Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • ভাষা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

কীর্ত্তন, বাউল ও ঝুমুরঃ রাঢ় বাংলার অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক সম্পদ

মনোতোষ মণ্ডল

উৎসব প্রিয় বাঙালির জীবনে সঙ্গীত হচ্ছে--একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ৷ যেমন উৎসববিহীন বাঙালির জীবন অকল্পনীয় ঠিক তেমনি সঙ্গীত বিহীন উৎসবও গুরুত্বহীন৷ এখানে একটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, উৎসবের সম্পর্ক কেবল বহির্জগতের সঙ্গে, কিন্তু সঙ্গীতের সম্পর্ক যতটা বহির্জগতের সঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পর্ক অন্তর্জগতের সঙ্গে৷ কারণ সঙ্গীত মানুষের মনকে লোকায়ত থেকে লোকোত্তরের পানে ছুটিয়ে দেয়৷ 

মনে রাখা উচিত যে, উৎসব মানে কেবল উন্মত্ততা নয়, উৎসব মানে কেবল নববস্ত্রের চাকচিক্য প্রদর্শন নয়, উৎসব মানে কেবল চর্ব্য-চুষ্য ও লেহ্য-পেয় ভক্ষণ করে মাতামাতি করা নয়, উৎসব মানে উৎসব মানে জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি লাভ করা, উৎসব মানে অবসাদগ্রস্ত মানসিকতাকে পুনরায় কর্মচঞ্চল করে তোলা৷ কারণ উৎসব পালনের মাধ্যমে আমরা কর্ম করার নবশক্তি আহরণ করে থাকি৷ অতএব বলা যায় যে, উৎসব পালনের পর মানুষ এক নবজীবনের সন্ধান পায়৷ আর উৎসবের সঙ্গে সঙ্গীতের সংযোজন উৎসবের গুরুত্বকে অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়৷ কারণ সঙ্গীতের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান৷

সঙ্গীত মূলতঃ সংস্কৃত শব্দ৷ অর্থাৎ ‘সম’ পূর্বক ‘গৈ’ ধাতুর উত্তর ‘ক্ত’ প্রত্যয় যোগে সঙ্গীত শব্দটি নিষ্পন্ন৷ গীত মানে গান করা৷ আর সঙ্গীত মানে সম্যকরূপে গান করা৷ অতএব গানের সঙ্গে যখন নৃত্য ও বাদ্য সংযোজিত হয় তখন তাকে বলা হয় -- সঙ্গীত৷ কথায় বলে -- ‘নৃত্য বাদ্য গীত তিনে সঙ্গীত’৷ 

সঙ্গীতের প্রচলন অতি প্রাচীন কাল থেকেই হয়ে এসেছে৷ কিন্তু তারকব্রহ্ম সদাশিব যখন অধ্যাত্ম বিদ্যার প্রচলন করলেন, তখন তিনি সঙ্গীতকেও অধ্যাত্ম সাধনার অভিন্ন অঙ্গ হিসেবেই স্বীকৃতি দিলেন৷ বৈবহারিক জীবনে সঙ্গীত মানুষের মনকে বহির্মুখী করে তোলে কিন্তু আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সঙ্গীত মানুষের মনকে অনেক বেশি অন্তর্মুখী করে দেয়৷ অতএব আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে সঙ্গীতের অতি নিবিড় সম্পর্ক৷

সঙ্গীতের বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, সঙ্গীত মানুষের মনকে হিন্দোলিত করে, আন্দোলিত করে,আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তরঙ্গায়িত করে৷ গানের জগতে ঈশ্বর বিষয়ক গানকে বলা হয়--‘ভজন’৷ ভজনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বর বিষয়ক অনেকগুলো ভাবধারাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষ ভাবধারায় পরিণত করে দিতে পারি৷ কিন্তু প্রত্যেক ভাবধারার মধ্যে পরমপুরুষ সংক্রান্ত যে গান, তাকেই বলা হয় -- ‘কীর্ত্তন’৷ অতএব আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় -- কীর্ত্তন, বাউল ও ঝুমুরঃ রাঢ় বাংলার বাঙালী জনগোষ্ঠীর জীবনে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ভজনের মাধ্যমে আমরা পরপুরুষের সান্নিধ্য লাভ করার চেষ্টা করি, কিন্তু কীর্ত্তনের অভূতপূর্ব ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে পরমপুরুষ স্বয়ং কীর্ত্তনের আসরে পৌঁছে যান৷ কারণ কীর্ত্তনের যে নান্দনিক ভাবধারা, মানুষের মনকে মোহন বিজ্ঞানের মাধুর্যময় ভাবতরঙ্গে তরঙ্গায়িত করে কীর্ত্তনের মণ্ডপেই পরমপুরুষের উপস্থিতি অনুভব করায়৷ তাই কীর্ত্তনের মহিমা প্রসঙ্গে স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু তাঁর প্রিয়তম ভক্ত নারদকে বলেছেন:--

*‘নাহং তিষ্ঠামি বৈকুণ্ঠে যোগীনাং হৃদয়ে ন চ৷*

 *মদ্ভক্তাঃ যত্র গায়ন্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদ৷৷’*

অর্থাৎ ভক্ত মণ্ডলী যেখানে সম্মিলিত ভাবে পরমপুরুষের কীর্ত্তন করেন সেখানে তিনি স্বয়ং পৌঁছে যান৷ 

উচ্চৈঃস্বরে পরমপুরুষের গুণগান করার নাম -- কীর্ত্তন৷ সংস্কৃতে ‘কীত্ত’ ধাতুটার মানে হচ্ছে -- জোরে জোরে ঈশ্বরের গুণগান করা অর্থাৎ সম্মিলিত ভাবে জোর গলায় সিদ্ধমন্ত্র জপ করা৷ আর এই ভাবে কীর্ত্তন করলে যাঁরা কীর্ত্তন করেন তাঁরা অবশ্যই লাভবান হন ও যারা শ্রদ্ধা সহকারে অথবা অবহেলা ভরে কীর্ত্তন শুনলেও তাঁরা অবশ্যই লাভবান হন৷ 

রক্তমৃত্তিকা রাঢ়ভূমিতেই কীর্ত্তনের জন্ম৷ আর রাঢ়ের এই কীর্ত্তন মূলতঃ বাউল-আশ্রয়ী৷ অর্থাৎ আমরা বলতে পারি -- বাউল গানকে আশ্রয় করেই রাঢ়ীয় সমাজে কীর্ত্তনের উদ্ভব৷ অতএব কীর্ত্তন আলোচনা প্রসঙ্গে বাউল সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়৷ 

সংস্কৃতে এলোমেলো ভাবসম্পন্ন মানুষদের বলা হয় -- ‘বাতুল’৷ এই বাতুল শব্দ থেকেই ‘বাউল’ শব্দের উৎপত্তি৷ অর্থাৎ বাউল মানে এমন একজন মানুষ যিনি অজানাকে জানার জন্য, অচেনাকে চেনার জন্য ও দুর্লভকে লাভ করার জন্য তাঁর মনের সমস্ত আকুতিকে পরমপুরুষের দিকে ছুটিয়ে দিয়েছেন৷ সুতরাং অন্যান্য পাঁচ জনের দৃষ্টিতে -তিনি বাউল নামেই পরিচিত৷ বাউলের আধ্যাত্মিক ভাবধারা পরিলক্ষিত করে জনৈক বাউল ভাবাশ্রয়ী কবি লিখেছেন --

*কাল সমুদ্রের তীরে তারই প্রতীক্ষায়, আছি যুগ ধরি৷*

 *ভাঙ্গি আর গড়ি ঘর, শুধু বালুকায়, দিবস শর্বরী৷৷’*

 কবি আবার বললেন --

‘তিক্ত জলসিক্ত আঁখি, রিক্ত বুক মোর,

তবু আছি জাগি, দুর্লভের লাগি৷’

অতি দুর্লভকে লাভ করার এই মহতী উদ্যোগের পথ ধরেই একজন বাউলের জীবন যাত্রা শুরু হয়, আর অজানা পথিকের কৃপা লাভের পরেই যাত্রার সমাপ্তি ঘটে৷ কারণ একজন বাউলের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য -- পরমাসম্প্রাপ্তি৷ বাউলের জীবন সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন --- ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে৷’

 রবীন্দ্রনাথ রচিত এই গানটিতে তাঁর জীবনে বাউল মানসিকতা প্রসূত ভাবধারা সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়৷ তাই তৎকালীন সময়ের প্রবীণ বাউলেরা রবীন্দ্র সংগীত শোনার পর বলতেন -- এটা তো রবি বাউলের গান৷ 

উপরিউক্ত গানটি থেকে একটা কথা স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, বাউল গানের জন্ম অবশ্যই লাল মাটির দেশে অর্থাৎ রক্তমৃত্তিকা রাঢ়ভূমিতেই৷ সাধারণ ভাবেই বাউল সম্প্রদায়ের লোকজনেরা সাংসারিক বন্ধনের মায়ামোহ ত্যাগ করে একতারা হাতে গান গাইতে গাইতে পরমপুরুষের সন্ধানে বেরিয়ে যেতেন আর গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ও দূর থেকে দূরান্তে পৌঁছে যেতেন লাল মাটির পথ ধরে৷ তাঁরা ছিলেন -- অল্পে সন্তুষ্ট৷ তাই দিন ভিক্ষা করে যতটুকু অন্ন সংগ্রহ করতে পারতেন তাতেই আনন্দ সহকারে জীবন যাপন করতেন৷ অসীমের আকর্ষণে আকর্ষিত হয়ে এঁরা সসীমের মায়ামোহ ত্যাগ করে রাঙা মাটির পথ ধরে অসীমের খোঁজে এগিয়ে যেতেন৷ কোন রকম জাগতিক বন্ধন এঁদেরকে সংসার জালে আটকে রাখতে পারে নি৷ তাই তারা ছিলেন -- গৃহত্যাগী বাউল, সর্বত্যাগী বাউল৷ 

বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ও সত্যদ্রষ্টা ঋষি শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার তাঁর রচিত ‘সভ্যতার আদি বিন্দু রাঢ়’ গ্রন্থে রাঢ়ের বাউল সম্পর্কে বলেছেন---

‘অসীমের জন্য তার এই যে ব্যাকুলতা, এই যে মার্মিক আকুলতা, তাই তাকে পাগল করে তুলেছিল৷ এই বাতুলতাই সৃষ্টি করেছিল বাউল মার্গ -- বাউল আদর্শ -- বাউল সঙ্গীত৷ বাউল ভাবের সর্বত্র একটাই সুর -- একটাই মূর্ছনা৷ তাই তো তা বাজানো হয় ওই একটি তারে -- একতারাতে৷’

 তাই বাউল আশ্রয়ী ভাবধারার একটাই কথা -- 

‘একমনে তোর একতারাটি একটি সুরে বেঁধে রাখিস৷’

এই হলো বাউলের গোড়ার কথা ও শেষ কথা৷ পরবর্তীতে এই রাঢ়ের লালমাটিতেই বাউলকে কেন্দ্র করে কীর্ত্তনের আবির্ভাব৷ কীর্ত্তন প্রেরণা পেয়েছে -- বাউল গানকে আশ্রয় করেই৷ কীর্ত্তনকে পরিভাষিত করতে গিয়ে জগদগুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্তিজী বলেছেন--‘ঈশ্বরান্বেষণে মানুষের যে ছন্দায়িত গতিরুন্মেষ তাই হলো কীর্ত্তন৷’*

আজকের পরিপ্রেক্ষিতে যদিও ভারত সহ অন্যান্য অনেক দেশেই কীর্ত্তনের প্রচলন আছে কিন্তু রাঢ়ীয় কীর্ত্তনের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে -- বাউল আশ্রয়ী সঙ্গীতের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে পদাবলী সৃষ্টি করা৷ পদাবলী কীর্ত্তন রচয়িতা জনৈক পদকর্তা লিখেছেন:--

‘সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম, কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো -- আকুল করিল মোর প্রাণ৷’ 

রাঢ়ের বাউল আশ্রয়ী কীর্তনের বৈশিষ্ট্য -- এই কীর্তন মানুষের মনকে লোকায়ত থেকে লোকোত্তরের পানে এগিয়ে দেয়৷ অর্থাৎ অসীমের মায়া বন্ধন এঁদেরকে সংসার জালে আটকে রাখতে পারে না৷ 

মহান ভাষা তাত্ত্বিক ও তত্ত্বদ্রষ্টা দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর রচিত ‘সভ্যতার আদি বিন্দু রাঢ় গ্রন্থে’ আবার বলেছেন:--

‘রাঢ়ের কীর্ত্তনের অনবদ্যতা ও লোকোত্তর মাধুর্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে এই যে, রাঢ়ের কীর্ত্তন বাউলের ভাবধারায় প্রেষিত৷ রাঢ়ের বাউল আশ্রিত কীর্ত্তন মনোগত ও আত্মগত৷ তাই রাঢ়ের কীর্ত্তন মানুষের মনকে যে শুধু অভিভূতই করে তা নয়, মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে৷ নন্দন বিজ্ঞানের কীর্ত্তন মানুষের মনে মোহন বিজ্ঞানের অনুভূতি ঘটায়৷ রাঢ়ের কীর্ত্তন তাই নিছক সাঙ্গীতিকী নয়, এ কীর্ত্তন সীমিত মানবত্বের গায়ে অসীম অনন্তের দোলা লাগিয়ে দেয়, ঘরের মানুষকে সুদূর নীলিমার আহ্বান শুনিয়ে দেয়, তাই এ অনবদ্য -- আলোক সামান্য৷’

কীর্ত্তন ও বাউলের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে গিয়ে বাংলার স্বনামধন্য কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন -- 

*‘কীর্ত্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি৷*

*‘মনের গোপনে নিভৃত ভবনে দ্বার ছিল যতগুলি৷৷’*

রাঢ় বাংলার মাটিতে কীর্ত্তন হচ্ছে-- এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক সম্পদ যার বিস্তার রাঢ়ের বাইরের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করলেও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মনকে ততটা প্রভাবিত করতে পারে নি, যতটা প্রভাবিত হয়েছে -- রাঢ়ের মানুষের মন৷ যেহেতু কীর্ত্তন বাউল আশ্রয়ী,সুতরাং বাউলকেও আমরা কীর্ত্তন থেকে খুব বেশি আলাদা করে ভাবতে পারি না৷ কিন্তু কীর্ত্তন আর বাউলকে বাদ দিলেও গ্রাম বাংলায় রাঢ়ীয় সংস্কৃতির একটা বিশেষ নিদর্শন -- ঝুমুর সঙ্গীত৷ এই ঝুমুর সঙ্গীত বাংলা সাহিত্যের এমন একটা অঙ্গ যা সামাজিক হিত ও অহিতের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক না রেখেই গ্রাম বাংলার মানুষকে বিভিন্ন উৎসব ও পূজো-পার্বণে আনন্দ প্রদান করে চলেছে৷ এখানে একটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, উৎসব পালনের ক্ষেত্রে কীর্ত্তন ও বাউলের অনুষ্ঠান যতটা ব্যয়বহুল তার তুলনায় ঝুমুর গানের আয়োজনে অনেক কম খরচ পড়ে৷ তাই যে সব গ্রামে বা পাড়ায় গরীব মানুষের সংখ্যা অধিক সেখানকার লোকেরা অতি অল্প ব্যয়ে ঝুমুর গানের আয়োজন করে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করে৷ অবশ্য এটাও স্পষ্ট যে, দিন প্রতিদিন ঝুমুর গানের লোকপ্রিয়তা হ্রাস পেতে শুরু হয়েছে৷ তবুও ঝুমুর গানকে অবহেলা করা যায় না৷ কারণ ঝুমুর গানের মধ্যেও বহু রচয়িতার নাম লুকিয়ে আছে৷ 

ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত দেওঘর নিবাসী ভবকৃতানন্দ ওঝা ছিলেন--একজন বিশিষ্ট ঝুমুর সঙ্গীত রচয়িতা৷ ধানবাদ জেলান্তর্গত কাতরাস নিবাসী পচাই শেখের নামও এখানে উল্লেখ্য৷ এই হলো রাঢ়ের মূল সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ কিন্তু এত কথা বলার পর রাঢ়ের অবস্থিতি ও পরিচিতি সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা না করলে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে৷ তাই এই সম্বন্ধে অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিতে বাধ্য হলাম৷ 

রাঢ় এমন একটা ভূখণ্ডের অংশ যার উদ্ভব হয়েছে -- প্রায় ত্রিশ কোটি বছর আগে৷ অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হিমালয় উদ্ভূত হওয়ার বহু কোটি বছর আগে৷ আজ থেকে প্রায় পনের শ’বছর আগে প্রাচীন বাংলার নাম ছিল -- *গৌড়দেশ*৷ গৌড়দেশকে অনেকেই পঞ্চগৌড় বলে থাকেন৷ কারণ এই গৌড় দেশের সঙ্গে পাঁচটি আলাদা আলাদা ভূখণ্ড সংযোজিত ছিল৷ এই গুলোর নাম ছিল নিম্নরূপ -- ১৷ বৃহত্তম ভূখণ্ডটির নাম ছিল -- রাঢ়দেশ ওরফে লাল মাটির দেশ৷২৷ সমতট ( বর্তমানে দক্ষিণ বঙ্গ)৷ ৩৷ বঙ্গ ডবাক ৪৷ বরেন্দ্র ও ৫৷ মিথিলা৷ রাঢ়কেও দুভাগে ভাগ করা হয়েছে৷ (ক) পূর্ব রাঢ় ও (খ) পশ্চিম রাঢ়৷

পূর্ব রাঢ় বলতে বুঝায় -- ১৷ পূর্ব মুর্শিদাবাদ ২৷ বীরভূম জেলার উত্তরাংশ ৩৷ পূর্ব বর্ধমান ৪৷ সমগ্র হাওড়া জেলা ৫৷ সম্পূর্ণ হুগলি জেলা ৬৷ পূর্ব মেদিনীপুর ও ৭৷ বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস থানা৷

পশ্চিম রাঢ়ের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম বঙ্গের নিম্নলিখিত জেলা সমূহ:-- ১৷ বীরভূমের দক্ষিণাংশ ২৷ পশ্চিম বর্ধমান ৩৷ ইন্দাস থানা বাদে বাঁকুড়া জেলা ৪৷ সমগ্র পুরুলিয়া জেলা ৷ 

এর দ্বিতীয় ভাগে আছে :-- ১৷ ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত সাঁওতাল পরগণা বিভাগের (দুমকা,দেওঘর, পাকুড়, গোড্ডা, জামতাড়া, ও সাহেবগঞ্জ জেলার কিয়দংশ) ২৷ সমগ্র ধন্যবাদ জেলা ৩৷ সম্পূর্ণ বোকারো জেলা ৪৷ রামগঢ় জেলার রামগঢ় ও গোলা ব্লক৷ ৫৷ পূর্ব সিংহভূম ও সরাইকেলা জেলা৷ ৬৷ রাঁচি জেলার অন্তর্গত সিল্লি, সোণাহাতু, বুন্দু ও তামাড় ব্লক৷ 

কিন্তু দুঃখের বিষয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বাঙালী জনগোষ্ঠী হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের প্রশাসনিক চাপে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে৷ কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের দালালে পরিণত হয়েছে৷ সুতরাং ঝাড়খণ্ড রাজ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সমস্ত বাঙালী এক হউন--এই আশা নিয়েই আজকের প্রবন্ধ রচনার ইতি টানছি৷

 

  • Log in to post comments
Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved