রাজ্যের বিশজন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে একটি অস্বীকৃত দলে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় শাসকদলকে সমর্থন করছেন৷ সংসদীয় গণতন্ত্রে এক ডাল থেকে আর এক ডালে ঝাঁপ দিতে হলে কোন দলের দুই তৃতীয়াংশ সাংসদকে একতাবদ্ধ হয়ে ডাল পরিবর্তন করতে হয়৷ তৃণমূল সাংসদের সংখ্যাটা ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বিশজনই হয়েছে৷ এর পেছনে অন্য কোন খেলা আছে কি না তা প্রকাশ্যে আসেনে৷ তবে বর্তমান শাসকদল সংসদে এককভাবে সরকার গড়ার মতো গরিষ্ঠতা পায়নে৷ তাকে সরকার গড়তে অন্য দলের সাহায্য নিতে হয়েছে৷ তবুও নিজের পছন্দের মতো আইন পরিবর্তন করার গরিষ্ঠতা সংসদে নেই৷ কিছুক্ষেত্রে আইন পরিবর্তন, সংশোধন বা নতুন আইন প্রণোয়ন করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতা না পেয়ে ব্যর্থ হতে হয়েছে৷ তাই ঘোড়া কেনা -বেচার (রাজনীতির পরিভাষায়) বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে৷ তবে সেটা চক্ষু লজ্জার খাতিরে খোলা বাজারে হয়নে৷
কিন্তু নির্লজ্জ বিশ (বিষ) সাংসদ যখন শুধু দল পরিবর্তন নয়, দলীয় মতবাদও পরিবর্তন করেছে তখন তাদের শাসক দলের দুয়ারে যাবার আগে যাওয়া উচিত ছিল জনতার দুয়ারে৷ কারণ তারা কিন্তু সাংসদ হয়েছে শাসক বিরোধী সাম্প্রদায়ীক বিরোধী জনতার ভোটে৷ তাই সামান্য নীতিজ্ঞান থাকলে সাংসদপদ ত্যাগ করে নির্বাচনে দাঁড়াত বঙ্গ রাজনীতির ওই বিষাক্ত বিশজন৷ তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এইটুকু হয়তো প্রাপ্য ছিল৷ কারণ রাজ্যে ঘোড়া কেনা-বেচার রাজনীতিটা তাঁর হাত ধরেই হয়েছে৷ বাম আমলের ৩৪ বছরে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি থাকলেও এই ঘোড়া কেনা-বেচার পলিটিক্যাল বাইরাস রাজ্যে প্রবেশ করেনি৷ এটা প্রবেশ করেছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই৷ শাসন ক্ষমতার দখল করতে দরকার যেখানে ১৪৮ জনের সেখানে ২০০-২৫০ পাওয়ার ভাবনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি, আদর্শ শূন্যতাও একটা কারণ৷ গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ দুর্নীতিমুক্ত শাসনের সহায়ক৷ তবে ভারতীয় রাজনীতিতে কোন দলই শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ রাখতে চায়নি৷ এর কারণই হচ্ছে নিজ দলের কুকর্ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ যাতে কথা না বলে, কোন অভিযোগ যাতে না তুলতে পারে৷ তবু এরই মাঝে বাঙলায় বাঙালীর একটা নৈতিক মূল্যবোধ ছিল, কিন্তু আজ তা অবলুপ্ত৷
বাঙালীর এই অধঃপতনের শুরু ভারতীয় রাজনীতিতে দেশবন্ধু সুভাষচন্দ্রের বিদায়ের পর থেকেই৷ তবু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত বাঙালী একেবারে অধঃপতে যায়নি৷ দেশভাগ বাঙালীর সর্বনাশের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে৷ শ্রীহীন সম্পদহীন বাঙালীর নৈতিকতার যেটুকু অবশিষ্ট ছিল ৭৮ বছরের ঈর্ষা, হিংসা, ক্ষমতা ললুপতার রাজনীতি সেটুকুও নিঃস্ব করে দিয়েছে৷ মহৎ কিছু করার প্রেরণা বা ইচ্ছাশক্তি কোনটাই আজ বাঙালীর নেই৷
দেশভাগ, উদ্বাস্তুর বোঝা, আর্থিক বিপর্যয় ব্রিটিশ পরবর্তী স্বদেশী শাসকের বাঙালী বিদ্বেষী আচরণ বাঙলাকে যেমন ধনসম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছে, করে চলেছে, অপরদিকে তার নৈতিক অধঃপতনের জন্যে বাঙলার উন্নত ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিকে অবদমিত করে নিম্নমানের হীন চিন্তাধারার অশ্লীল সাহিত্য চলচিত্র, গানের স্রোত বইয়ে দিয়েছে৷ বাঙালী সেই স্রোতেই বহে চলেছে৷ তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ ও আকন্ঠ দুর্নীতিতে ডুবে থাকা রাজনৈতিক নেতারা বাঙলার এই অধঃপতনের জন্যে দায়ী৷ তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও এই স্রোতেই গা ভাসিয়েছে৷ এরা কেউ বাঙলার অধঃপতনের দায় অস্বীকার করতে পারেনা৷
পুঁজিবাদী শোষণ, ভ্রষ্টাচার রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় চটুল রসের প্রাদুর্ভাব ছাত্র যুবসমাজের নৈতিকতার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে৷ ভ্রষ্টাচারী রাজনৈতিক নেতারা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এই মেরুদণ্ডহীন ছাত্র সমাজকেই ব্যবহার করছে৷ রাজনীতির মূল কথা যে জনসেবা সেটাই আজ ভুলে গেছে৷ চোরও ধরা পড়লে লজ্জা পায়৷ কিন্তু এই রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের দেখলে সত্যিই করুণা হয়৷ তিন মাস আগেও যারা একে অপরের সমালোচনায় সৌজন্য বহির্ভূত ভাষা ব্যবহার করেছেন৷ আজ তারা কি সুন্দর মিলিজুলি সরকার৷ এই নীতিহীন প্রতারক নেতাদের কদর্য রাজনীতির শিকার সেইসব নিরীহ নির্বাচক মণ্ডলী যারা এদের কপট আচরণে ভুলে ছিল৷ তবু সব কিছুরই শেষ আছে৷ এই নীতিহীন ভ্রষ্টাচারী রাজনীতিরও শেষ আছে৷ সেদিনের সেই শেষের সময় ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হবে এই নীতিহীন রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা৷
- Log in to post comments