চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮.২ শতাংশ হওয়ায় উৎফুল্ল রাষ্ট্রের কর্ণধাররা৷ স্বাভাবিকভাবেই গলা ফুলিয়ে আর্থিক বিকাশের চিৎকার শুরু করেছে নেতা কর্মীরা৷ গদি মিডিয়াও পিছিয়ে নেই৷ কিন্তু এই জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে সবকা সাথ সবকা বিকাশের কি কোন সম্পর্ক আছে? আমজনতার জি.ডি.পি বৃদ্ধিতে কি লাভ হয়? না, এই প্রশ্ণের উত্তর নেতা কর্মী তো কোন ছাড়, দেশের অর্থমন্ত্রীর কাছেও নেই৷ জিডিপির অর্থ গ্রস ডোমোস্টিক প্রডাক্ট৷ প্রতি তিন মাস অন্তর এই হিসাব দেওয়া হয়৷ এই ডেমোস্টিক প্রডাক্টের সঙ্গে দেশের আমজনতার কতটুকু সম্পর্ক! যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা তাদের দেশের কোথায় কত উৎপাদন হল কত বিক্রি হলো, কোথায় কত বিনিয়োগ হল এসবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই৷ জিডিপি কমা-বাড়ার সঙ্গে দেশের এই আমজনতার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না৷ তারা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই পড়ে থাকে৷
জিডিপি কমার বাড়ার সঙ্গে দেশের সার্বিক বিকাশ নির্ভর করে না৷ এটা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সাধারণ মানুষের কাছে আর্থিক বিকাশের অলীক গল্প বলার মুখপাত্র মাত্র৷ সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিষয়ে অচেতন দেশবাসীকে বুঝিয়ে দেয়---দেশের উৎপাদন বাড়ছে৷ চাহিদা বাড়ছে বলেই উৎপাদন বাড়ছে, পরিষেবা বাড়ছে, দেশের আয় বাড়ছে---বিকাশ হচ্ছে৷ কিন্তু প্রশ্ণ হচ্ছে জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমজনতার ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে কি? তাদের পরিবারে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছে কি?
ভারত সরকারের আর্থিক চিত্রের পরিসংখ্যানেও স্বচ্ছতার অভাব আছে৷ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF-International Monetary Fund) ভারত সরকারের আর্থিক তথ্য-পরিসংখ্যানের গুনমানকে সি-গ্রেডে রেখেছে৷ আই.এম.এফের সমীক্ষায় প্রকাশ ভারতের পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও হিসাব পদ্ধতিতে দুর্বলতা আছে৷ অর্থাৎ আর্থিক সমীক্ষার কোনো তথ্যই নির্ভুল হয় না--- এতো অর্থনৈতিক নীতি নির্দ্ধারনের গোড়াতেই গলদ৷ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্দ্ধারন করলে সে নীতিও ভুল পথে চলে৷ ফলে আর্থিক পরিকল্পনাও নির্ভুল হয় না৷ ভারতীয় অর্থনীতির আজ সেই দশা৷
এখন হিসাব পদ্ধতিতে দুর্বলতা আছে, না-কি প্রকৃত তথ্য গোপন করা হচ্ছে সে হিসাবে না গিয়ে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থারকাছে একটা সহজ প্রশ্ণ---জি.ডি.পি বাড়লে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রোপো রেট কমালো কেন? জি.ডি.পি বৃদ্ধির কারণ মানুষের ভোগ ব্যয় বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎপাদনও বেড়েছে অর্থাৎ আর্থিক সচ্ছলতা দেখা দিয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে৷
কিন্তু বাস্তব কি তাই! বাজারে চাহিদা বাড়লে, উৎপাদন বাড়ে বিনিয়োগও বৃদ্ধি পায়৷ কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সাধারণত রেপো রেট কমায় যখন বাজারে চাহিদা কম, বিনিয়োগ কম৷ তখন বিভিন্ন সংস্থাকে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে রেপোরেট কমান হয়৷ একই ভাবে জি.ডি.পি বৃদ্ধির সঙ্গে জি.এস.টি কমানোর তাল মিল পাওয়া যাচ্ছে না৷ অর্থাৎ জি.ডি.পি বৃদ্ধির দাবীর সঙ্গে বাজারে আর্থিক অবস্থার চিত্রে গরমিল৷ অর্থাৎ প্রকৃত আর্থিক চিত্র অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে৷
পুঁজিবাদী শোষণের এ এক নোতুন কৌশল৷ জি.ডি.পির ধোঁয়াশায় প্রকৃত আর্থিক চিত্রকে কুয়াশাচ্ছন্ন রেখে জনগণকে আর্থিক বিকাশের গল্প শোণানো হচ্ছে৷ কয়েক বছর আগে অক্সফামের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় দেশের ১ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে দেশের ৭৩ শতাংশ সম্পদ৷ এই আর্থিক বৈষম্যই ভারতীয় অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র৷ জি.ডি.পির যে হিসাব প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকাশ পায় তার সঙ্গে দেশের ওই এক শতাংশ মানুষের সম্পর্ক৷ আর্থিক পরিকল্পনা, আর্থিক বিকাশ এই এক শতাংশের সীমানায় ঘুর পাক খাচ্ছে৷ দেশের অর্ধেকের বেশী মানুষ বেঁচে থাকার নূ্যনতম প্রয়োজনটুকুও পায় না৷ জি.ডি.পির তথ্য পরিসংখ্যানে এদের স্থানও হয় না৷
- Log in to post comments