সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের অন্তর্দন্দ্বের শিকার হয়েছিলেন আপাতদৃষ্টিতে ইতিহাস তাই বলে৷ কিন্তু পেছনে ছিল দেশীয় পুঁজিপতিদের গভীর ষড়যন্ত্র৷ কারণ সুভাষচন্দ্র শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও চেয়েছিলেন
ভোট পরবর্তী পরিস্থিতিতে মমতা ব্যানার্জিও আপাত দৃষ্টিতে তৃণমূলের অন্তর্দন্দ্বের শিকার৷ অভিষেক ব্যানার্জি অবশ্যই একটা কারণ, তবে সেটা অজুহাত৷ ১৫ বছর ক্ষমতার মধু পান করতে করতে রাজনীতির লক্ষ্য উদ্দেশ্যটাই যারা ভুলে গিয়েছিল তাই আজ অসাম্প্রদায়িক মানুষের ভোটে জিতে সাম্প্রদায়িক শক্তি চরণে আশ্রয় নিয়েছে৷ কারণ ওখানে ক্ষমতার মধু পান করতে না পারলেও ছিটে ফোঁটা লেহন অন্তত করা যাবে৷
দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অন্য দলের আয়ারাম গয়ারামদের ঢালাও ভাবে দলে ঢুকিয়ে নেওয়া৷ ২০০ পারের স্বপ্ণটা না দেখলেও চলত৷ তবে এসবই গৌণ কারণ৷ এগুলো না ঘটলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে সরানোর অন্য পরিস্থিতি তৈরি করা হতো৷ কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্রোতের বিপরীতমুখী রাজনীতি, যা দেশীয় পুঁজিপতিদের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছিল৷ ভারতীয় রাজনীতিতে দেশীয় পুঁজিপতিদের তৈরি বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে রাজনীতি করার সাহস প্রথম দেখাতে পেরেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ তিনি পষ্টই বলেছিলেন দেশীয় পুঁজিপতিরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি যোগাচ্ছে৷ সুভাষ চন্দ্রের শেষ পরিণতি আজও তাই অজ্ঞাত৷
কেউ যেন মনে করবেন না আমি সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মমতাকে তুলনা করছি৷ সুভাষ চন্দ্রের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি তাছাড়া বংশ মর্যাদা ( এই প্রসঙ্গটা এই কারণে আনলাম কারণ আমাদের দেশের তথাকথিত উচ্চ শ্রেণীর বাবুরা একটু এসব বিচার করেন ) কোন দিক দিয়েই মমতার সঙ্গে তুলনা চলে না৷ তবে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতি করতে করতেই হারিয়ে গেছেন৷ স্বাধীন দেশে প্রশাসনের মাথায় বসে গুরুদায়ীত্বের বোঝা তাকে বইতে হয়নি৷ দেশীয় পুঁজিপতিদের তৈরী বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে রাজনীতি করার সাহস সেদিন কম্যুনিষ্টরাও দেখাতে পারেনি৷তাদের পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা ছিল মুখোশ মাত্র৷ অবশ্য আজও তাই আছে৷
স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে পুঁজিবাদের তৈরি বৃত্তের বাইরে এসে রাজনীতি করার সাহস একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন৷ প্রান্তিক মানুষের হাতে আর্থিক স্বচ্ছলতা তুলে দেওয়া দেশীয় পুজিপতি ও বড়লোক বাবুদের মোটেই পচ্ছন্দ নয়৷ সেই অপচ্ছন্দের কাজটাই মমতা করছিলেন৷অপরদিকে দিল্লির শাসক পুজিপতিদের জন্যে দরাজহস্ত৷ রাজ্য প্রশাসন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপসারণের আসল কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে৷ বাকি কারণগুলো নাটক৷ এই ধরনের দুর্নীতিতে ডাবল ইঞ্জিন সরকার ও তাদের দিল্লির মাথাও অনেক অংশে জড়িয়ে আছে৷ শক্তির মদমত্ততায় তা সাময়িক ঢাকা থাকতে পারে কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে নয়৷
সুভাষচন্দ্রকেও সেদিন নানাভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল৷ যারা করেছিল তারাই আজ সুভাষচন্দ্র কে নিয়ে বেশি নাচে৷ কারণ সুভাষচন্দ্র আজ আর দেশীয় পুঁজিপতিদের কাছে বিপদজনক নয়৷ তবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক দুর্যোগে পুঁজিপতিদের ইমারত ভেঙে পড়ার দিন এগিয়ে আসছে৷ বিকল্প বিকেন্দ্রিত অর্থনৈতিক শক্তির জাগরণ শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ মমতা ব্যানার্জীর সামাজিক প্রকল্প গুলো নিয়ে বিরোধী বিজেপি নেতারা এভাবে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ কটুক্তি করেছিল, আজ কিন্তু ক্ষমতায় বসে এই প্রকল্পগুলি আঁকড়ে ধরতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের৷ প্রান্তিক মানুষের হাতে সচ্ছলতা এনে দেয়ার যে দরজা মমতা ব্যানার্জি খুলে দিয়ে গেছে, তাকে নিয়ে যতই সমালোচনা হোক, ক্ষমতায় বসে সে দরজা বন্ধ করার সাহস বিজেপিও দেখাতে পারল না৷ হেরেও মমতা ব্যানার্জি জিতে গেলেন৷
- Log in to post comments