প্রথম পর্ব : একটি পরীক্ষা, বহু প্রশ্ণ এবং এক নতুন জনমতের সূচনা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির মধ্যে (NEET National Eligibility cum Entrance Test) আজ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ৷ দেশের যে কোনো প্রান্তে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে ইচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কার্যত একমাত্র পথ৷ ফলে পরীক্ষাটির স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু কয়েক লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যতের প্রশ্ণ নয় এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে NEET-কে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক, প্রশ্ণ এবং অনিয়মের অভিযোগ দেশবাসীকে উদ্বিগ্ণ করেছে৷ বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা পরিচালনা, প্রশ্ণপত্রের নিরাপত্তা, পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছে৷ বহু ক্ষেত্রে প্রশ্ণপত্র ফাঁসের অভিযোগও সামনে এসেছে৷ এর ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং হতাশার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে৷
বিশেষত ২০২৪ সালে NEET-কে ঘিরে যে বিতর্ক জাতীয় স্তরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়৷ এরপর ২০২৬ সালেও পুনরায় প্রশ্ণপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় বহু মানুষের মনে প্রশ্ণ জাগেএকটি সর্বভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কি সত্যিই নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে?
এই প্রশ্ণের গুরুত্ব কেবল প্রশাসনিক নয় এর সামাজিক অভিঘাতও অত্যন্ত গভীর৷
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে, পরিবারের সঞ্চিত অর্থ কোচিং, বইপত্র এবং প্রস্তুতির পিছনে ব্যয় হয়৷ হাজার হাজার পরিবার নিজেদের স্বপ্ণকে একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলে৷ সেই পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়েই যদি প্রশ্ণ ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন পরীক্ষার্থী নয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস৷
আরও গুরুতর বিষয় হলো, চিকিৎসাবিদ্যার মতো একটি পেশায় যোগ্যতার প্রশ্ণে কোনো আপসের সুযোগ নেই৷ একজন অযোগ্য ব্যক্তি যদি কোনো অনিয়মের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যান, তাহলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে অসংখ্য মানুষের জীবনের ওপর পড়তে পারে৷ ফলে প্রশ্ণপত্র ফাঁস বা পরীক্ষা-সংক্রান্ত দুর্নীতি কেবল একটি পরীক্ষার সমস্যা নয় এটি জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত৷
এই প্রেক্ষাপটেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদের সুর ধীরে ধীরে জোরালো হতে শুরু করে৷ প্রথমদিকে এই প্রতিবাদ ছিল মূলত পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাজগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ৷ পরে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং সাধারণ মানুষও এই প্রশ্ণে সরব হতে থাকেন৷ তাঁদের মূল দাবি ছিলঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার৷
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দাবিগুলি শুধুমাত্র শিক্ষাক্ষেত্রের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি৷ বিষয়টি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংবিধানিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে ওঠে৷ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ণ, জনমাধ্যমে বিস্তৃত আলোচনাসব মিলিয়ে NEETএকটি সর্বভারতীয় জনআলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়৷
তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল অন্যত্র৷ এটি ধীরে ধীরে এমন এক জনপরিসর তৈরি করে, যেখানে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী বহু মানুষ একটি সাধারণ দাবিকে কেন্দ্র করে একত্রিত হতে শুরু করেন৷ অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার প্রশ্ণ ছিল না বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ণেও পরিণত হয়৷
এই কারণেই NEET-কে ঘিরে গড়ে ওঠা ঘটনাপ্রবাহকে কেবল একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত বিতর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে৷ এটি ছিল এমন একটি সামাজিক মুহূর্ত, যেখানে শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুনভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে৷ এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়৷ বরং গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, সেই প্রশ্ণের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা৷
কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার শেখায়প্রতিটি বড় আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্য বা ব্যর্থতায় নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করল, তার মধ্যেই নিহিত থাকে৷
দ্বিতীয় পর্ব : প্রতিবাদ থেকে আন্দোলনসামাজিক মাধ্যম, নাগরিক উদ্যোগ এবং জনসমর্থনের বিস্তার
NEET-কে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর প্রথমদিকে প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ ছিল মূলত পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং কিছু ছাত্র সংগঠনের মধ্যে৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষোভ একটি বৃহত্তর সামাজিক আলোচনায় রূপ নিতে শুরু করে৷ প্রশ্ণটি আর শুধু একটি পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না বরং তা পরিণত হলো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ণে৷
এই সময় সামাজিক মাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও আশঙ্কার কথা প্রকাশ করতে থাকেন৷ বহু ভিডিও, পোস্ট, বিশ্লেষণ এবং মতামত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে থাকে৷ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বাইরে গিয়েও এই আলোচনাগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়৷
এই প্রেক্ষাপটে অভিজিৎ দিপকে-সহ কয়েকজন তরুণের উদ্যোগ বিশেষভাবে আলোচনায় আসে৷ একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁরা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ভাষায় একটি সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারাভিযান শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে Cockroach Janata Party (CJP) নামে পরিচিতি লাভ করে৷ প্রথমদিকে এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও সামাজিক প্রতিবাদের একটি প্রতীকী উদ্যোগ৷ কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই উদ্যোগ বহু তরুণের মধ্যে সাড়া ফেলে এবং একটি বৃহত্তর নাগরিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে৷
সমর্থকদের মতে, এই প্ল্যাটফর্মের বিশেষত্ব ছিল এর অরাজনৈতিক চরিত্র৷ এখানে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের পতাকা বা সাংগঠনিক পরিচয়কে সামনে রাখা হয়নি বরং পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবিকেই মুখ্য করা হয়৷ অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশ এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ণও তোলেন৷ কিন্তু বিতর্ক সত্ত্বেও এটি যে জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে আকৃষ্ট করেছিল, তা অস্বীকার করা কঠিন৷
ক্রমশ আন্দোলনের মূল দাবিগুলিও স্পষ্ট হতে থাকে৷ আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিলপ্রশ্ণফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা৷ পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগের দাবিও বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উঠে আসে৷
এই সময় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তার বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র৷ কোনো একটি শহর বা রাজ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-বড় প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত হতে থাকে৷ কোথাও মানববন্ধন, কোথাও মিছিল, কোথাও প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচিবিভিন্ন রূপে মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়তে থাকে৷
আন্দোলনের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় যখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করতে শুরু করেন৷ তাঁদের বক্তব্য আন্দোলনকারীদের মনোবল বাড়ায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়৷ ফলে এটি কেবল ছাত্রদের দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর নাগরিক সমাজের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে৷
এই পর্যায়ে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, আন্দোলনের শক্তি ছিল তার বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ৷ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ, এমনকি কোনো দলীয় পরিচয় ছাড়াই বহু নাগরিক, একই দাবিকে সামনে রেখে প্রতিবাদে অংশ নেন৷ এই বহুত্ববাদই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সামনে আসে৷
তবে জনসমর্থন যত বাড়তে থাকে, ততই আন্দোলনকে ঘিরে বিতর্কও তীব্র হয়৷ সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ণ ওঠে৷ বিভিন্ন মহল থেকে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থের উৎস এবং সংগঠনের প্রকৃতি নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়৷ আন্দোলনকারীরা অবশ্য এই অভিযোগগুলি অস্বীকার করে দাবি করেন যে এগুলি তাঁদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করার চেষ্টা৷
এই বিতর্কের মধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠেNEET আর শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা নয় এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু৷
এরপর আন্দোলন আরও বৃহত্তর রূপ নেয়৷ প্রতিবাদ কর্মসূচি, অবস্থান, অনশন এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতসব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে৷ সেই পর্বেই সামনে আসে আন্দোলন দমনের অভিযোগ, গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা৷ সেই ঘটনাপ্রবাহই এই প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশের বিষয়৷ (চলবে)
- Log in to post comments