াস নয় ৷ ফলতঃ রিলিজিয়ন বা ধর্মমত জাতিভেদ- হীনমন্যতা-মহামন্যতা --- বর্ণ বৈষম্য-ধনবৈষম্য- উঁচুনীচু ভেদাভেদ , নানান সংকীর্ণতা ও আধিপত্যবাদের বদ্ধ ঘোলা জলে আবদ্ধ ৷ এইজন্যে সমাজ জীবনের নানাস্তরে গতিহীনতা ও ভয়াবহ পতন এসেছে ৷ এখানে বলে রাখা ভাল , কিছু তথাকথিত চিন্তাশীল ব্যষ্টি রিলিজিয়ন- ধর্মমতকে এক আসনে বিসিয়েছেন ৷ আসল ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে তাঁরা অজ্ঞতার অন্ধকারেই রয়ে গেছেন ৷ আসলে বিশ্বজুড়ে রিলিজিয়নের নগ্ণ-নখর -হিংস্র-বিভৎস রুপ দেখে ও ধর্মের নামে ধর্মব্যবসায়ীদের ধর্মমতের শোষণের বীভৎস রূপ দেখে ( ---যার আড়ালে থাকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক শোষণ ) তাঁরা বিভ্রান্ত হয়েছেন , মানুষকেও বিভান্ত করেছেন --৷ এঁদের কাছে ধর্ম নাকি শোষণের হাতিয়ার ! আসলে এটা ধর্ম নয় , এ হচ্ছে ধর্মমত , রিলিজিয়ন ৷ আধ্যাত্মিক অনুশীলনের গভীরে ঢোকা তো দূরের কথা , তার নাগাল এঁরা পাননি , স্বাদও পাননি ৷ তবে যাই হোক , ধর্ম সংশ্লিষ্ট ভাবাবেগ কোন ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে মানুষ গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে , প্রতিক্রিয়াও মারাত্মক -- তা বলার অপেক্ষা রাখেনা ৷ লক্ষ্যনীয় , রিলিজিয়নের ভাবাবেগকে আশ্রয় করেই ভারত দু’টুকরো হয়েছে ৷ কিন্তু মানুষ অনেক কিছু ত্যাগ করতে পারে , কিন্তু জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মমত সহজে ত্যাগ করতে পারে না৷ ধর্মের নামে সন্ত্রাস- দখলদারী , ধর্মনাশ ও ধর্মান্তরের ভয়ে কোটি কোটি হিন্দু বাঙালী ওপার বাঙলা থেকে পালিয়ে এসেছে , আজো আসছে ৷ একই কারণে অনেক পারসিক সাবেক পারস্য ( বর্তমান ইরাণ ) ছেড়ে ভারত সহ অমুসলিম দেশে আশ্রয় নেন , ইহুদিরা ছড়িয়ে পড়েন নানা দেশে ৷ জোর করে ধর্মান্তরণ পৃথিবীর কোথাও কল্যাণ হয়নি৷ পৃথিবীর বহু স্থানে ধর্মান্তরকে মূলধন করে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ কায়েম হয়েছে ৷ জনৈক বাঙালী ক্রীড়াসাংবাদিক দক্ষিণ আফ্রিকায় একটা নিউজ কভার করতে গিয়ে কথা প্রসঙ্গে একজন আফ্রিকান কর্মকর্তার উগরে দেয়া চাপা ক্ষোভের কথা উল্লেখ করেন ৷ তিনি বলেন ,---- আমাদের ছিল জমি, ওদের ( ইউরোপিয়ানদের ) ছিল বাইবেল , এখন আমাদের আছে বাইবেল, ওদের হয়েছে জমি ৷ লাতিন আমেরিকার রেড্ইণ্ডিয়ান, ভূমিপুত্ররা সব হারিয়ে ভূমিদাসে -কৃতদাসে পরিণত হয়েছে ৷ ধর্মের নামে শোষণ , আধিপত্য কায়েম করতে ধর্মান্তরকারীরা ধর্মান্তরিত মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয় নিজেদের আঞ্চলিক ও ধর্মীয়-ভাষা-সস্কৃতি৷
সমাজ ও সভ্যতার পক্ষে ধর্মান্তরণের সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে --- ধর্মান্তর সমাজের ঐক্য নষ্ট করে৷ সমাজকে বিভিন্ন কম্পারমেণ্টে ভাগ করে দেয়৷ দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা পারস্পরিক নির্ভরতায় বেড়ে ওঠা আর্থ-সামাজিক জীবনের ভারসাম্যও ধবংস হয়ে যায়৷ এটা সমাজের বা রাষ্ট্রের ঐক্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি স্বরূপ৷ দেশের মাটিতে জন্ম, দেশেরই খেয়েপরে বড় হওয়া, কিন্তু আনুগত্য ষোল আনা স্বধর্মমতের ভিন রাষ্টের প্রতি ৷ অবাক হওয়ার কিছু নেই! এটাই যেন ভবিতব্য ৷ যদি কোন দেশে একটি বিশেষ ধর্মমতকে দেশীয় বা জাতীয় ধর্মমত বলে ঘোষিত বা বিশ্বাস করানো হলে অন্য ধর্মতের অনুসরণকারীরা সেই দেশে সঙ্গে একাত্ম বোধ করে না৷ যেমন-- উত্তরপূর্ব ভারতের ধর্মান্তরিত গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ভারতীয় বলেই ভাবতে ভুলে গেছে , ইউরোপীয় মিশনারীরাই যেন তাদের আপন জন ৷ ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে একই চিত্র৷ ওপার বাঙলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মনজুড়ে আছে হিন্দুস্থান --- ভারত , ভারতের সাংখ্যা গরিষ্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষপাতিত্ব বাঙলাদেশ পাকিস্থান সহ ইসলামিক দেশগুলোর প্রতি ৷ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায় ও ভারতীয় ধর্মসম্প্রদায় ছাড়া ধর্মান্তরিত সম্প্রদায় গুলো স্পম্প্রদায়গত ভাবে অংস গ্রহণ করে নি৷ বাঙলার জাতীয় সম্রাট শশাঙ্কের গৌড়সাম্রাজ্যের পতন ঘটে আর্যাবর্তের হর্ষবর্ধনের গুণগ্রাহী বাঙলার বৌদ্ধসমপ্রদায়ের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইন্ধনে ৷ একই ভাবে একালে , অনিবার্য ফলশ্রুতিতে ,স্বাধীনতা হস্তান্তর কালে ভারতের আরবীয় ধর্মমত-সম্প্রদায়ের অযৌক্তিক অমানবিক অবৈজ্ঞানিক দাবীকে মানতে ভারত ভাগ করে তার মূল্য চোকাতে হয়েছে ৷
মানব সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হয়েই প্রাচীন সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল৷ আজও তার অন্যথা হয়নি ৷ ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে প্রাকৃতজ স্বাতন্ত্র্য মাফিক প্রকৃতির ক্রিয়াত্মিক শক্তিতে গড়ে ওঠা জাতিকসত্তা ভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলো কতগুলো বিষয়ে উত্তরাধিকার লাভ করে , ঐতিহ্য বহন করে ৷ যেমন-স্বতন্ত্র ভাষা ( ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ ) , নিজস্ব স্বয়ম্ভর অর্থনৈতিক বনিয়াদ, সামাজিক ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি ৷ বিশেষ কালে , বিশেষ স্থানে বা অঞ্চলে, ব্যষ্টি বিশেষের কোন ধর্মমতই এই বৈচিত্র্যকে , স্বাতন্ত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্য মান্যতা দেয় না , গুরুত্বও দেয়না ৷ ধর্মান্তরণ এই স্বাতন্ত্র্য -বৈচিত্র্যকে ধবংস করে দেয় ৷ ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠী ধর্মমতের তলায় চাপা পড়ে প্রাণধর্মকেই হারিয়ে ফেলে৷ যেমন বাঙলার মাটিতে এটা ভয়ঙ্করভাবে ঘটেছে ৷ বাঙলার নিজস্ব ধর্ম হছে মানবধর্ম-যা দঁড়িয়ে আছেযোগ-তন্ত্রগত জৈব-মনোবজ্ঞান আশ্রয়ী নিত্যপ্রয়াস বা কাল্ট আধারিত আধ্যাত্মিকতার ওপর৷ ধর্মমত দিয়ে এর তল পাওয়া যায় না৷ তাই বাঙলায় জাতপাতের ভেদাভেদ অতীতে ছিল না ৷ বাঙলায় আর্য অভিযানের পর বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মমত দিয়ে ভেদাভেদ শুরু৷ বৌদ্ধ ধর্মতের ঝড় সবকিছু ওলট পালট করে দেয় ৷ শঙ্করাচার্যের ব্রাহ্মণ্যবাদ বাঙলার ধর্মীয় জীবনটাকে জাতপাতের ভেদাভেদে আড়ষ্ট , সংকুচিত করে দেয় ৷ কফিনে শেষ পেরেকটা পোঁতে আরবীয় ধর্মমত ও ভাষা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ৷ তাকে আরো গভীরে নিয়ে যায় খ্রীষ্টধর্মমত৷ বাঙালীর যদি সবচেয়ে বেশী সর্বনাশ কেউ বা কিছু করে থাকে তা অবশ্যই ধর্মমত তথা ধর্মান্তরণ ৷ একথা সাধারণ মানুষের কাছে আড়ালেই রাখা হয়েছে - যে মানুষ কেন , কোন সত্তারই ধর্ম পালটানো যায় না , নোতুন কোন ধর্ম আরোপ করাও যায় না , ব্যাপারটা সোনার পাথরবাটির মত নয় কী ! আসলে ধমান্তরকরণ তা স্বেচ্ছায় হোক আর বাধ্য হয়েই হোক না কেন --- যা পালটালো তা হচ্ছে একটি বিশেষ ধর্মমতের নাম ছাপা নামাবলী ত্যাগ করে বা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে আর একটা নামাবলী জড়িয়ে নেয়া, একটা বাহ্যিক আচার-আচরণ ছেড়ে আর একটাতে ভর করা৷ ফল হল কী , না আধ্যাত্মিকতা আরো অধরাই থেকে গেল৷ আধ্যত্মিকতার জৈব-মানসিক নিত্যপ্রয়াস বৈবহারিকী বিজ্ঞানটা তো অপরিবর্তনীয়৷ মাঝখান থেকে ধর্মান্তরকরণ কেবল কেবল ধর্মান্তরিত মানুষের স্বভাবধর্ম , প্রাণধর্মকেই নস্যাৎ করল না , মানুষ ও সভ্যতাকে আদিম অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দিল ৷ একারণে রাষ্ট্রের মৌল সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিই হচ্ছে যেকোন মূল্যে জোর করে ধর্মান্তর রদ করা ৷ তাই বলা যায়, আদর্শ রার্ষব্যবস্থা গঠন করতেমৌল তিন সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক নীতির মান্যতা, প্রবর্তন ও সাংবিধানিক লিখিত অধিকার লাভের ব্যবস্থা থাকা জরুরী ৷ তারই অপেক্ষায় রয়েছে সমগ্র মানবসমাজ ও মানবসভ্যতা ৷ ৷৷ সমাপ্ত ৷৷
- Log in to post comments