প্রত্যেকটি মানুষকে বোঝাতে হবে যে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ প্রত্যেকের সাধারণ সম্পত্তি৷ সবারই একে ভোগ করার জন্মগত অধিকার রয়েছে৷ এ অধিকারে হস্তক্ষেপ করা কখনোই চলবে না৷ তাই প্রত্যেককেই জীবনযাত্রার নিম্নতম মান দিতেই হবে৷
মানুষের যা সর্বনিম্ন প্রয়োজন তার ব্যবস্থা সবাইকার জন্যেই করতে হবে৷ অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসগৃহ, শিক্ষা এগুলির ব্যবস্থা সবাইকার জন্যেই করা অবশ্য কর্ত্তব্য৷ যে যুগের যেটা সর্বনিম্ন প্রয়োজন সেটার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে৷৫ জীবনধারণের জন্যে নূ্যনতম প্রয়োজন–পূর্ত্তির নিশ্চিততাই মৌল জনস্বার্থ৷
যারা দৈহিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে দিন–রাত্রি কঠোর সংগ্রাম করে’ চলেছে তারা তাদের মানসিক উন্নতির জন্যে খুব কমই সময় পায়৷ তাদের খাওয়া–পরার সমস্যাই তাদের মনের বিকাশকে স্তব্ধ করে’ দিয়েছে৷ মনুষ্যত্বের বিকাশ তথা সার্বিক উন্নতির জন্যে প্রতিটি মানুষের সমান সুযোগ ও নূ্যনতম প্রয়োজনের গ্যারিণ্টির ব্যবস্থা করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন৷
মানুষের সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটানোর কথা বলে’ই ক্ষান্ত হলে চলবে না, এই সব প্রয়োজন–পূর্ত্তির গ্যারাণ্টিরও ব্যবস্থা করতে হবে৷ তাই প্রতিটি ব্যষ্টির ক্রয়ক্ষমতার ব্যবস্থা করে’ দেওয়াও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব৷
প্রতিটি মানুষের সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটাবার দায়িত্ব সমাজের, কিন্তু সমাজ যদি এই দায়িত্বের প্রেরণায় প্রেষিত হয়ে প্রত্যেকের গৃহে অন্ন প্রেরণের ব্যবস্থা করে, প্রত্যেকের জন্যে গৃহ নির্মাণ করিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে ব্যষ্টির কর্ম–প্রচেষ্টায় ভাঁটা পড়বে–সে ক্রমশঃ অলস হয়ে পড়বে৷ তাই সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটাতে গেলে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, নিজ সাধ্যমত পরিশ্রম–বিনিময়ে প্রত্যেকে যাতে সেই অর্থ উপার্জন করতে পারে, সেই ব্যবস্থাই সমাজকে করতে হবে৷ আর সর্বনিম্ন প্রয়োজনের মানোন্নয়ন করতে হলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়াই হবে প্রকৃষ্ট উপায়৷ জাগতিক ক্ষেত্রে সবরকম উন্নতির পক্ষে ক্রয়ক্ষমতা একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে৷
মানুষের নূন্যতম চাহিদা পূরণের জন্যে সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের ক্রয়–ক্ষমতার নিশ্চিততা* লিখিতভাবে থাকবে৷ আর এই ক্রয়–ক্ষমতাকে মৌলিক মানবিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ যদি কোন নাগরিক মনে করেন যে তাঁর নূ্যনতম চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের বিরুদ্ধে মৌলিক অধিকারভঙ্গের অভিযোগে মামলা দায়ের করতে পারবেন৷
সর্বনিম্ন চাহিদাগুলি সম্পর্কে মানুষ যখন নিশ্চিন্ত হবে তখনই সে উদ্বৃত্ত প্রাণ শক্তিকে (বর্তমানে সর্বনিম্ন চাহিদা মেটাতেই মানুষের সমস্ত প্রাণশক্তি নিঃশেষ হচ্ছে) সূক্ষ্ম সম্পদ অর্থাৎ মানসিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত করতে পারবে৷ সঙ্গে সঙ্গে উন্নত যুগের সৃষ্ট ভোগ্যপণ্যের সুযোগ থেকে সে যাতে বঞ্চিত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে৷ উপরি–উক্ত দায়িত্ব পালন করতে ক্রয় ক্ষমতার যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটাতে হবে৷
ক্রয়ক্ষমতার ক্রমবৃদ্ধির নিশ্চিততা
মানুষের মাথাপিছু আয়কে এপর্যন্ত জনসাধারণের অর্থনৈতিক উন্নতির সূচক, যথার্থ মান বলে’ গণ্য করার যে প্রথা প্রচলিত আছে–তা সমর্থন করা যায় না৷ মাথাপিছু আয়ের হিসেবে সমাজের সামূহিক সম্পদের পরিমাণ নির্দ্ধারণ করা একটা বিভ্রান্তিকর, প্রতারণামূলক ও অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি৷ সাধারণ মানুষকে বোকা বানাবার জন্যে, ও শোষণকে জনসমক্ষে ধামাচাপা দেবার জন্যে পুঁজিবাদের তল্পীবাহক অর্থনীতিবিদরা এই তত্ত্বটি জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করেছিলেন৷ মানুষের যথার্থ অর্থনৈতিক উন্নতির পরিচয় পাওয়া যাবে মানুষের মাথাপিছু আয় দেখে নয়, তার বাস্তবিক ক্রয়ক্ষমতা দেখে৷
প্রাউটের মতে মাথাপিছু আয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির কোনো বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়৷ তাই মানুষের মাথা পিছু আয়ের ভিত্তিতে কোন দেশ বা জাতির আর্থিক উন্নতির সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে না৷ বরং মাথা পিছু আয়কে উন্নতির মাপকাঠি ধরলে ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী৷ কেননা, এই পদ্ধতিতে সরল আঙ্কিক হিসেবে দেশের জনসংখ্যাকে মাথাপিছু আয় দিয়ে গুণ করলে যে পরিমাণ সম্পদ পাব সেটা হবে দেশের Gross national income ৷ তা দিয়ে কোনো দেশের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের খাঁটি চিত্র পাওয়া যায় না৷ কারণ, এর দ্বারা সমাজের ধনবৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে না৷ মাথাপিছু আয়ের মাধ্যমে কোন একক মানুষের গড় আয় কত হয়তো জানতে পারলুম৷ কিন্তু জাতীয় আয় বিলি বণ্টনের ক্ষেত্রে যে একটা বিরাট ব্যবধান রয়ে গেছে তার চিত্র তো পাব না৷ আবার যদি মুদ্রাস্ফীতির কথা ধরা হয়, তাহলে তো মাথাপিছু আয় তত্ত্বের যৌক্তিকতা আরও কমে যায়৷ অন্যদিকে মানুষের ক্রয়–ক্ষমতাই হ’ল একটা দেশ বা জাতির আর্থিক উন্নতির সত্যিকারের দ্যোতক৷ কারণ ক্রয়–ক্ষমতা আছে মানেই হ’ল মানুষ তার আয়ের দ্বারা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা করতে সক্ষম হবে৷ তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাউটের যাবতীয় পরিকল্পনার মুল লক্ষ্যই হ’ল জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো৷ সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষ মাত্রই জানে যে অনেক সময় অনেকম টাকা আয় করেও মানুষ তার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারে না৷ আবার অনেক সময় এমনও হয় যে আর্থিক আয় কম হলেও মানুষের যে পরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে সহজেই তাদের জরুরী প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলতে পারছেন৷ তাই বলছিলুম যে মাথাপিছু আয় নয়, ক্রয়–ক্ষমতাই অর্থনৈতিক উন্নতির সত্যিকারের মাপকাঠি৷ মোদ্দা কথাটা হ’ল এই যে প্রতিটি মানুষ যেন তার প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য নুন–তেল, চাল–ডাল, তরি–তরকারী, কাপড়–চোপড়, কয়লা, ওষুধ–পত্র, বই–খাতা সব কিছুই যেন তাঁর আর্থিক সামর্থ্যের পরিভূর মধ্যে এসে যায়৷
সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে প্রথমে শৌখিন দ্রব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সর্বাধিক উৎপাদন করতে হবে৷ এই ব্যবস্থা উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সমতা আনবে, ও জনসাধারণের প্রয়োজনপূর্ত্তির নিশ্চিততা আনবে৷
জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে গেলে যে কয়েকটি বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে সেগুলি হ’ল–
- মানুষের সামূহিক প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সামগ্রীর যোগান দিতে হবে৷
- ভোগ্যপণ্যের বাজার–দর বেঁধে দিতে হবে৷
- মুদ্রাস্ফীতিকে রোধ করতে হবে৷
- ক্রমবর্দ্ধমান হারে মাঝে মাঝে মজুরী ও মাসিক আয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে৷
- সামূহিক সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে যেতে হবে৷
মানুষের ক্রয়–ক্ষমতার কোন সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হবে না৷ অর্থাৎ কোন একটা বিশেষ সময়ে মানুষের নূ্যনতম প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রয়–ক্ষমতা নির্দিষ্ট করা হবে, ও তারপর থেকে স্থান–কাল–পাত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রয়ক্ষমতাকে উত্তরোত্তর বাড়িয়েই যেতে হবে৷ লক্ষ্য হ’ল সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের আর্থিক উন্নতি অনুযায়ী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমবর্দ্ধমান হারে বাড়িয়ে চলা৷ প্রতিটি ব্যষ্টির প্রগতিশীল ভাবে ক্রয়–ক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রাউটের অর্থনীতির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে৷