একই পৃথিবী গ্রহের অধিবাসীদের অবশ্যই সৌভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বৈকতাবোধে উদ্বুদ্ধ হতেই হবে৷ কারণ একই চন্দ্র সূর্য্য আমাদের পরম বন্ধু, সেই একই জল ও বাতাস আমাদের জীবন৷ আমাদের একই ভাবনা চিন্তা–কেমন করে আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজন, পুত্র কন্যা স্ত্রী ও বাবা মাকে নিয়ে একটু সুখে বাঁচতে পারি৷ হয়তো ভৌগোলিক পরিবেশে আমাদের গায়ের রং আলাদা, আমাদের খাদ্যাভ্যাস পৃথক আর ভাবপ্রকাশের ভাষা পৃথক৷ কিন্তু সকলেই আমরা মানুষ৷ বাইরের পার্থক্যটা নিছক বাইরের কিন্তু ভিতরের রক্তের রঙ সকলেরই লাল৷ মানুষ সমাজবদ্ধ জীব৷ একা থাকতে পারে না৷ একা বাঁচার জন্য যা যা প্রয়োজন তা এককভাবে তৈরী করাটা সম্ভব নয় তাই অপরের সাহায্য অবশ্যই প্রয়োজন হয়৷ বেঁচে থাকার জন্যে যা যা প্রয়োজন পৃথিবী আমাদের সকলকেই দিয়েছেন৷ ভৌতিক জগতে ভোগ্যবস্তু উৎপাদন ও বণ্টন তাই এমনটি হওয়া উচিত যাতে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়৷ কিন্তু অদ্যাবধি আমরা যা দেখছি তা হ’ল মুষ্টিমেয় কিছু ব্যষ্টি জগতের অধিকাংশ মানুষের ন্যায্য পাওনাকে অস্বীকার করে সবই আত্মস্যাৎ করে শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে নিজেদের লোভ, লালসা চরিতার্থ করছে৷ আর সেই লালসা যাতে চরিতার্থ করা যায় সেই কারণে নানা মিথ্যা, কল্পিত পাপ–পুণ্য, জাতপাতের ভেদাভেদ সৃষ্টি করে এই সুন্দর বসুন্ধরাকে নরকে পরিণত করে ছেড়েছে৷ সেই শোষণের উপর সমৃদ্ধিটাকেই যুগ যুগ ধরে সামন্ততন্ত্র বুক দিয়ে আঁকড়ে রেখেছে৷ আর এই সামন্ততন্ত্রই পুঁজিবাদকে রক্ষা করতে সামাজিক নিয়ম কানুন বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে তৈরী করে এক ভয়ঙ্কর শোষণের ইমারৎ গড়ে রক্ত মোক্ষণ করে চলেছে হতভাগ্য মানুষের সমাজে আজও৷ এরই বিরুদ্ধে কখনো কখনো শোষিত নিপীড়িতদের প্রতিবাদ হয়েছে কিন্তু সেই প্রতিবাদকে নৃশংসভাবে দমন করেছে ওই শোষক জল্লাদরা৷
এই পৃথিবীর বুকে শোষিত নিপীড়িতদের রক্ষা করতে বহু মানবতাবাদী ধার্মিক ব্যষ্টির আবির্ভাব ঘটেছে৷ তাঁরা সকলেই প্রায় একই বাণী প্রচার করে গেছেন৷ জাতপাতকে, ভেদাভেদকে অধিকাংশ মহাপুরুষ স্বীকার করেন নি৷ কিন্তু তাদের তিরোধানের পরে তাঁদের অনুগামীরা নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্যে দলীয় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে দল–উপদলে বিভক্ত হয়ে লক্ষ্য থেকে সরে উপলক্ষ্যকে আশ্রয় করে সেই শোষণের পথই বেছে নিয়ে সমাজের ক্ষতিই করে চলেছে৷ এর কুফল হ’ল ভোগবাদী মানসিকতা সমাজকে বদ্ধজলাশয়ের মতো গতিহীন করে ছাড়ছে৷ বর্তমানে ভোগবাদী মানুষের ভণ্ডামীর ব্যাপকতা আসল ধর্ম ও মানবতাকে এমন এক পর্যায়ে এনে ফেলেছে যার জন্যে প্রকৃত আদর্শ আজ পুঁথির পাতায় আটকে আছে৷ তারা জড়বাদী ভাবনা–চিন্তা ও ভোগবাদী প্রবণতাকে উস্কে দিয়ে তামসিকতা বাড়িয়ে দিচ্ছে সমগ্র বিশ্বে৷ এটাকে বলে ধর্মের গ্লানি৷ এই গ্লানি দূর করার শক্তি সাধারণ মানুষের নেই৷ মহাশক্তিশালী মহামানবই পারেন অধঃপাতিত সমাজকে উদ্ধার করতে৷ এই মহান উদ্দেশ্যকে সার্থক করতে যিনি আধুনিক যুগে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং সারাটি জীবন মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন তিনি হলেন আনন্দমার্গ গুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী৷ তিনি মানবজীবনকে আধ্যাত্মিক ভাবধারায় পরিপুষ্ট করে সকলকে নিয়ে এগিয়ে চলার মহৎ আদর্শের কথা বলে গেছেন৷ তাঁর নির্দেশ হলো প্রতিটি মানুষকে সার্বিক বিকাশের পথে নিয়ে যেতে হবে৷ কেউ যেন বঞ্চিত না হয়৷ শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক পথের পথিকদের শোষণ মুক্তির আন্দোলন করতে হবে৷ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ত্রাণ সামগ্রী দিতে হবে৷ কিন্তু এটা শুধু করলে চলবে না৷ তাদের পরিত্রাণের পথ দেখাতে হবে৷ যাতে তারা বিপদে বার বার ত্রাণের জন্যে অপেক্ষা না করে৷ পরিত্রাণের কারণেই মহাসম্ভূতির আবির্ভাব ঘটে জগতে৷ পরিত্রাণের জন্যে তিনি মানব রূপ ধারণ করে কখনো কখনো এসে থাকেন৷ আর তাঁর সহচর হিসাবে কিছু মানুষ উন্নত ভাবনা চিন্তায় প্রেষিত হয়ে আসেন তাঁর লক্ষ্যকে উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে৷ সেই কারণেই শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী (শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার) অনুভব করেন যে মানুষের ন্যুনতম প্রয়োজনটুকু যদি না পূরণ হয় তা হলে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে মানুষের আসাটা ব্যাহত হয়৷ তাই তিনি প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব (প্রাউট) দর্শন দিয়ে গেলেন মানব সমাজের সার্বিক কল্যাণে৷ তাই এই প্রাউট দর্শন হলো শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানব সমাজের সর্বরোগহর বিশল্যকরণীর মতো মহৌষধ৷ তাই আজকের সমাজের সকল জাগতিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো প্রাউট দর্শনের প্রতিষ্ঠা৷ প্রাউট দর্শনের মূল কথা হলো বাঁচ আর অপরকে বাঁচতে দাও৷ সকল প্রকার শোষণের বিরুদ্ধেই আন্দোলনের ডাক প্রাউটের৷ শুধু আন্দোলনে কাজ হবে না তাই প্রয়োগভৌমিক ক্ষেত্রে প্রাউট তার চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করেছে প্রগতিশীল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে৷ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রাউট নাড়া দিয়ে গেছে এবং সমস্যা সমাধানের সুষ্ঠু পথের সন্ধান দিয়েছে৷ কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নন্দন বিজ্ঞান, ভোগ্যবস্তুর উৎপাদন, বন্টননীতি–সকল বিষয়েই তিনি পথের সন্ধান দিয়েছেন৷ অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান–এর সম্বন্ধে তিনি যেমন আলোচনা করেছেন ঠিক তেমনই অধ্যাত্ম বিজ্ঞানকে উজার করে দিয়ে গেছেন সকল মানব সমাজের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের উদ্দেশ্যে৷ যেমন জাতপাত, রং, ভাষা, অনান্য পার্থক্য কোন রূপ বাধা দিতে পারবে না৷
বর্তমান পৃথিবীতে শুধু চলছে রেসারেসি, মারামারি, কাটাকাটি, আর চরম শোষণ ও বঞ্চনা৷ এটাকে উৎসাহিত করছে ধনতন্ত্র ও জড়বাদী সাম্যবাদী চিন্তাভাবনা৷ প্রাউট প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রের বার্তাবহন করে আনছে৷ সমগ্র বিশ্বের মানব সমাজকে ‘সংগচ্ছধ্বং’ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়েই একই সঙ্গে এগুতে হবে নচেৎ চরম বিপর্য্যয় সুনিশ্চিত৷ তাই মানুষের সমাজকে কালক্ষেপ না করে আনন্দমার্গের মহান আদর্শকে সাদরে গ্রহণ করে এগিয়ে যেতেই হবে৷ এটা যতো তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল৷
আনন্দমার্গের মূল বক্তব্য হ’ল বিশ্বের সকল জীব, জন্তু, গাছপালা যেন নিরাপদে বিকশিত হয়ে জগতের কল্যাণ করে যেতে পারে সেদিকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সমাজকে লক্ষ্য রাখতে হবে নিজেদের সার্বিক বিকাশের সাথে সাথে৷ কারণ জগতের স্রষ্টা সেই সৎ–চিৎ–আনন্দম্ পরমব্রহ্ম জগতের সৃষ্টি করেছেন৷ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে রক্ষার জন্যে৷ তাই জগৎ হ’ল এক আনন্দ পরিবার যার সর্বময় কর্ত্তা হলেন সেই বিরাট পরমপুরুষ৷ তাই দেরি ন
া করে হাতে হাত ধরে সকলকে নিয়ে এগিয়ে চলার আহ্বান যিনি দেন তাঁর নির্দ্দেশ যারা অমান্য করে বিপথগামী হয়ে চলেছে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার৷ তাই মানুষের সমাজগুলি মিথ্যা বিভেদ সৃষ্টি করে, বিদ্বেষ অন্তরে পুষে যেন নিজেদের ধবংসকে ত্বরান্বিত না করে৷
- Log in to post comments