গণতন্ত্রের বেদিতে স্বৈরাচারী দানবীয় শক্তির দাপট৷ এ রাজনীতি বাঙলার নয়৷ বাঙালী এ রাজনীতির বলি, বাঙালী এ রাজনীতির শিকার৷ এ রাজনীতির উত্থান পশ্চিম ভারত থেকে আরো স্পষ্ট করে বললে গুজরাট থেকে৷ এ রাজনীতির প্রথম বলি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু৷ কসাইয়ের ভূমিকায় ছিলেন অহিংসার পূজারী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী৷ ১৯৩৯ সাল, জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন৷ দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি হতে প্রস্তুত সুভাষচন্দ্র বসু৷ কিন্তু গান্ধী নারাজ! কারণ দেশীয় পুঁজিপতিদের পছন্দ নয় সুভাষচন্দ্র বসু৷ তার কি কারণ! ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র বসু লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সামনে বলেছিলেন--- দেশীয় পুঁজিপতিরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কে শক্তি জোগাচ্ছে৷ আমাদের এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন নয়, মানুষকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে৷
সুভাষ চন্দ্রের এই ভাষণে দেশীয় পুজাপতিদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল৷ সেদিন থেকেই চক্রান্ত শুরু হয়েছিল সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে সেই সঙ্গে বাঙলার বিরুদ্ধেও৷ কারণ শুধু সুভাষচন্দ্র নয়, এই জাতি টাকে বিশ্বাস করা যায় না৷ এরা কারো পদানত হয়ে থাকতে চায় না৷ ব্যতিক্রম দু’’চারজন ছিল, থাকেই কারণ নরেন গোসাইদের জন্ম এই বাঙলাতেই হয়েছিল৷ তবু দুচারটে নরেন গোসাই এর উপর ভর করে এই দস্যু দামালদের দমন করা সম্ভব নয়৷ তাই এদের বিনাশ করে দেয়াই ভালো৷
শুরু হলো চক্রান্ত৷ এই ভয়ংকর মানুষটাকে কিছুতেই আর কংগ্রেস সভাপতি হতে দেওয়া যায় না৷ সুভাষচন্দ্র অনড়, স্বাধীনতার বেদিমূলে উৎসৃষ্ট জাতীয় কংগ্রেসকে কিছুতেই দেশীয় পুঁজিপতিদের গোলাম করে রাখা যায় না৷ কিন্তু গান্ধী যে দেশীয় পুঁজি পতিদের বড় আদরের মোহন, অহিংসার পূজারী! তাই আসরে নামলেন জাতীয় কংগ্রেসের মুকুটহীন সম্রাট মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী৷ সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে গান্ধী মনোনীত প্রার্থী হলেন পট্টভি সীতারামাইয়া৷ সভাপতি নির্বাচনে জয়ী হলেন সুভাষচন্দ্র৷ শুরু হলো স্বৈরাচারী নিকৃষ্ট রাজনীতির খেলা৷ সুভাষচন্দ্র কে উৎখাত করতে হবে কংগ্রেস থেকে৷ জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী ভক্তরা আওয়াজ তুললেন --- হিন্দুস্থান কি হিটলার মহাত্মাজি কি জয়৷ কিছুতেই সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস ওয়ার্কিং বোর্ড গঠন করতে দিল না গান্ধী৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীকে পত্র লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বসে ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করে নেয়ার জন্য৷ কাকস্য পরিবেদনা! বিশ্বকবির পত্রকেও আমল দিল না দেশীয় পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি গান্ধী৷ লজ্জায় ঘৃণায় কংগ্রেস সভাপতি পদ ত্যাগ করলেন সুভাষচন্দ্র৷
শান্তিনিকেতন থেকে বিশ্বকবি এক ঐতিহাসিক পত্র লিখলেন সুভাষচন্দ্র কে -------‘সুভাষচন্দ্র,বাঙালি কবি আমি বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি৷ সেই পত্রের ছত্রে ছত্রে তিনি লিখেছিলেন--- আত্মীয় পরের হাতে বাঙালিকে অশেষ লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে...... আজ চারিদিকে দেখতে পাই বাংলাদেশের অকরুন অদৃষ্ট তাকে প্রশ্রয় দিতে বিমুখ এই বিমুখাকে অবজ্ঞা করেই সে যদি দৃঢ় চিত্তে বলতে পারে আত্মরক্ষার দুর্গ বানাবার উপকরণ আছে আপন চরিত্রের মধ্যেই --- বাধ্য হয়ে যদি সেই উপকরণকে রুদ্ধ ভান্ডারের তালা ভেঙে সে উদ্ধার করতে পারে--- তবেই সে বাঁচবে৷ হিংস্র দুঃসময়ের পিঠের ওপর চড়েই বিভীষিকার পথ উত্তীর্ণ হতে হবে.....৷
দুঃসাধ্য অধ্যাবসায়ে দুর্গম লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছাবই যদি আমরা মিলতে পারি৷ আমাদের সকলের চেয়ে দুরূহ সমস্যা এখানেই৷ কিন্তু কেন বলব যদি, কেন প্রকাশ করব সংশয়৷ মিলতেই হবে , কেননা দেশকে বাঁচাতেই হবে৷ বাঙালি অদৃষ্ট কর্তৃক অপমানিত হয়ে মরবে না.... সাংঘাতিক মার খেয়েও বাঙালি মারের উপরে মাথা তুলবে৷ ’
সেদিন মাথা তুলতে পারেনি বাঙালি জাতীয় কংগ্রেসের চরম বিশ্বাসঘাতকতায়৷ সুভাষচন্দ্র হারিয়ে গেলেন, ব্রিটিশের কাছ থেকে ভিক্ষালব্ধ স্বাধীনতা এলো দেশ ভাগ করে৷ ভাগ হলো পাঞ্জাব ভাগ হলো বাংলা৷ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত পাঞ্জাবি উদ্বাস্তুরা পুনর্বাসনের সমস্ত প্রকার সুযোগ সুবিধা পেলেন প্রাপ্যের অনেক বেশি পেয়ে৷ আর বাঙালি সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হল৷ নতুন করে উপনিবেশিক শিকারের বলি হল বাঙালি৷ পাঞ্জাবের কংগ্রেস সরকার যেভাবে পাঞ্জাবের সমস্যার সমাধান করলো নেহেরুর বিশেষ বন্ধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় তার ছিটেফোটাও করল না৷ বাংলার সর্বনাশ করে দিয়ে গেলেন বিধানচন্দ্র রায়৷ সেদিন যদি বিধান চন্দ্র রায় পাঞ্জাবের সমতুল্য দাবি তুলে বাঙালি উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান করে যেতেন তাহলে আজ আবার বাঙালিকে বলি হওয়ার জন্য এস আই আর নামক হাড়ি কাঠের সামনে দাঁড়াতে হতো না৷
আজ সত্যিই বাঙালির সামনে হিংস্র দুঃসময়! কসাইয়ের ভূমিকায় পশ্চিম ভারতের সেই একই ভূমির মানুষ! আজ ষড়যন্ত্র অনেক অনেক গভীর৷ শুধু বাঙালি জাতিটাকে উৎখাত করা নয় বাংলার ভূমিটাকেও দখল করে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের নীল নকশা তৈরি করেছে বিজেপি নামক বাঙালি বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক শক্তি৷ বাঙালি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অশুভশক্তিকে বিনাশ করতে না পারে তবে ভারতে বাঙালি জাতিটাই বিনাশ হয়ে যাবে৷
‘মারের ওপর বাঙালি মাথা তুলবে’ বিশ্বকবির এই আশীর্বচন মাথায় নিয়ে সঙ্ঘবদ্ধ হোক বাঙালি বিদ্রোহী কবির সংকল্পে----’
এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির আমাদের,দিয়ে প্রহারেন ধনঞ্জয় তাড়াবো আমরা করিনা ভয় যত পরদেশী দস্যুদের, রামাদের গামাদের৷ বাংলা বাঙালির হোক বাংলার জয় হোক৷
- Log in to post comments