স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচন হলো না৷ আসলে নেহেরু থেকে নরেন মোদি কোন সরকারই নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের সত্য উদ্ঘাটন করতে চান না৷ ৭৮ বছরে দেশের শাসক পাল্টেছে, রাজনীতির রং পাল্টেছে গিরগিটি সম, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত সর্বশ্রেষ্ঠ দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান রহস্যের উন্মোচনে সব পক্ষ এক পক্ষ হয়েই রয়ে গেল৷ সব পক্ষ মানে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান নিয়ে নানা গোষ্ঠী নানা ধরণের মত প্রকাশ করে চলেছেন৷ কারও মতে নেতাজী তাইহুকু বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, অনেকেই তা বিশ্বাস করেন না, আবার নানা জনের, নানা গোষ্ঠীর নানা মত৷ কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো তাইহুকু বিমান দুর্ঘটনা বিশ্বাস করার মতো কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য আজ পর্যন্ত কোন পক্ষই দিতে পারে নি৷ কিন্তু সবপক্ষই নেতাজীকে নিয়ে বিভ্রান্তমূলক প্রচার করে চলেছে৷ সবারই উদ্দেশ্য কী আসল সত্য আড়াল করা?
এই সুযোগ নিয়ে নানা গোষ্ঠী আবার সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে রাজনীতির কারবারে নেমে পড়েছে৷ কেউ প্রচার করেছে-অমুক বাবা নেতাজী, নেতাজীকে ওখানে দেখা গেছে, ওই ছবির উনি নেতাজী, এক মহারাজতো নিজেকে নেতাজীর সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে প্রচার করে, নেতাজী ওই এলো বলে অপেক্ষা করেছিলেন৷ তার অপেক্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু নেতাজীর ফিরে আসা হয়নি৷
এই সব থেকে একটা কথা স্পষ্ট---নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের প্রকৃত সত্য গোপন করতে ও নেতাজীর স্বপ্ণের স্বাধীনতার ভাবনা থেকে জনগণকে দূরে রাখতেই এই সব বিভ্রান্তমূলক প্রচার৷ এখানেই সবপক্ষ একপক্ষ হয়ে আছে৷ দিল্লির সিংহাসনে শাসক পাল্টালেও, রাজনৈতিক মতের ও পথের ভিন্নতা থাকলেও নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য প্রকাশ্যে আনা নিয়ে সব শাসকের এক ‘রা’---‘অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে৷’’ এ কেমন স্বাধীন দেশ?
নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে যে যার মত আঁকড়ে ধরে থাকুন, কালের অমোঘ নিয়মে সত্য একদিন প্রকাশ পাবেই কিন্তু দেশের ও দেশবাসীর কল্যাণে সুভাষচন্দ্রকে পঞ্চভৌতিক দেহে আর কি পাশে পাওয়া যাবে! এখানেই একটা প্রশ্ণ--- যে সব নেতাজী ভক্ত (!) নেতাজী প্রেমিক (!) নেতাজী পাগল ৭৮ বছর ধরে তাইহুকু বিমান বন্দর থেকে গুমনামী বাবা, শাহনওয়াজ থেকে মুখার্জী কমিশনের তদন্তের পাতায় নেতাজীকে খুঁজে মরছে, এদের কতজন প্রকৃত সুভাষ প্রেমিক? এদের অন্তরে কি সুভাষচন্দ্রের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা আছে? যদি থাকতো তাহলে অমুক বাবা তমুক বাবার পিছনে নেতাজীর খোঁজে ছুটে না বেড়িয়ে নেতাজীর স্বপ্ণের স্বাধীন ভারত গড়ার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতেন৷
সুভাষচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার প্রকৃত উপায় সুভাষচন্দ্রের স্বপ্ণের স্বাধীনতা অর্জন৷ সে স্বাধীনতা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্যে ব্রিটিশ শাসকের হাত থেকে নেওয়া ভিক্ষালব্ধ স্বাধীনতা নয়৷ সুভাষচন্দ্র চেয়েছিলেন পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা---রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা---যে স্বাধীনতার অমৃত শুধুমাত্র কয়েকজন দেশীয় পুঁজিপতি ও তাদের পোষ্য শাসকবর্গ আস্বাদন করবে না৷ যে স্বাধীনতার অমৃত দেশের জাত-পাত-সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে যাবে৷
‘১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সামনে এক ভাষনে বলেছিলেন দেশীয় পুঁজিপতিরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি যোগাচ্ছে৷ আমাদের ওদের বিরুদ্ধেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ মানুষকে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও দিতে হবে৷’ তারপরই দেশীয় পুঁজিপতি ও জাতীয় কংগ্রেসের হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী লবির চক্রান্তেই সুভাষ কংগ্রেস ছাড়েন, দেশ ছাড়েন৷
আজও রাজনৈতিক মুনাফা লুটতে নেতাজীর ভণ্ড ভক্তের অভাব নেই৷ কিন্তু প্রকৃত নেতাজী প্রেমিক কই? যারা সমস্বরে আওয়াজ তুলবে নেতাজীর স্বপ্ণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আর্থিক স্বনির্ভরতার দাবী জানিয়ে৷ যে ভারত সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন--- ‘আমরাও সমাজতন্ত্র চাই, সে সমাজতন্ত্র কার্লমার্ক্সের পুঁথির পাতা থেকে জন্ম নেয়নি৷ এর উৎপত্তি ভারতবর্ষের আপন চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে৷’ সেই স্বপ্ণের স্বাধীন ভারত গড়াই হবে নেতাজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার একমাত্র পথ৷ সুভাষচন্দ্রের সেই প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রের পথই আনন্দমার্গ দর্শনের সামাজিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব প্রগতিশীল উপযোগতত্ত্ব---প্রাউট৷ এই প্রাউটের বাস্তবায়নের সংগ্রামে নামতে হবে প্রতিটি সুভাষ প্রেমিককে৷
- Log in to post comments