ভোট পরবর্তী পরিস্থিতিতে মমতা ব্যানার্জিও আপাত দৃষ্টিতে তৃণমূলের অন্তর্দন্দ্বের শিকার৷ বিদ্রোহী সাংসদ বিধায়কদের ক্ষোভ অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের দিকে ৷ তারা অনেকেই স্বীকার করছেন--- মমতা ব্যানার্জীই আমাদের নেতা৷ অভিষেক ব্যানার্জি অবশ্যই অন্যতম একটা কারণ৷ দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অন্য দলের আয়ারাম গয়ারামদের ঢালাও ভাবে দলে ঢুকিয়ে নেওয়া৷ ২০০ পারের স্বপ্ণটা না দেখলেও চলত৷ ২০১১ তে নিজস্ব যে সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে মমতা ব্যানার্জী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তার আশে পাশে থেকেই যথেষ্ট শক্তি নিয়েই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসন চালনা যায়৷ বিপরীত শক্ত বিরোধীপক্ষও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শাসকের স্বৈরাচারী পদক্ষেপ রুখতে প্রয়োজন৷
তবে এসবই গৌণ কারণ৷ এগুলো না ঘটলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে সরানোর অন্য পরিস্থিতি তৈরি করা হতো৷ কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্রোতের বিপরীতমুখী রাজনীতি, যা দেশীয় পুঁজিপতিদের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছিল৷ ভারতীয় রাজনীতিতে দেশীয় পুঁজিপতিদের তৈরি বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে রাজনীতি করার সাহস ডান বাম রাম কোনপক্ষই দেখাতে পারেনে৷ এই সাহস প্রথম দেখাতে পেরেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ তিনি পষ্টই অভিযোগ তুলেছিলেন দেশীয় পুঁজিপতিরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি যোগাচ্ছে৷ তারপরেই জাতীয় কংগ্রেসের গান্ধী লবি সুভাষচন্দ্রকে নেতৃত্ব থেকে উচ্ছেদ করতে তৎপর হয়৷ কংগ্রেসের সে রাজনীতি যে কতটা নীচ পর্যায় নেমেছিল যা দেখে বিশ্বকবিও স্থির থাকতে পারেন নি৷ গান্ধীকে পত্র লিখতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন৷ সেদিন আর এস এসও সুভাষ বিরোধিতায় কট্টর ছিল৷ মজার বিষয় কম্যুনিষ্টরাও সেদিন সুভাষচন্দ্রের পাশে থাকেনি৷ বরং পরবর্ত্তীতে খুব কদর্য ভাষায় সুভাষচন্দ্রকে আক্রমণ করেছিল৷ এসব আজ ইতিহাস৷ সুভাষ চন্দ্রের শেষ পরিণতি আজও অজ্ঞাত৷
কেউ যেন মনে করবেন না আমি সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মমতাকে তুলনা করছি৷ সুভাষ চন্দ্রের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি তাছাড়া বংশমর্যাদা (এই প্রসঙ্গটা এই কারণে আনলাম কারণ আমাদের দেশের তথাকথিত উচ্চ শ্রেণীর বাবুরা একটু এসব বিচার করেন) কোন দিক দিয়েই মমতার সঙ্গে তুলনা চলে না৷ তবে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতি করতে করতেই হারিয়ে গেছেন৷ স্বাধীন দেশে প্রশাসনের মাথায় বসে গুরুদায়ীত্বের বোঝা তাকে বইতে হয়নি৷ দেশীয় পুঁজিপতিদের তৈরী বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে রাজনীতি করার সাহস সেদিন কম্যুনিষ্টরাও দেখাতে পারেনি৷ তাদের পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা ছিল মুখোশ মাত্র৷ অবশ্য আজও তাই আছে৷
স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে পুঁজিবাদের তৈরি বৃত্তের বাইরে এসে রাজনীতি করার সাহস একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন৷ সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলন, সিঙ্গুর থেকে টাটাদের বিদায় দেশীয় পুঁজিপতিরা ভালো মনে নেয়নি৷ তাছাড়া প্রান্তিক মানুষের হাতে আর্থিক স্বচ্ছলতা তুলে দেওয়া দেশীয় পুজিপতি ও বড়লোক বাবুদের মোটেই পচ্ছন্দ নয়৷ সেই অপচ্ছন্দের কাজটাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করছিলেন৷ তাঁর বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে৷
অপরদিকে দিল্লির শাসক পুজিপতিদের জন্যে দরাজহস্ত৷ রাজ্য প্রশাসন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপসারণের আসল কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে৷ বাকি কারণগুলো নাটক৷ আজ যে সব দুর্নীতির কথা সামনে আসছে এই ধরনের দুর্নীতিতে ডবল ইঞ্জিন সরকার ও তাদের দিল্লির মাথাও অনেক অংশে অনেক বেশী জড়িয়ে আছে৷ শক্তির মদমত্ততায় তা সাময়িক ঢাকা থাকতে পারে কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে নয়৷ সত্য একদিন প্রকাশ হবে৷
পশ্চিম ভারতীয় নীতিহীন রাজনীতি সুভাষচন্দ্রকেও সেদিন নানাভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছিল৷ যারা করেছিল তারাই আজ সুভাষচন্দ্র কে নিয়ে বেশি নাচে৷ কারণ সুভাষচন্দ্র আজ আর দেশীয় পুঁজিপতিদের কাছে বিপদজনক নয়৷ তাঁকে দেশ থেকে, রাজনীতি থেকে উচ্ছেদ করা গেছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ঘুরে দাঁড়াবেন কিনা সময় তা বলবে৷ তবে আজও জন সমর্থন তাঁর আছে৷ তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ বিধায়করাও তাঁকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করতে পারছেন না৷
তবে পুঁজিবাদের অন্যতম মূলধন নীতিহীন রাজনীতির মধ্যেই বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক দুর্যোগে পুঁজিপতিদের ইমারত ভেঙে পড়ার দিন এগিয়ে আসছে৷ বিকল্প বিকেন্দ্রিত অর্থনৈতিক শক্তির জাগরণ শুধু সময়ের অপেক্ষা৷
- Log in to post comments